Hot Posts

6/recent/ticker-posts

ব‍্যভিচার হল পারিবারিক ও সমাজিক জীবনে ভয়ানক অনাচার

গৃহস্থদের নিত্য প্রতিপাল্য পঞ্চশীলের তৃতীয় শীল ‘কামেসুমিচ্চাচারা’ বা ব্যভিচার-শীলের বাস্তবিক অর্থ এবং পারিবারিক জীবনে ইহার দুষ্প্রভাব সম্পর্কে এখানে আলোচনা করছি।

ভগবান তথাগত বুদ্ধ মানব জীবনকে দুঃখ হতে মুক্ত করার জন্য কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার মার্গই প্রদর্শন করেছেন তা নয়, বরং এর সাথে সাথে একটি স্বাস্থ্য সম্পন্ন, নৈতিক এবং সুখী সামাজিক জীবনেরও স্পষ্ট দিশা নির্দেশ করেছেন। এরূপ লক্ষ্য হতেই তিনি গৃহস্থ অনুসারীদের জন্য অর্থাৎ উপাসক-উপাসিকাদের জন্য পঞ্চশীল প্রতিপালনের উপদেশ প্রদান করেছেন। পঞ্চশীল কেবল এক ধাম্মিক নিয়ম নয়, বরং ইহা হল এরকম এক সিদ্ধান্ত, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজকে স্থির, সুরক্ষিত এবং সুখী করে থাকে।
পঞ্চশীলের তৃতীয় শীল
——————————-
‘কামেসুমিচ্চাচারা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।’
অর্থাৎ আমি কাম বিষয়ক মিথ্যা আচরণ হতে (পরপুরুষ-পরস্ত্রীর সাথে সমাগম করা হতে) বিরত থাকার শিক্ষাপদ গ্রবণ করছি।
এ শীল কেবল শারীরিক সম্বন্ধের মর্যাদা পর্যন্ত সীমিত নয়, বরং মনের পবিত্রতা, ভাবনার ঈমানদারী, বিশ্বাস রক্ষারও বার্তা দিয়ে থাকে।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ বৈবাহিক জীবনকে একনিষ্ঠ এবং মৈত্রীপূর্ণ করার জন্য অগণিত উপদেশ প্রদান করেছেন। তিনি অনৈতিক, ছল-কপটতাপূর্ণ এবং দুঃখ উৎপন্নকারী দুর্গুণকে প্রকট করে মনুষ্যজাতিকে অনেক হানিকারক পরিণাম হতে বাঁচানোর জন্য সর্বদা প্রচেষ্টা করেছেন।
এজন্য মনুষ্য জীবনে শীলানুশীলন করার উদ্দেশ্য দমন নয়, বরং শীল হল সংযম এবং উত্তরদায়িত্ব বিকাশের সাধন।
্যভিচারের বাস্তবিক অর্থ
—————————
সাধারণত: লোকেরা ব্যভিচারকে কেবল বিবাহেতর শারীরিক সম্বন্ধকেই মনে করে থাকে। কিন্তু ভগবান বুদ্ধের শিক্ষায় ইহার অর্থ আরও অধিক ব্যাপক দেখা যায়। ব্যভিচার হল সে আচরণ, যাতে কারো বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়, কারো বৈবাহিক বা নৈতিক মর্যাদার লঙ্ঘন করা হয়, ছল, ধোঁকা, শোষণ, জবরদস্তী বা স্বার্থের কারণে সম্বন্ধ স্থাপন করা ইত্যাদি।
তথাগত বুদ্ধ ব্যভিচারকে হানিকারক বলেছেন কেনো?
——————————-
তথাগত বুদ্ধ ব্যভিচারকে হানিকারক এজন্য বলেছেন, কেননা ইহার প্রভাব কেবল দু’ ব্যক্তি পর্যন্ত সীমিত থাকেনা, বরং ইহার দুষ্প্রভাব পুরা পরিবার, সন্তানাদি, সমাজ এবং স্বয়ং ব্যক্তির মামসিক জীবনের উপর পড়ে থাকে।
পরিবারের সবচেয়ে বড় পুঁজি কেবল ধন নয়, বরং বিশ্বাসই হল বড় পুঁজি। যখন পতি বা পত্নী যে কেহ ব্যভিচার করে থাকে, তখন সর্ব প্রথমে বিশ্বাস ভঙ্গ হয়ে যায়, বিশ্বাস ভঙ্গ হলে প্রেম ভালবাসা দুর্বল হয়ে যায়, সম্মান সমাপ্ত হয়ে যায় এবং নিজেদের মধ্যে সন্দেহ, ঈর্ষা, ভয় তথা মানসিক অশান্তির আঁকড়া হয়ে থাকে।
যে গৃহে পূর্বে স্নেহ এবং আপনত্ব গভীর ছিল, সেখানে কটুতা এবং বিবাদ জন্ম নিয়ে থাকে। পতি-পত্নীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং সম্বন্ধ কেবল সামাজিক লোক দেখানোর মধ্যে সীমিত হয়ে থাকে।
সন্তানদের উপর ব্যভিচারের দুষ্প্রভাব
———————————-
