Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বুদ্ধ জয়মঙ্গলের পঞ্চম গাথা....5

ভারতে আজকাল অনেক সাধুরাই নামের আগে ভগবান শব্দ যুক্ত থাকেন। তাঁরা নিজেদেরকে ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী বলে প্রচার করে থাকেন। কিন্তু যখন আবার তাঁদের গোপন কাজ কর্মের ফিরিস্তি ফাঁস হয়ে যায়, তখন দেখা যায় তাঁদের কুকর্ম সাধারণ মানুষের চেয়েও জঘন্য বলে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং ভগবান হওয়া এত সহজ নয়। তাঁদেরকে অনেক প্রয়াস-প্রচেষ্টা ও তপস্যার মাধ্যমে তপ্ত হয়ে পরিপক্ক হতে হয়।

মুখে বললেই বা অন্য কেহ প্রচার করলেই কেহ ভগবান হতে পারেননা। কেহ এমনিতেই ভগবান হয়ে পূজনীয় হতে পারেননা। পৃথিবীতে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এতে উত্তীর্ণ হতে হয়।
পালি ভাষায় ‘ভগবান’ শব্দের বিশেষ অর্থ রয়েছে। আমরা দৃষ্টিপাত করতে পারি বুদ্ধের দিকে। তাঁকে ‘ভগবান’ও বলা হয়। যখন আমরা তাঁকে বন্দনা করি তখন বলে থাকি-‘ইতিপি সো ভগবা অরহং……..’ ইত্যাদি অথবা ‘নমো তস্স ভগবতো অরহতো….’।
এখানে বুঝার বিষয় ইহাই যে, ভগবান এবং ঈশ্বর সমার্থক বা পর্যায়বাচক শব্দ নয়। বৌদ্ধেরা যখন বুদ্ধকে ‘ভগবান’ বলে অভিহিত করে থাকেন, তখন ইহার তাৎপর্য এ নয় যে, তাঁরা বুদ্ধকে ঈশ্বর মান্যতা প্রদান করেছেন। তাঁরা বুদ্ধকে ‘ভগবা’ আখ্যা দিয়ে অর্থাৎ ‘ভগবান’ বলে সম্বোধন করে থাকেন। ভগবান বুদ্ধ যে ভাষায় উপদেশ করতেন তাকে ‘অর্ধ মাগধী’ বলা হতো, যা কালান্তরে পালি ভাষা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পালি ভাষায় ‘ভগবা’ অথবা ‘ভগবান’ শব্দের সুপরিভাষিত অর্থ হল-
‘ভগ্গ রাগোতি ভগবা, ভগ্গ দোসোতি ভগবা, ভগ্গ মোহোতি ভগবা, ভগ্গ তণ্হোতি ভগবা।’
পালি ভাষায় ‘ভগ্গ’ শব্দের অর্থ হল ভগ্ন করা, সমূল নষ্ট করা, শিকড় উৎপাটন করা, ধ্বংস বা বিনাশ করা। বানের অর্থ হল তৃষ্ণা। অর্থাৎ যিনি তৃষ্ণাকে সমূলে নষ্ট করে দিয়েছেন, শিকড় উৎপাটন করে দিয়েছেন তিনিই ভগবান।
‘ভগ্গ রাগোতি ভগবা’- অর্থাৎ যিনি রাগ (আসক্তি) ভগ্ন করে দিয়েছেন, তিনিই ভগবান। ‘ভগ্গ দোসোতি ভগবা’- অর্থাৎ যিনি দ্বেষ (হিংসা-ক্রোধ) ভগ্ন করে দিয়েছেন, তিনিই ভগবান। ‘ভগ্গ মোহোতি ভগবা’ অর্থাৎ যিনি মোহ ভগ্ন করে দিয়েছেন, তিনিই ভগবান। ‘ভগ্গ তণ্হোতি ভগবা’-অর্থাৎ যিনি তৃষ্ণা ভগ্ন করে দিয়েছেন, তিনিই হলেন ভগবান। তথাগত বুদ্ধকে এ অর্থে ‘ভগবান’ বলা হয়।
পালি ভাষায় ‘ভগ্গ’ শব্দের আরও এক অর্থ রয়েছে-ভাগীদার এবং ‘বান’ এরও অন্য অর্থ রয়েছে। তা হল সম্পন্ন, সহিত, সহায়ক, উপলব্দি ইত্যাদি। যেরকম বলবান, ধনবান, জ্ঞানবান, রূপবান ইত্যাদি। সেরকমই হল ভগবান। এভাবে, যিনি স্বীয় উপলব্ধিকে অন্য লোকদের মধ্যে বন্টন করে থাকেন, তা আরও অনেক লোকদের ভাগীদার করে থাকেন, তিনিই ভগবান। এজন্য এরূপ অর্থেও তথাগত বুদ্ধকে ‘ভগবান’ বলা হয়।
তথাগত বুদ্ধকে ‘ভগবান’ অর্থে অলৌকিক বা তথাকথিত ‘অবতার’ বুঝায়না। তিনি হলেন বুদ্ধত্বকে উপলব্দি হওয়া মহামানব, যিনি সে মার্গে চলমান থেকে, তাঁর শিক্ষা সমূহের অনুশীলন করে যে কেহ বুদ্ধত্ব অবস্থা উপলব্দ করতে পারেন।
