বুদ্ধ তথাগত আমাদেরকে সবসময় চারটি বিষয় হতে সতর্ক বা সাবধান থাকতে বলেছেন। সেগুলি যতই ক্ষুদ্র মনে হোক না কেনো সাবধানতা অবলম্বন না করলে তাদের দ্বারা যেকোনো সময় ভয়ানক বিপদ আসতে পারে। সেগুলি হল সাপ, আগুন, ক্ষত্রিয় কুমার এবং ভিক্ষু-শ্রামণ। এরা যতই ক্ষুদ্র বা ছোট মনে হোক না কেনো এদের মধ্যে ভয়ানকভাবে ক্ষতি করার শক্তি নিহিত রয়েছে। তাই এদেরকে কখনও অবজ্ঞা করা উচিত নয়। বিশেষ করে সাপ কখনও মিত্র হয়না। এ প্রসঙ্গে জাতক হতে একটি শিক্ষনীয় কাহিনী উপস্থাপন করছি।
হিমালয়ের এক আশ্রমে একজন বৃদ্ধ ঋষি ৫০০ জন তপস্বী শিষ্যদেরকে যোগবিদ্যা শিক্ষা দিতেন। একদিন বর্ষার সময়ে একটি বিষাক্ত সাপের ছোট বাচ্চা ঘুরতে ঘুরতে আশ্রমের ভিতরের ডুকে পড়ল। একজন তপস্বী যখন সাপের বাচ্চাটিকে দেখলেন তখন তাঁর হৃদয়ে সর্প বাচ্চাটির প্রতি পুত্র-স্নেহ উৎপন্ন হল। তিনি সাপের বাচ্চাটিকে হত্যার পরিবর্তে একটি বাঁশের ঝুড়িতে রেখে পালন-পোষণ করতে লাগলেন। বাঁশের ঝুড়িতে রাখার কারণে তার নাম ‘বেণুক’ রাখা হয়েছিল। তিনি পুত্রের মতো স্নেহ-মমতায় বাচ্চাটিকে দেখাশুনা করতে লাগলেন। এজন্য সে তপস্বীকেও সকলে ‘বেণুক পিতা’ বলে সম্বোধন করতেন। বৃদ্ধ ঋষি যখন দেখলেন যে, এ তপস্বী একটি বিষাক্ত সাপের বাচ্চাকে পুত্র-স্নেহে পালন-পোষণ করছে, তখন তিনি তাঁকে ডাকলেন এবং বললেন-‘বিষাক্ত সাপকে কখনও বিশ্বাস করতে নেই। তুমি তাকে ছেড়ে দাও। এভাবে আবদ্ধ রেখে পালন-পোষণ করোনা।’
তপস্বী বললেন-‘ইহা আমার পুত্রের মতো। আমি তাকে ছাড়া জীবিত থাকতে পারবোনা। বৃদ্ধ ঋষি তাঁকে অনেকভাবে বুঝালেন, কিন্তু তপস্বী তাতে কোনোভাবে কর্ণপাত করেননি। তিনি বিষাক্ত সাপের বাচ্চাকে ত্যাগ করতে চাননি। ঋষি মনে মনে ভাবতে লাগলেন-’মুর্খ এ তপস্বী জানেনা যে, সে মৃত্যুকেই পোষণ করছে। সাপ কখনও কারো মিত্র হয়না। সাপ কদাপি নিজের স্বভাবকে পরিবর্তন করেনা। একদিন ইহার দ্বারা তার প্রাণ নাশ হবে।’
তপস্বী রোজ প্রাত:কালে তার সন্তান তুল্য সাপের বাচ্চা ‘বেণুক’কে জাগিয়ে খাবার দিতো, জলপান করতে দিতো এবং নানাভাবে ভালবাসা দিয়ে আবার বাঁশের ঝুড়িতে শুইয়ে দিতেন। যোগানুশীলনের সময়েও তিনি সে ‘বেণুক’কে একাকী রাখতেননা। তিনি ইহাকে নিজের পাশেই রাখতেন। ‘বেণুক’ও কখনও কখনও স্বীয় শির বাঁশের ঝুড়ি হতে বের করতো এবং তপস্বীর দিকে তাকিয়ে আবার বাঁশের ঝুড়িতে শুয়ে থাকতো। এভাবে ‘বেণুক’ সাপ এবং ‘বেণুক পিতা’ তপস্বী উভয়ে মিলেমিশে থাকতে লাগল। সাপের বাচ্চাও দিন দিন বড় হচ্ছিল এবং তার প্রতি তপস্বীর পুত্র-স্নেহও প্রগাঢ় হতে লাগল।