্যভিচারের সবচেয়ে গভীর আঘাত সবসময় সে সন্তানদের উপর পড়ে থাকে, যারা এ সমস্ত ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে কোনো সম্বন্ধও রাখেনা। মাতা-পিতার মধ্যে মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদ এবং দূরত্বভাব সন্তানদের জীবনে অসুরক্ষা, ভয় এবং অবিশ্বাস উৎপন্ন করে থাকে। এরকম পরিবেশে পালন-পোষণ হওয়া সন্তান কখনও কখনও আত্মবিশ্বাসের কমতি, ভাবনাত্মক অস্থিরতা বা ভবিষ্যতের সম্বন্ধ সমূহে বিশ্বাস করা কঠিনত্বের অনুভব করে থাকে। এরূপভাবে এক ব্যক্তির অসংমিত প্রবৃত্তি অনাগত প্রজন্ম পর্যন্ত এর প্রভাব ভোগ করতে থাকে।
সমাজে ব্যভিচারের দুষ্প্রভাব
———————————-
যখন পরিবার ভেঙ্গে যায়, তখন সমাজও দুর্বল হতে থাকে। ব্যভিচার হতে পারিবারিক বিঘটন, সামাজিক অবিশ্বাস, মানসিক অশান্তি এবং আরও অনেক প্রকার সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
এজন্য ভগবান তথাগত বুদ্ধ ইহাকে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতা স্খলনের বিষয় মনে করেননি, বরং সামাজিক কল্যাণের সাথেও যুক্ত করেছেন।
ভগবান বুদ্ধের ধম্ম কেবল ইহাই বলেনা যে, মনুষ্য কি না করা উচিত, বরং তিনি ইহাও শিখিয়েছেন যে, মনুষ্যের কি করা উচিত।
একজন আদর্শ গৃহস্থ বা উপাসক-উপাসিকাদের জীবনের ভিত্তি হল-
একে অপরকে পরস্পর সম্মান করা, পরস্পরের প্রতি সম্পর্ক ঈমানদারীর সাথে কায়েম রাখা, পরস্পরের বিশ্বাসকে খণ্ডিত হতে না দেওয়া, পরস্পরের প্রতি মৈত্রী বাড়িয়ে তোলা, একে অপরের প্রতি করুণা সিঞ্চন করতে থাকা, পরস্পরের মধ্যে আত্মসংযমের ছিঁড় ধরতে না দেওয়া এবং পরস্পরের উত্তর দায়িত্ব রক্ষায় সহযোগী হওয়া ইত্যাদি।
যেখানে পতি-পত্নী একে-অপরের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকে, সেখানে পরিবারে শান্তি, সন্তানদের মধ্যে ভাল সংস্কার এবং সমাজে নৈতিকতার বিকাশ হয়ে থাকে।
বর্তমান কালে ব্যভিচারের প্রাসঙ্গিকতা
—————————-
আজকের যুগ হল তেজ সঞ্চার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল সম্পর্কের যুগ। এরকম পরিবেশে আকর্ষণ, প্রলোভন এবং অনৈতিক সম্বন্ধ সমূহের সুযোগ পূর্বাপেক্ষা অধিকতর সহজে করা সম্ভব হয়।
এজন্য পঞ্চশীলের তৃতীয় শীল ব্যভিচারকে বুঝা এবং ইহার কঠোরতা সহকারে পালন করা আজকে আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
এ শীল সমাজের লোকদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, ক্ষণিক সুখের জন্য জীবনভরের বিশ্বাস, পরিবারের শান্তি এবং স্বীয় চরিত্রের গরিমাকে নষ্ট করা উচিত নয়। বাস্তবিক স্বাধীনতা মনের ইচ্ছামতো চলার মধ্যে নয়, বরং আত্মসংযমের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। বাস্তবিক প্রেম অধিকারে নয়, বরং সম্মান এবং উত্তর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে।
তথাগত বুদ্ধ ব্যভিচারের নিষেধ কোনো দৈবিক দণ্ড বা ভয়ের কারণে করেননি। তিনি ইহাকে এজন্যই ত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছেন, কেননা ইহা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের লোকদেরকে ইহাই স্মরণ করিয়ে থাকে যে, একটি সুখী পরিবারের ভিত্তি বিশ্বাস, নিষ্ঠা এবং নৈতিক আচরণের উপর টিকে থাকে।
মনুষ্য নিজের মনকে যখন সংযমিত রাখে, নিজের সম্বন্ধ সমূহের সাথে ঈমানদার এবং সম্মান করে থাকে এবং পরস্পরের অধিকার ও মর্যাদাকে শ্রদ্ধা করে থাকে, তখনই সে বাস্তবে ভগবান বুদ্ধের ধম্মকে নিজের জীবনে অনুসরণ করে থাকে।
্যভিচার ক্ষণিক আকর্ষণ দিতে পারে, কিন্তু এর পরিণাম প্রায়:ই দীর্ঘকালীন দুঃখদায়ক হয়ে থাকে। এর বিপরীতে শীলের পালন তৎকাল যদিও কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু তাহাই জীবনভরের শান্তি, বিশ্বাস এবং সুখের আধার হয়ে থাকে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement