পালি সাহিত্যে রাগের যে অর্থ তা বাংলার প্রচলিত অর্থ হতে ভিন্ন। আজ হতে আড়াই হাজার বছর পূর্বের ভারতীয় মাগধী ভাষায় রাগের অর্থ ছিল আসক্তি। কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষন-আসক্তি বুঝাতে রাগ শব্দটির ব্যবহার করা হতো। কিন্তু যতই সময় পার হয়েছে এ শব্দের অর্থেরও হয়েছে পরিবর্তন। এখন এর সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ দেখা যায়। বর্তমানে ক্রোধ অর্থেই রাগ শব্দটির ব্যবহার হচ্ছে সর্বত্র।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ যে বলেছিলেন-‘নত্থি রাগো সমো অগ্গি।’ (ধম্মপদ, সুখবর্গ-২০২)। অর্থাৎ রাগের সমান অগ্নি নাই। এখানে ‘রাগ’ বলতে ক্রোধ নয়, ইহা আসক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রাগকে তিন প্রকারে ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন-কামরাগ, রূপরাগ এবং অরূপরাগ। ‘কামরাগ’ মানে হল কামাসক্তি। কামাসক্তি কিভাবে আগুন হয় তা এখানে আলোচনা করছি।
বৈশালীর লিচ্ছবী রাজকুমারদের কথা। স্থান ছিল বৈশালীর কূটাগারশালা। কোনো এক উৎসবের দিনে লিচ্ছবী রাজকুমারগণ অতীব সুন্দর বস্ত্রাভূষণে সজ্জিত হয়ে উদ্যানে যাওয়ার জন্য ঘর হতে বের হয়েছিলেন। সেসময় তথাগত বুদ্ধ পিণ্ডপাত আহরণের জন্য নগরে প্রবেশ করলেন এবং তিনি ভিক্ষুদিগকে বললেন-‘ভিক্ষুগণ! এ সকল লিচ্ছবী রাজকুমারগণকে দেখো। যারা তাবতিংস দেবলোকের দেবতাগণকে এখনও দেখোনি, তারা এদেরকে দেখে নাও।’ এরকম বলে তিনি নগরের দিকে প্রবিষ্ট হতে লাগলেন।
এদিকে উদ্যানে যাওয়ার মার্গে রাজকুমারেরা একজন সুন্দরী নগরশোভিনী (পতিতা) নারীকেও নিজেদের সাথে নিয়েছিলেন। উদ্যানে পৌঁছার পর নগরশোভিনী পতিতার ভোগ-দখলকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে গাত্র দাহ হতে লাগল এবং ঈর্ষা বশত: পরস্পরের মধ্যে কথা কাটাকাটি হল, এর থেকে মারপিট এবং পরে রক্তক্ষয়ী ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হলো। সে মহিলাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভীষণ হাতাহাতি সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন। নিজেদের শরীর হতে রক্তের ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পরস্পরকে কঠোরভাবে ঘায়েল করলেন। তাঁদের পরিস্থিতি এতই ভয়ানক হয়েছিল যে, তাঁদেরকে খাটিয়ায় শুইয়ে বহন করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। এদিকে তথাগত বুদ্ধ মধ্যাহ্ন ভোজন সমাপ্ত করে নগর হতে স্বীয় কুঠিরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করছিলেন।
যখন ভিক্ষুগণ সকল লিচ্ছবী রাজকুমারদেরকে বহন করে নিয়ে যেতে দেখেছেন, তখন তাঁরা তথাগত বুদ্ধকে বললেন-‘ভন্তে! প্রাত:কালে লিচ্ছবী রাজকুমারগণ তাবতিংস দেবলোকের দেবতাদের চেয়েও অধিক সাজ-সজ্জা ও বস্ত্রালঙ্কারে বিভূষিত হয়ে উদ্যানের দিকে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা সকলে সেখানে কামাতুর হয়ে নারীর জন্য এরূপ দুর্গতি প্রাপ্ত হয়েছে। এখন তাঁরা সকলে গম্ভীরভাবে ঘায়েল হয়ে স্বীয় স্বীয় ঘরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ভিক্ষুদের কথা শুনে শাস্তা তথাগত বললেন-‘ভিক্ষুগণ! নারী প্রেম (রতি, আসক্তি) হতে অন্তত: শোক এবং ভয় উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং তা কষ্টের কারণ তৈরী হয়ে থাকে।
অত:পর বুদ্ধ তথাগত নিম্নের গাথা ভাষণ করলেন-
‘কামতো জাযতে সোকো, কামতে জাযতে ভযং,
কামতো বিপ্পমুত্তস্স নত্থি সোকো কুতো ভযং।’
অর্থাৎ কামরাগ হতে শোক উৎপন্ন হয়, কামরাগ হতে ভয়ও উৎপন্ন হয়। যিনি কাম বিমুক্ত হয়েছেন, তাঁর শোক এবং ভয় কিসের? শোক ও ভয় উভয়ই তাঁর তিরোহিত হয়ে যায়।
কামরাগ যতই বাড়ায়, রবারের মতো ততই বর্ধিত হয়। অনেক নারী রয়েছে একাধিক পুরুষের সাথে মিলনেও তৃপ্ত হয়না, আবার অনেকও পুরুষও রয়েছে, তারাও একাধিক নারীতে আসক্ত হয়েও তৃপ্তি পায়না। তারা কামরাগের জন্য উন্মত্ত হয়ে যায়। তারা কামাতুর হয়ে এমন উন্মত্ত হয় যে, অর্থ, সম্মান, মর্যাদা সবকিছু বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা।
আসক্তির বিভিন্ন কারণ থাকে। তন্মধ্যে কামাসক্তিকে সবচেয়ে অধিক শক্তিশালী বলা হয়। বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, নারীর জন্য কামাসক্ত পুরুষ বা পুরুষের জন্য কামাসক্ত নারী মহোপকারী মাতা-পিতা অস্বীকার পূর্বক ত্যাগ করে, আদরের ভাই-বোন সহ পরিবার ত্যাগ করে, প্রিয়তম পুত্র-কন্যা ত্যাগ করে, সমাজ ত্যাগ করে এবং ধম্ম পর্যন্ত ত্যাগ করে। নারীর জন্য রাজ্য সমূহে রাজাগণ হিংস্র লড়াই-যুদ্ধে লিপ্ত হন, রক্তস্রোত প্রবাহিত করেন, জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেন।
রাজকুমার সিদ্ধার্থ যাতে বুদ্ধত্ব জ্ঞান সম্যক সম্বোধি লাভ করতে না পারেন, তজ্জন্য মাররাজ অন্তিম অস্ত্ররূপে স্বীয় কন্যাত্রয়কে প্রেরণ করেছিল। কিন্তু তাঁকে পথচ্যুত করতে পারেনি। তিনি লক্ষ্যে অটল-অবিচল ছিলেন। তবে সাধারণ পুরুষকে দুর্বল করতে পারে একমাত্র নারী। যে পুরুষ নারীতে আসক্ত তাকে আগুনের মতো জ্বালিয়েই সবকিছু শেষ করে থাকে।
0 Comments