কথায় আছে- ‘কৌতূহল থাকা ভালো। কিন্তু অনাবশ্যক কৌতূহল বিপদ ডেকে আনে।’ লংগদু উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাবু সুবিলাল চাকমার একদা কৌতূহল জাগল- বনভান্তে রাতে ঘুমাতেন কি? আমাকে সেটা জানতে হবে। সেই কৌতূহল থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন, রাতে চুপিসারে কুটিরে গিয়ে দেখে আসবেন বনভান্তেকে। । ’কাজে কয়েকজন ছাত্রও জুটিয়ে নিলেন। একরাতে ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কৌতূহল মিটাতে। তিনটিলা গ্রাম অতিক্রম করে বিহার এলাকায় পৌঁছতে হয়। বিহারে পৌঁছার আগে পার হতে হয় একটা সাঁকো। তিনটিলা গ্রাম থেকে বিহারে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। তারাও সেই পথ ধরে সামনে এগুতে থাকলেন। যেই মাত্র সাঁকো পার হলেন অমনি হঠাৎ প্রবল বাতাস বইতে লাগল। পুরো আকাশ ঘনকালো মেঘে ঢেকে গেল। ক্রমাগত বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। একটার পর একটা বজ্রপাতের শব্দে কান ঝালাপালা হবার উপক্রম। যেন এক্ষুণি আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামবে। হঠাৎ আবহাওয়ার এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে উপেক্ষা করার সাহস হল না তাদের। আর সামনে এগুতে পারলেন না। অগত্যা বাড়ী ফিরে আসার মনস্থির করলেন। ফিরে আসা শুরু হল। বিহার এলাকা ছেড়ে সাঁকোর অপর পাড়ে এসে পৌঁছলেন। কিন্তু এ কি! কোথায় বাতাস? কোথাও বিদ্যুৎ চমকানি? কোন বজ্র নিনাদের শব্দও নেই। পুরো আকাশ পরিষ্কার; অজস্র তারকা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে আকাশ জুড়ে। অবাক হয়ে গেলেন বাবু সুবিলাল চাকমা। ছাত্ররাও অবাক। একটু আগে তারা কী দেখলেন, আর এখন কী দেখছেন! এতে ছাত্ররা বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। ভয়ে সুবিলাল বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। কোন কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। বোঝা যাচ্ছে, ভয়ে কুঁকড়ে গেছেন সবাই। সুবিলাল বাবুর মনেও ভয়ের একটা ছাপ পড়ল। তবু কেন জানি, একটা জেদে পেয়ে বসল তাকে। না, আরেক বার চেষ্টা করে দেখবো-ই। সেই জেদের বশে ছাত্রদেরকে বললেন—‘চল, আরেক বার গিয়ে দেখি। এতোজন একসাথে আছি ভয় কিসের, কিছুই হবে না।’ মুখের কথায় জোর থাকলেও ভেতরে ঘাবড়ে যাবার ভাব স্পষ্ট টের পাচ্ছেন সুবিলাল বাবু নিজেও। তবুও জেদ বলে কথা! অন্যদিকে ছাত্ররা পড়লেন মহা মুশকিলে। ভয়ে কাহিল অবস্থা আর শিক্ষক কিনা নিদের্শ করছেন আবার যেতে! তারপরও শিক্ষকের কথা অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। একে অপরের দিকে তাকিয়ে পেছনে ঘুরে গেলেন। সুবিলাল বাবুর কথামতো পুনরায় বিহারের পথ ধরলেন। কয়েকশ’ গজ এগুলেন, সাঁকো পেরিয়ে বিহার এলাকায় পা রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল একের পর এক সব বিদ্‌ঘুটে শব্দ। তারা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন, তাদের কিছুদূরে থেকে শব্দগুলো আসছে। মুহূর্তেই সবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বুকের ধুকধুকুনি বেড়ে গেল বহুগুণে। ভয়ে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার অবস্থা। পরষ্পরের দিকে তাকালেন ভীত চোখে। অমনি ভয়ের চোটে দৌঁড়ে ফিরে আসলেন নিজেদের বাড়ীতে।

ঘটনার পর কয়েক দিন পর্যন্ত বিহারে যেতে পারলেন না সুবিলাল বাবু। মনের মধ্যে একটা ভয় ও শঙ্কা কাজ করে সবসময়। না জানি, বনভান্তে কি বলবেন? নাকি আস্ত একটা বকা দিবেন! বেশ কিছুদিন পরে এক সকাল বেলা বিহারে আসলেন। দুরু দুরু বুকে ভান্তেকে বন্দনা করতে গেলেন। দুয়েকজন লোক ভান্তের সামনে বসে রয়েছেন। সুবিলাল বাবু বন্দনা শেষ কোনমতে মাথা তুললেন। ভান্তের মুখের দিকে তাকাতে পারলেন না। তাকাতে ভয় পেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ভান্তে বলে উঠলেন—“বনভান্তে রাতে ঘুমায় নাকি ঘুমান না অনেকে সেটা দেখতে আসে-রাতের অন্ধকারে। বনভান্তে রাতে ঘুমালেও পারেন, না ঘুমালেও পারেন। তাতে কিছু আসে যায় না। আবার, খাবার খেলেও পারেন, না খেলেও পারেন।তোমরা বনভান্তেকে খাদ্য-ভোজ্য দান না দিলেও অসুবিধা নেই এতে দেবতাদের পুণ্য সঞ্চার করার সুযোগ হবে। মনুষ্যগণ বনভান্তেকে দান না দিলে দেবতাগণ দান দিয়ে থাকেন।” আরো বললেন, “জগতে যারা মূর্খ, অজ্ঞানী, তারা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে। তারা কুশলাকুশল সম্বন্ধেও জানে না। কেবল খেয়ে ও ঘুমিয়ে সময় কাটায় তারা। এদের পক্ষে সম্যক জ্ঞান ও সম্যক সত্য জানা সম্ভব নয়। তারা নিজেকে যতই জ্ঞানী, গুণী ও সত্যদ্রষ্টা মনে করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে সেসবের দূরে, বহুদূরে অবস্থান করে তারা।” বনভান্তের এমন অলৌকিক শক্তির ক্ষমতা জেনে ও জ্ঞানগর্ভ ধর্মদেশনা শুনে সুবিলাল চাকমা বিস্মিত হলেন। আর কৃত কর্মের জন্য মনে মনে লজ্জিত হলেন, অনুতপ্ত হলেন। সেদিন হতে তার বনভান্তের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সুদৃঢ় বিশ্বাস উৎপন্ন হল।✍️
( সূত্র: শ্রাবকবুদ্ধ বনভান্তে, ভদন্ত ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষুর )