বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে ভগবান বুদ্ধকে অনেক নামে সম্বোধন করা হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে মুনি, শাক্যমুনি, মহামুনি ইত্যাদি। ‘জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’র আটটি গাথায় ভগবান বুদ্ধকে মুনীন্দ্র আখ্যায়িত করে গুণগান করা হয়েছে।
সুরেন্দ্রের অর্থ হল যিনি হলেন সুরদের অর্থাৎ দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র। নরেন্দ্র মানে হল যিনি নরের মধ্যে ইন্দ্র। রাজেন্দ্র শব্দের অর্থ হল রাজাদের মধ্যে ইন্দ্র। ব্যাকরণে ইন্দ্র প্রত্যয় শ্রেষ্ঠতমের অর্থে প্রযুক্ত হয়ে থাকে। নরেন্দ্র অর্থাৎ নরগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতমকে রাজেন্দ্র বলা হয়।
এখানে সন্দর্ভিত ‘জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’র আটটি গাথায় ভগবানকে মুনীন্দ্র অভিহিত করে গুণকীর্তন করা হয়েছে। মুনীন্দ্র অর্থাৎ মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধ। পালি ভাষায় মুনিন্দো এবং সংস্কৃত ভাষায় হল মুনীন্দ্র।
‘সচ্চং বিহায মতিসচ্চক বাদকেতুং,
বাদাভিরোপিতমনং অতি অন্ধভূতং।
পঞ্ঞাপদীপজ্জ্বলিতো জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
‘সচ্চং বিহায’ অর্থাৎ বাস্তবিক সত্যের পরিত্যাগ করে,
‘মতিসচ্চকবাদ কেতুং’ অর্থাৎ নিজের মতকে সত্য মানতে গিয়ে, স্বীয় মতের পতাকা উত্তোলনকারী সচ্চক, কেতু মানে হল পতাকা। পাতাকা উঁচু করে চলা ব্যক্তি।
‘অতি অন্ধভূতং’ অর্থাৎ নিজের মান্যতা সমূহের প্রতি খুবই অন্ধ।
‘পঞ্ঞাপদীপজ্জ্বলিতো’ প্রজ্ঞার প্রদীপ জ্বালিয়ে,
‘জিতবা মুনিন্দো’ মুনীন্দ্র ভগবান বুদ্ধ জিতে নিয়েছিলেন।
‘তং তেজসা’ মানে তার তেজ প্রভাবে,
‘ভবতু তে জযমঙ্গলানি’ অর্থাৎ আপনার/আপনাদের জয় ও মঙ্গল হোক।
এ গাথার পৃষ্টভূমিতে খুবই রোমাঞ্চকর ঘটনা রয়েছে। ইহার মৌলিক সন্দর্ভ পালি সাহিত্য ত্রিপিটকের সূত্র পিটকান্তর্গত মধ্যম নিকায়ের ‘চূলসচ্চক সূত্র’তে পাওয়া যায়।
ভগবান বুদ্ধের সময়ে বৈশালী নগরে ‘সচ্চক’ নামে একজন অতিবৌদ্ধিক বা হাইলি ইন্টেলেকচুয়াল (Highly Intellectual) দার্শনিকের মতো ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন অতিশয় তার্কিক এবং বাদ-বিবাদে খুবই নিপুণ। স্বীয় মতের উপর তাঁর এতই অভিমান ছিল যে, খোলাখুলিভাবে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন- সংসারে এরকম কোনো শ্রমণ, ব্রাহ্মণ বা বুদ্ধ নাই, যিনি শাস্ত্রার্থে আমাকে পরাজয় করতে পারবেন।’
তিনি নিজেকে নিজে এতই আত্মসম্মোহিত ছিলেন যে, নিজের পেটে লৌহের পাত বেঁধে রাখতেন। বলতেন যে, আমার জ্ঞান এবং বুদ্ধির ভাণ্ডার এতই বিশাল যে, যদি আমি এ লৌহপাত না বাঁধি, তাহলে জ্ঞানের বিস্ফোটক হয়ে আমার পেট ফেটে যেতে পারে।’
বুদ্ধের জ্ঞানানুভূতির তিন মহান নিষ্পত্তি রয়েছে। যেমন-
১)অনিত্যতা
২) দুঃখতা এবং
৩) অনাত্ততা
অর্থাৎ অনিত্য, দুঃখ এবং অনাত্ততা মানে জগতের সমস্ত কিছু অনিত্যময়, দুঃখময় এবং অনাত্তময়।
ভারতের ষড় দর্শনের দু’টি দার্শনিক পরম্পরা রয়েছে-যেগুলি হল নিরীশ্বরবাদী। এগুলিকে নাস্তিক দর্শনের শ্রেণীতে স্থান দেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন হল অনাত্তবাদী দর্শনও। বুদ্ধের জ্ঞানানুভূতির নিষ্পত্তি ইহাই যে, রূপ হল অনাত্ত, বেদনা অনাত্ত, সংজ্ঞা অনাত্ত, সংস্কার অনাত্ত এবং বিজ্ঞান অনাত্ত অর্থাৎ পঞ্চস্কন্ধই হল অনাত্ত।
বৈশালীর প্রকাণ্ড তার্কিক সচ্চক বুদ্ধের অনাত্তবাদকে খণ্ডন করতে চেয়েছিলেন। বলতেন যে, পঞ্চস্কন্ধই হল আমার আত্মা। কেবল তা নয়, বরং বুদ্ধ ও ভিক্ষু সঙ্ঘদেরকে শাস্ত্রার্থ করার জন্য অহঙ্কার পূর্বক আহ্বান করতেন।
এরূপ পর্যন্ত বলতেন-যেদিন বুদ্ধের দেখা হবে, তাঁকে তর্কের দ্বারা এরকমভাবে ধাক্কা দেব, যেরকমভাবে হাতী বড় বৃক্ষকে ধাক্কা দিয়ে থাকে।
একদিন সে সুযোগ এসে গেল, ভগবান বুদ্ধ তাঁর সামনে এসে পড়েছিলেন।
মধ্যম নিকায়ের ‘চূলসচ্চক সূত্র’ ভগবান বুদ্ধের সাথে তাঁর সংলাপের বিস্তৃত বিবরণ আমাদেরকে সরবরাহ করে থাকে।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ বৈশালীর কূটাগার শালায় বিহার করছিলেন। ভগবান বুদ্ধের বৈশালীতে আগমণ হয়েছে শুনে সচ্চক নিজের সাথে পাঁচ শ’ অনুসারীকে সঙ্গে করে বুদ্ধের সাথে শাস্ত্র যুদ্ধ করতে পৌঁছেছিলেন। তিনি স্বীয় জ্ঞানের অহঙ্কারে এতই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, আজ নিজের অনুসারীদের সামনে বুদ্ধকে পরাজিত করব এবং নিজেকে জগত বিজয়ী বলে প্রচার করব এরূপ আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছিলেন।
সূত্রে উল্লিখিত হয়েছে যে, বৈশালীর মহাবনের কূটাগার শালায় বুদ্ধ অবস্থান করছিলেন। তখন সচ্চক নিগণ্ঠপুত্রও বৈশালীতে অবস্থান করতেন, যিনি ছিলেন অতীব বাদ-বিবাদকারী, স্বয়ংকে অনেক বড় পণ্ডিত এবং সমাজে বহু সংখ্যক দ্বারা স্বয়ংকে অনেক সন্মানিত মনে করতেন।
তিনি বুদ্ধের নিকট এসে সচরাচর কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর সংলাপ শুরু করলেন। তাঁর সমস্ত মত-স্থাপনাকে শুনার পর বুদ্ধ তথাগত সচ্চককে বললেন-
‘তং কিং মঞ্ঞসি, অগ্গিবেসণ, যং ত্বং বদেসি,
‘রূপং মে অত্তা’তি,
বত্ততি তে তস্মিং রূপে বসো,
এবং মে রূপং হোতু, এবং মে রূপং মা অহোসী’তি?’
এবং বুত্তে সচ্চকো নিগণ্ঠপুত্তো তুণ্হী অহোসি।’
অর্থাৎ অগ্নিবেশ! তুমি কি মনে কর যে, এ শরীর অর্থাৎ রূপ হল আমার আত্মা? তুমি কি এরূপ বলতে চাচ্ছ?
তাহলে এ শরীরের উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি? অর্থাৎ রূপের উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ আছে কি? আমার শরীর এরূপ হোক এবং এরকম না হোক-সবকিছু তোমার ইচ্ছামতো হয় কি?
ভগবান বুদ্ধ দ্বারা এরকম জিজ্ঞাসা করার পর সচ্চক নিগণ্ঠপুত্র মৌনতা ধারণ করে থাকলেন।
‘তং কিং মঞ্ঞসি, অগ্গিবেসণ, রূপং নিচ্চং বা অনিচ্চং বা’তি?
‘অনিচ্চং, ভো গোতম।’
যং পনানিচ্চং দুক্খং বা তং সুখং বা’তি?’
‘দুক্খং, ভো গোতমা’
যং পনানিচ্চং দুক্খং বিপরিণাম ধম্মং, কল্লং নু তং সমনুপস্সিতুং’
‘এতং মম, এসোহমস্মি, এসো মে অত্তা’তি?’
‘নো হিদং, ভো গোতম।’
অর্থাৎ অগ্নিবেশ! তুমি কি মনে করো যে, রূপ অর্থাৎ শরীর কি নিত্য, না অনিত্য?’
‘হে গৌতম! রূপ হল অনিত্য।’
‘যা অনিত্য, তা দুঃখ না সুখ?’
‘তা দুঃখ, হে গৌতম!’
‘তাহলে যা অনিত্য, দুঃখ এবং পরিবর্তিত হওয়ার স্বভাব সম্পন্ন, তার জন্য কি এরূপ মনে করা সম্যক যে- ইহা হল আমার-‘এতং মম?’ ইহা আমি হই-‘এসোহমস্মি?’ ইহা হল আমার আত্মা-‘এসো মে অত্তা?’
‘না, হে গৌতম! এরকম মনে করা সম্পূর্ণরূপে সম্যক নয়।’
‘সচ্চক! তুমি বলছো যে, এ শরীর এবং মন তোমার আত্মা এবং এদের উপর তোমার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তুমি কি নিজের শরীরকে বলতে পারো যে, এ শরীর যেন কখনও জীর্ণ না হয়, কখনও রোগগ্রস্থ না হয় এবং কখনও বিনাশ না হয়?’
তাতে সচ্চক নিরুত্তর থাকলেন।
সচ্চকের স্থিতি দহনীয় হয়ে গেলো। তিনি নিজের পাঁচ শ’ অনুসারীদেরকে এরূপ আশা নিয়ে এসেছিলেন যে, আজ তিনি সকলের সামনে বিজয় প্রাপ্ত করে জয়জয়কার করবেন, কিন্তু এখানে তিনি বুদ্ধের সামনে নিজেই নিরুত্তর হয়ে শির ঝুঁকিয়ে রইলেন। অহঙ্কারী মন শীঘ্র পরাজয় স্বীকার করতে চায়না।
বুঝার বিন্দু এরূপ যে, প্রজ্ঞা তিন প্রকার হয়ে থাকে। যেমন-
১) শ্রুতময় প্রজ্ঞা
২) চিন্তাময় প্রজ্ঞা এবং
৩) ভাবনাময় প্রজ্ঞা।
শ্রুতময় প্রজ্ঞা অর্থাৎ শুনে অথবা আজকের দিনে পুস্তকাদি অধ্যয়ন করে বিকশিত হওয়া প্রজ্ঞা। ইহা হল প্রথম স্তরের প্রজ্ঞা।
দ্বিতীয় চরণ হল শুনে অথবা পড়ার পর চিন্তন দ্বারা বিকশিত হওয়া প্রজ্ঞা। ইহাকে চিন্তাময় প্রজ্ঞা বলা হয়।
তৃতীয় স্তর হল চিন্তাকৃত বিষয়ে ভাবনা করা। ভাবনা অর্থাৎ ধ্যান-সাধনা। ধ্যান-ভাবনার মাধ্যমে শ্রুতময় এবং চিন্তাময় প্রজ্ঞা পুষ্ট হয়ে থাকে। অন্যথায় অন্যান্য পরিজনদের মৃত্যুর পর জ্ঞানীরা যেরকম বুঝে থাকেন, সেরকম নিজের পরিজনের নিধনে বিলাপ করে করে রোদন করতে থাকে। সমস্ত জ্ঞান যেন নিমিষেই কোথায় হারিয়ে যায়। এরূপ ভাবনাময় প্রজ্ঞার কথাই কথিত তার্কিকদের খেয়ালে দেখা যায়না।
ধম্মের রয়েছে তিনটি অঙ্গ।যেমন-পরিয়ত্তি, প্রতিপত্তি এবং প্রতিবেধ। ইহা আধুনিক শব্দাবলীতে বলতে গেলে বলা যায়-সিদ্ধান্ত, প্রয়োগ এবং সারাংশ। অর্থাৎ থিয়োরী, এক্সপেরিমেন্ট এবং কনক্লুজন। পড়া অথবা শুনা হল পরিয়ত্তি, পড়া এবং শুনা বিষয় সমূহ আচরণে প্রয়োগ করা হল পটিপত্তি এবং অন্তিমে ফল বা সারাংশ হাসিল করা হল প্রতিবেধ ধম্ম।
সচ্চক কেবল শ্রুতময় প্রজ্ঞা পর্যন্ত আয়ত্ব করেছিলেন। সেখানেই তিনি স্থির থেকেছিলেন। তাতেই তিনি নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করতেন। নিজের যুক্তি-তর্ককেই তিনি সত্য মনে করতেন। বর্তমানেও অনেকে এরকম তার্কিক এবং বুদ্ধিমান লোক দেখা যায়, যাঁদের নিকট অনুভবের জ্ঞান হল শূণ্য, কেবল শাস্ত্রগত জ্ঞানে অহঙ্কার করে থাকেন। ঠিক সেরকমই যেরকম একজন কুমারী যুবতী এম. বি. বি. এস, এম. এস, পাশ করে ডাক্তার হয়ে থাকেন। তিনি মাতৃত্ব অর্থাৎ মেটার্নিটির সৈদ্ধান্তিক জ্ঞান ভাল আয়ত্ব করেছেন। কিন্তু অনুভবে হলেন শূণ্য। মাতৃত্ব সম্পন্ন গ্রামের একজন নিরক্ষর নারী এরূপ যখন বলেন-‘আমি হলাম মা’, তাঁর এ কথন হল প্রজ্ঞাপূর্ণ।
অহঙ্কারী ব্যক্তি স্বীয় পরাজয়ও শীঘ্র স্বীকার করতে চায়না। চূলসচ্চক সূত্রে বিবরণ রয়েছে যে, আকাশে বজ্রপাণি যক্ষ হাতে জ্বলন্ত বজ্র নিয়ে ভয় দেখিয়েছিল, যা কেবল সচ্চক এবং ভগবান বুদ্ধেরই দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। যদি সচ্চক সার্বজনীনরূপে স্বীয় পরাজয় স্বীকার না করেন, তাহলে বজ্রপাণি যক্ষার মস্তক সাত টুকরায় বিভক্ত করে ফেলবে।
ভয়ে সচ্চক মস্তক ঝুঁকিয়ে কেবল পরাজয় স্বীকার করেননি, বরং তিনি বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষু সঙ্ঘকে পরের দিন ভোজন দানের জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন। ভগবানও মৌনতা সহকারে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।
এ ঘটনার জয়মঙ্গল অষ্টগাথার ষষ্ট গাথায় নিম্নোক্তভাবে গুণগান করা হয়েছে-
‘সচ্চং বিহায মতিসচ্চকবাদকেতুং,
বাদাভিরোপিতমনং অতি অন্ধভূতং,
পঞ্ঞাপদীপজ্জলিতো জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
এ গাথায় ভগবানের প্রজ্ঞা শক্তির গুণগান রয়েছে-‘পঞ্ঞাপদীপজ্জলিতো জিতবা মুনিন্দো।’ প্রজ্ঞা প্রদীপ জ্বালিয়ে মুনীন্দ্র বুদ্ধ কর্তৃক সে অহঙ্কারী বাদ-বিবাদকারী সচ্চক ব্রাহ্মণকে জয় করেছিলেন।
.jpg)
0 Comments