এমনিতে যে কেহ ভগবান হতে পারেননা। স্বয়ংয়ের ত্যাগ, তাতে তপস্যা তো সর্বোপরি, কিন্তু সংসারও তাঁর কম পরীক্ষা নয়। অনেক কঠিন হতে কঠিনতর তপ্ত হওয়ার মাধ্যমে অতিক্রম করতে হয়, অনেক খরাও পার করতে হয়। তখনই জগৎ তাঁকে ভগবান মান্য করে থাকে।
ভগবানের যশ, কীর্তি, প্রভাব-প্রতিপত্তি চতুর্দিকে প্রসারিত হচ্ছিল। জগতের সমস্ত মান, সম্মান, দান-দক্ষিণা বুদ্ধ এবং তাঁর সঙ্ঘের দিকে প্রবাহিত হতে যাচ্ছিল। তজ্জন্য অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা বুদ্ধের প্রতি অতীব হিংসান্বিত হয়ে পড়েছিল। পরিণাম স্বরূপ, তীর্থিকেরা একটি ষড়যন্ত্র রচনা রচনা করেছিল। তারা একজন ব্রাহ্মণ যুবতী চিঞ্চা মানবিকাকে প্রস্তুত করেছিল এরূপ উদ্দেশ্য নিয়ে যে, সে যেন প্রতিদিন জেতবন বিহারে যাতায়াত করে এবং কিছু মাস পরে গর্ভবতী হওয়ার ভাণ করে সার্বজনীনভাবে প্রচার করে যে, সে বুদ্ধের দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। এ সমস্ত ষড়যন্ত্রের জন্য তাকে সুবর্ণ মুদ্রাও উৎকোচ স্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল। মুদ্রার লোভে সে এমন পাপময় দুর্ষ্কর্মরূপ দুর্বচন করতে রাজী হয়েছিল।
পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র অনুসারে এরকমই ভ্রম জাল রচনা করা হয়েছিল। ধম্মপদের লোকবর্গের নিম্নোল্লিখিত গাথার অট্ঠগাথায় চিঞ্চা প্রসঙ্গ সবিস্তারে প্রদত্ত হয়েছে-
‘একং ধম্মং অতীতস্স, মুসাবাদিস্স জন্তুনো,
বিতিণ্ণপরলোকস্স নত্থি পাপং অকারিযং।’
যে ব্যক্তি সত্যের পালন করেনা এবং মিথ্যা ভাষণ করে থাকে, পরলোকের চিন্তা ত্যাগ করেছে, সে ব্যক্তির জন্য এমন কোনো অকরণীয় পাপ নাই, যা করতে সক্ষম হয়না।
ধম্মপদের এ গাথার পৃষ্টভূমিতে ‘চিঞ্চা মাণবিকা বত্থু’ নামে অট্ঠকথা রয়েছে।
তির্থীকদের দ্বারা রচিত ষড়যন্ত্র অনুসারে যুবতী চিঞ্চা প্রতিদিন সন্ধ্যকালে জেতবনের দিকে যেতো। লোকেরা মনে করতো যে, সে জেতবন বিহারে যাচ্ছে। কিন্তু সে বিহারের যেতোনা। সকালে ভোরে ভোরে প্রতিদিন সে জেতবনের আশ-পাশ হতে বের হয়ে আসার ভাণ করতো, যেন সে রাতভর জেতবনে অতিবাহিত করেছে এরূপ ভাণ দেখাতো এবং লোকের মধ্যেও এরূপ সন্দেহের জন্ম নিবে যে, সে জেতবনে রাত্রি যাপন করেছে।
কয়েক মাস পরে, পরিকল্পনা অনুসারে একদিন সে স্বীয় পেটে কাঠের একটি পিণ্ড বেঁধে গর্ভবতীর মতো রূপ ধারণ করেছিল। জেতবনে গেল, ভরা জনসভায় সকলের সম্মুখে বুদ্ধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে-‘হে মহাশ্রমণ! আপনি তো লোকদেরকে অনেক সুন্দর সুন্দর উপদেশ প্রদান করে থাকেন, কিন্তু আমার কোনো খবর রাখছেননা। আমার প্রসবের সময় আসন্ন হয়েছে। আপনি আমার বাসস্থানের ব্যবস্থাও যেমন করছেননা তেমনি সন্তান প্রসবের নিরাপদ ব্যবস্থার কথাও চিন্তা করেছেনা।
এ দৃশ্যের কথা কল্পনা করুন! ভরা জনসভায় সঙ্ঘের সম্মুখে উপাসক-উপাসিকাদের উপস্থিতিতে একজন গর্ভবতী যুবতী ভগবান বুদ্ধের উপর অঙ্গুলিনির্দেশ করছে যে-‘এ গর্ভ হল তোমার!’