আশ্রমের সকল তপস্বী রোজ জঙ্গলে গিয়ে নিজেদের খাওয়ার জন্য ফলাদি সংগ্রহ করতে যেতেন এবং সন্ধ্যার সময়ে আশ্রমে ফিরে আসতেন। ‘বেণুক পিতা’ তপস্বী স্বীয় পুত্র ‘বেণুক’ সাপকে পানাহার দিয়ে যেতেন এবং জঙ্গল হতে প্রত্যাবর্তনের পরও নিজে খাওয়ার পূর্বে সাপকে খাবার দিতেন। একদিন সকল তপস্বী ফল-ফুলের খোঁজে অনেক দূর জঙ্গলে গিয়েছিলেন। সেখানে অধিক ফল-ফুলের সমাহার ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন যে, সেখান হতে অনেক ফল-ফুল সংগ্রহ করে নিয়ে আসবেন। সকল তপস্বী ফল-ফুলের সুলভতাকে দেখে দু’তিন দিন তথায় অবস্থান করেছিলেন। ‘বেণুক পিতা’ তপস্বীও তাঁদের সাথে থেকে গেলেন। তিনি তথায় যাওয়ার সময় ‘বেণুক’কে পানাহারাদি করিয়ে বাঁশের ঝুড়িতে আবদ্ধ করে রেখে গিয়েছেন, যাতে সে বিনা কষ্টে শুয়ে থাকতে পারে এবং তাকে যাতে কোনো প্রকার অসুবিধায় পড়তে না হয়।
দু’তিন দিন পার হয়ে যাওয়ার পর সকল তপস্বী নিজেদের আশ্রমে ফিরে আসলেন। ‘বেণুক পিতা’ তপস্বী আশ্রমে আসা মাত্রই ‘বেণুক’ সাপের কথা তাঁর স্মরণ হলো। তিনি সর্ব প্রথমে তাকে পানাহার দেওয়ার কথা চিন্তা করলেন। তিনি বাঁশের ঝুড়ি হাতে নিয়ে এর ঢাকনা খুললেন এবং অতীব স্নেহ ভরে বললেন-‘এসো পুত্র! এসো। তোমার কি ক্ষুধা পেয়েছে?’
এরকম বলে ‘বেণুক পিতা’ তপস্বী স্বীয় হাত বাঁশের ঝুড়ির মুখের দিকে নিলেন। ‘বেণুক’ সাপ তো দু’তিন দিন ঝুডিতেই বন্দী থাকার কারণে অনেক ক্রোধান্বিত ছিল। যখনই তপস্বীর হাত সাপের কাছে আসতে দেখেছে, তখনই সে হাতে দংশন করে দিল। বিষাক্ত কালসাপের দংশনের কারণে তপস্বী বিষক্রিয়ায় তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। সাপ খুশীর সাথে ঝুড়ি হতে বের হয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেলো। অন্য তপস্বীগণ যখন এ সমস্ত দেখেছেন, তখন তাঁরা নিজেদের আচার্য বৃদ্ধ ঋষিকে সমাচার জানালেন। তাঁর দাহ ক্রিয়া করার পর সকল তপস্বীকে আহ্বান করে উপদেশ দিতে গিয়ে বৃদ্ধ ঋষি বলেছিলেন-
‘যো অত্থকামস্স হিতানুকম্পিনো,
ওবজ্জমানো ন করোতি সাসনং।
এবং সো নিহতো সেতি, বেলুকস্স যথা পিতাতি।’
অর্থাৎ যাঁরা নিজের মঙ্গল কামনা করেন, হিতোপদেশ দেওয়ার পর সে উপদেশ অনুসারে তাঁরা যদি অনুসরণ না করেন, তাহলে তিনি ‘বেলুক পিতা’র (তপস্বী) মতো বিনাশ প্রাপ্ত হবেন।
এ কাহিনীটি পালি সাহিত্য ত্রিপিটকের সূত্র পিটকান্তর্গত ‘খুদ্দক নিকায়ের ‘জাতক’ গ্রন্থের জাতক সংখ্যা ৪৩ হতে সংগৃহীত।
0 Comments