বিশ্ব বৌদ্ধদের চার মহাতীর্থের অন্যতম সারনাথ মহাতীর্থ, যা আবার ধম্মচক্র প্রবর্তনের অপরিবর্তনীয় স্থানরূপেও পরিচিত, ইহা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের (UNESCO World Heritage Site) স্মারকরূপে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৫শে জুলাই ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান (Busan) শহরে আয়োজিত ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য সমিতির ৪৮ তম অধিবেশনে ‘Ancient Buddhist Site of Saranath’কে আধিকারিকরূপে বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচীতে (World Heritage List) অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। এর সাথে পুণ্যতীর্থ সারনাথ ভারতের ৪৫ তম বিশ্ব ঐতিহ্য স্থলরূপে স্থান লাভ করেছে।
এখন পর্যন্ত ভারতে ৪৫টি পুরাতাত্বিক স্থলকে ইউনেস্কো দ্বারা যে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তন্মধ্যে বৌদ্ধ স্থল হল ছয়টি। সেগুলি হল-
১) ১৯৮৩ সালে মহারাষ্ট্রের সুপ্রসিদ্ধ অজন্তার গুহা সমূহকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) ঘোষণা করা হয়েছে।
২) ১৯৮৩ সালে মহারাষ্ট্রের ইলোরা বৌদ্ধ গুহা সমূহকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের (World Heritage Site) তালিকাভুক্ত করে ঘোষণা করা হয়েছে।
৩) ১৯৮৯ সালে মধ্য প্রদেশের ঐতিহাসিক সাঁচী স্তূপকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব ঐতিহ্যরূপে (World Heritage Site) ঘোষণা করা হয়েছে।
৪) ২০০২ সালে বিহার প্রদেশের বুদ্ধগয়া মহাবোধি মহাবিহারকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব ঐতিহ্য রূপে (World Heritage Site) ঘোষণা করা হয়েছে।
৫) ২০১৬ সালে বিহার প্রদেশ স্থিত নালন্দা মহাবিহারকে (বিশ্ববিদ্যালয়) বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) রূপে ঘোষিত করা হয়েছে।
৬) এখন ২০২৬ সালে উত্তর প্রদেশ স্থিত তথাগত বুদ্ধের প্রথম ধম্মোপদেশ প্রদানের ঐতিহাসিক স্থল সারনাথকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব ঐতিহ্য রূপে (World Heritage Site) ঘোষণা করা হয়েছে।
ভারতের বৌদ্ধ পরিচয়কে বৈশ্বিক স্তরে স্বীকৃতি দিতে হচ্ছে। বুদ্ধ এবং তাঁর ধম্ম হল ভারতের প্রাণ। পৃথিবী হল ভারতের প্রাণের মধ্যে প্রাণায়ামের আতুর।
আজ ইউনেস্কো দ্বারা সারনাথের বিশ্ব প্রসিদ্ধ ধামেখ স্তূপ এবং চৌখণ্ডী স্তূপ পরিসরকেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচীতে সামিল করা হয়েছে। ইউনেস্কো দ্বারা ইহার আধিকারিক ঘোষণাও করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশ পর্যটনের নিরন্তর তিন বছরের প্রয়াসের মাধ্যমে ইহা সম্ভব করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশ পর্যটনের তৎকালীন প্রমুখ সচিব তথা মহানির্দেশক শ্রী মুখেশ কুমার মেশ্রাম মহোদয়কেই ইহার কৃতিত্ব দিতে হয়।
সারনাথের মহত্ব
———————-
সারনাথ হল সে পবিত্র মহাতীর্থ যেখানে ভগবান তথাগত বুদ্ধ বোধিজ্ঞান লাভের পর বুদ্ধগয়া হতে পায়ে হেঁটে এসে স্বীয় প্রথম ধম্মোপদেশ ‘ধম্মচক্কপ্পবত্তন সূত্ত’ দেশনা করেছিলেন। এখানেই তিনি ধম্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন এবং প্রথম পাঁচজন ঋষিদেরকে দীক্ষা প্রদান করে সঙ্ঘের স্থাপনা করেছিলেন। এ কারণে সারনাথ বৌদ্ধ ধম্মের চার মহাতীর্থের অন্যতম মহান তীর্থরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
ইউনেস্কো দ্বারা মান্যতা প্রদানের কারণ
————————-
বিশ্ব ঐতিহ্য সমিতি কর্তৃক সারনাথকে মুখ্যত: মানদণ্ড (iii) এবং (iv) এর ভিত্তিতে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ইহা হল ২৫০০ বছরের চাইতেও অধিক জীবিত বৌদ্ধ পরম্পরার অদ্বিতীয় স্মারক।
ইহা সরাসরি ভগবান বুদ্ধের প্রথম উপদেশ এবং বৌদ্ধ ধম্মের উদয়ের সাথে যুক্ত রয়েছে।
এখানে মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত তথা পরবর্তী সময়ের স্তূপ, বিহার, চৈত্য এবং পুরাতাত্বিক ধ্বংসাবশেষ সমূহ সুরক্ষিত রয়েছে।
সারনাথের প্রমুখ স্মারক
————————
১) ধামেখ স্তূপ-যেখানে প্রথম উপদেশের সাথে সম্বন্ধিত পরম্পরা যুক্ত রয়েছে।
২) ধম্মরাজিকা স্তূপ- সম্রাট অসোক দ্বারা নির্মিত প্রাচীন স্তূপ।
৩) অসোক স্তম্ভ- যার চার দিশায় চারমুখী সিংহ শীর্ষ বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক (National Emblem)।
৪) চৌখণ্ডী স্তূপ- যেখানে বুদ্ধ পাঁচজন ঋষিদের সাথে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন।
৫) ধম্মচক্র-এখানে ধম্মচক্র প্রবর্তনের স্মারকরূপে সম্রাট অসোক চব্বিশ শলাকা বিশিষ্ট চক্র নির্মাণ করে স্থাপন করেছিলেন। ইহাকে অসোকচক্রও বলা হয়। ইহা বর্তমানে ভারতের জাতীয় পতাকার মাঝখানে স্থাপিত হয়েছে।
৬) প্রাচীন বিহার, স্তূপ সমূহের অবশেষ তথা প্রসিদ্ধ সারনাথ যাদুঘর রয়েছে এখানে।
ভারতের জন্য সারনাথের গুরুত্ব
————————
সারনাথ সহ ভারতে বৈশ্বিক ঐতিহ্য স্থল হয়েছে বর্তমানে ৪৫ টি। সারনাথের বৈশ্বিক স্তরে সংরক্ষণ, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় এর মাধ্যমে বৃদ্ধি হবে।
আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রা এবং পর্যটন অধিক সমৃদ্ধি লাভ করবে। ভারতের বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে বিশ্বস্তরে নতুন প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হবে।
এ স্বীকৃতির জন্য ২৮ বছর অপেক্ষা
—————————-
ভারত সারনাথকে প্রথমবার ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কোর অস্থায়ী (Tentative) সূচীতে সামিল করেছিল। প্রায় ২৮ বছরের প্রক্রিয়া, বিস্তৃত নামাঙ্কন এবং মূল্যাঙ্কনের পরে এখন ইহাকে আধিকারিকরূপে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
0 Comments