সাংসারিক জীবনে অধিকতর পরিবারে দাম্পত্য কলহের কারণরূপে দেখা যায় মাত্রাতিরিক্ত ভোগলিপ্সা, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, শ্রদ্ধাহীনতা এবং সহনশীলতার অভাব। দাম্পত্য জীবনে পতি-পত্নীর মধ্যে যদি পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা, ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্যগুণ ও আন্তরিকতার অভাব থাকে, তাহলে সে দাম্পত্য জীবনে সারা জীবন দুঃখের অগ্নিকুণ্ডের মতো ধুঁকে ধুঁকে জ্বলতে হয়। যদি আপনি দাম্পত্য জীবন এবং জীবন সাথীর চরিত্র বিষয়ে বুদ্ধের দিক নির্দেশনা মূলক গভীর উপদেশ কামনা করে থাকেন, তাহলে নিম্নের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিপাত করা অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। ধম্মপদে বুদ্ধের বার্তা হল-
‘চরংসে নাধি গচ্ছেয্য সেয্যং সদিসমত্তনো,
একংচরিযং দল্হং কযিরা নত্থি বালে সহায়তা।’
(ধম্মপদ-৬১)
অর্থাৎ সংসার যাত্রায় সবসময় নিজের চেয়ে উত্তম অথবা সমকক্ষ জীবন সঙ্গীর অনুসন্ধান করবে। সেরকম সঙ্গী পাওয়া না গেলে একাকী থাকবে। তবুও মুর্খ সংসর্গ কিংবা নিজের চেয়ে হীন গুণ সম্পন্নের সাথে সাহচর্য করবেনা। কেননা মুর্খ সাহচর্যে দুঃখ ব্যতীত সুখ নাই।
বুদ্ধ বার বার বলেছেন যে, কার সঙ্গে আমার সাহচর্য তার উপর আমার জীবনের দিশা নির্ণয় হয়ে থাকে। এ কথা পতি-পত্নীর সম্বন্ধের উপরও খুবই প্রযোজ্য। বুদ্ধের শিক্ষানুসারে কিরকম পতি-পত্নীর দুর্গুণ হতে সাবধান থাকা উচিত সে সম্পর্কে বলা হয়েছে-
পতি হোক বা পত্নী, যদি কোন একজন কিংবা উভয়ে সবসময় মিথ্যা ভাষণকারী হয়, বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে, ক্রোধী, হিংস্র ও প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে থাকে, নেশাগ্রস্থ হয়ে থাকে, দুঃশ্চরিত্র হয়ে থাকে, অর্থের অপচয় করে থাকে, অসামাজিক লোকদের সাথে মেলামেশা জনিত দুর্গুণ ও দুর্জনের দিকে লাগাতার আসক্ত থাকে, তাহলে সে পরিবারের দাম্পত্য জীবনে দুঃখ, অশান্তি, কলহ বাসা বাঁধতে থাকবে। সে পরিবারের কখনও উন্নতি-শ্রীবৃদ্ধি থাকবেনা। ফলে সেখানে কখনও সুখ-শান্তির কোনো পরিবেশও থাকবেনা। সে দম্পতি সবসময় নরক সম দুঃখ-যন্ত্রণায় নিমজ্জিত থাকবে।
একটি আদর্শ জীবন সঙ্গীর পাঁচটি সদ্গুণ থাকে। বৌদ্ধ গ্রন্থানুসারে উত্তম জীবন সঙ্গী হল নিম্নরূপ-
১) তিনি বিশ্বাসী হবেন।
২) তিনি সবসময় পরিবারের হিত চিন্তা করবেন।
৩) কঠিন সময়ে তিনি সবসময় পাশে থাকবেন।
৪) তিনি সবসময় সত্যভাষী হবেন এবং
৫) নীতি-নৈতিকতা এবং ধম্ম তথা সদাচারকে সবসময় তিনি সম্মান করবেন।
আজকের দিনে গভীর চিন্তন
———————————
বর্তমান সময়ে লোকেরা জীবন সঙ্গী নির্বাচন করতে সবসময় বাহ্যিক দৈহিক রূপ, ধন-সম্পত্তি, চাকরী, সামাজিক পদ-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদিকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ লোক ইহা দেখেনা যে, নির্বাচিত জীবন সঙ্গী চরিত্রবান কিনা, মানবীয় কিনা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত কিনা এবং ধম্মানুশীলন করে কিনা। এ সম্পর্কে বুদ্ধের জিজ্ঞাসা হলো-
ব্যক্তি শীলবান কিনা, তিনি বিশ্বস্ত কিনা, মানবিক কিনা এবং কঠিন সময়ে তিনি সাথ দেবেন কিনা, এগুলিই প্রথমে দেখা উচিত। যদি উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ’ বোধক হয়, তাহলে সম্বন্ধ স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা অধিক থাকে। আর যদি উত্তর ‘না’ বোধক হয়, তাহলে সে সম্বন্ধ স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
বুদ্ধ শিক্ষার সার বার্তা হল-
‘বাহ্যিক সৌন্দর্য তথা দৈহিক রূপ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায়। ধন-সম্পদও অস্থায়ী, অর্থাৎ আসা-যাওয়া করে, উত্থান-পতন হয় কিন্তু চরিত্র ও মানবীয় সদ্গুণই হল জীবনের ভিত্তি, যার উপর সুখী পরিবার স্থায়ী হয়ে থাকে।
এজন্য বুদ্ধের মতে, জীবনসাথীর মধ্যে সবচেয়ে বড় সদ্গুণ হল শীল (চরিত্র), কেননা শীল দ্বারাই বিশ্বাস উৎপন্ন হয় এবং বিশ্বাস হতেই সম্বন্ধ স্থায়ী ও সুখী হয়ে থাকে।
0 Comments