সর্ব সমক্ষে চরিত্র হনন এবং মিথ্যারোপের এরকম বিকট স্থিতিতে ভগবান শান্তভাব ধারণ করে প্রসন্ন বদনে স্মিত হাস্যে চিঞ্চাকে বললেন-‘ভগ্নি! সত্যতা তো কেবল তুমি এবং আমিই জানি!’
নির্লজ্জ চিঞ্চা তখনও সত্য বলার মতো দৃঢ়তা সহকারে বলল-‘এ বিষয়ের সত্যতা আমি এবং আপনি ব্যতীত আর কে জানবে?’
পালি অট্ঠকথা বলে থাকে যে, ভগবানের শান্তি এবং সহিষ্ণুতার প্রভাবে দেবেন্দ্রের সিংহাসন কম্পিত হয়েছিল। চিঞ্চার দুর্ব্যবহারে দেবতাগণ কুপিত হয়েছিলেন। কেবল তা নয়, স্বয়ং দেবেন্দ্র একটি ইঁদুরের রূপ ধারণ করলেন এবং গিয়ে চিঞ্চার পেটের বন্ধন কেটে দিলেন। ইঁদুর দ্বারা বন্ধন কাটা মাত্রই পেট হতে কাষ্ঠ পিণ্ড তার পায়ের উপর ধপাস করে পড়ে গেল। তাতে সে পায়ে আঘাতও পেয়েছিল। ভরা জনসভায় তার মিথ্যা আরোপ উন্মোচন হলো।
এরকম বিপরীত পরিস্থিতিতেও ভগবান বুদ্ধ শান্ত এবং সৌম্যভাব ধারণ করে স্থির থেকেছিলেন। ‘সন্তেন সোম বিধিনা’ অর্থাৎ সহিষ্ণু থেকেছিলেন। এরকম ঘটনার সত্যক্রিয়া করা হয়েছে জযমঙ্গল অট্ঠ গাথার পঞ্চম গাথায়-
‘কত্বান কট্ঠমুদরং ইব গব্ভিনীযা
চিঞ্চায দুট্ঠবচনং জনকায মজ্ঝে,
সন্তেন সোম বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
‘কত্বান কট্ঠমুদরং ইব গব্ভিনীযা’ অর্থাৎ যে পেটে কাষ্ঠপিণ্ড বেঁধে স্বয়ংকে গর্ভবতী স্ত্রীর মতো রূপ ধারণ করেছে।
‘চিঞ্চায দুট্ঠবচনং জনকায মজ্ঝে’ অর্থাৎ এরকম চিঞ্চা মাণবিকার দুষ্ট বচনকে সে জনসমূহের মধ্যে শুনিয়েছিল।
‘সন্তেন সোম বিধিনা জিতবা মুনিন্দো’ অর্থাৎ শান্ত এবং সৌম্যতার বিধি দ্বারা মুনীন্দ্র ভগবান বুদ্ধ জয়ী হয়েছিলেন।
‘তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি’ অর্থাৎ সে বুদ্ধের তেজ এবং প্রতাপের দ্বারা আপনার/আপনাদের জয় এবং মঙ্গল হোক।
এ ঘটনা স্পষ্ট শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, যদি আপনি স্বীয় সত্য এবং শীলের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন, তাহলে দেবতাও আপনার রক্ষায় তৎপর হতে থাকবেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement