ইতিহাস
————
শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া হতে ভারত, বাংলাদেশ পর্যন্ত জনপ্রিয় জয়মঙ্গল অষ্টগাথা নামক কর্ণ সুখকর গাথা সমূহের রচনাকার কে? কেননা, এ রচনা ত্রিপিটকে দেখা যায়না। তারপরেও শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত চতুর্থ সঙ্গীতির পরে সঙ্কলিত ‘মহাপরিত্রাণ পাঠ চতুভাণবার পালি’ গ্রন্থে এ গাথা সমূহ পরিশিষ্টরূপে সঙ্কলিত হয়েছে দেখা যায়।
এ গাথা সমূহের মূল উৎস নিয়ে দু’টি সন্দর্ভের উল্লেখ রয়েছে।
প্রথমত, লিখিত রূপে এ গাথা সমূহের সর্বপ্রথম কেন্ডিস্থ ‘Buddhist Publication Society কর্তৃক ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ইতিহাস বিশেষজ্ঞ এ. জি. এস. করিয়াবাসম (A.G.S. Kariyawasam) দ্বারা স্বীয় ‘Buddhist Ceremonies and Rituals of Sri Lanka’ শীর্ষক পুস্তকে উল্লিখিত হয়েছে। সে পুস্তক অনুসারে, এ গাথা সমূহের সর্ব প্রথম স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় শ্রীলঙ্কার পালি ভাষা বিকাশের উৎকর্ষ কাল ষোড়শ হতে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে। কিন্তু রচনাকারের নাম রয়েছে অজ্ঞাত। অনুমান করা হয় যে, এ রচনা পালি ভাষার কোন মর্মজ্ঞ বিদ্বানের কৃতি, যিনি ছিলেন নিশ্চয়ই ছন্দশাস্ত্রেরও বিশেষজ্ঞ ও কবি। তিনি কি উপাসক অথবা ভিক্ষু, তা অজ্ঞাত রয়েছে।
এ. জি. এস. করিয়াবাসমের গ্রন্থে এ রচনা সে আবশ্যক বিষয় সমূহের সূচীতে সামিল রয়েছে, যা প্রত্যেক ভিক্ষু-শ্রামণেরকে অনিবার্যরূপে পড়তে হয়। কেননা, ইহা ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ব হতে স্থাপিত ছিল। এজন্য বিদ্বানদের অনুমান রয়েছে যে, ইহা চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতাব্দী বা তারও পূর্বের রচনা হতে পারে।
দ্বিতীয় লিখিত উৎস থাইল্যান্ড হতে পাওয়া যায়। লিখিত অভিলেখ রয়েছে যে, থাইল্যান্ডের আয়ুত্থ্যা সম্রাজ্যকালে রাজগুরু ওয়াট পাকেও বিহারাধিপতি সঙ্ঘরাজা পরমপূজ্য ফ্রা বনরতন এ অট্ঠগাথাকে ‘বহুম মহক’ নামে শিলালেখনীতে অঙ্কিত করে তৎকালীন সম্রাট নরেসুয়ানকে (১৫৯০-১৬০৫) এরূপ ধম্ম নির্দেশের সাথে উপহার করেছেন যে, তিনি যদি ইহা নিয়মিত পাঠ করেন, তাহলে তিনি যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারবেন।
থাইল্যান্ডের সম্রাট নরেসুয়ান ছিলেন থাই ইতিহাসে খুবই প্রতাপী সম্রাট। রাজকুমারের বিরুদ্ধে স্বীয় প্রসিদ্ধ হাতী যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে এ গাথা সমূহ পাঠ করতেন এবং বিজয়ী হতেন। তখন হতে এ রচনা থাইল্যান্ডে অতীব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সম্রাটের রাজগুরু সঙ্ঘরাজা পূজ্য ফ্রা বনরতনের খ্যাতিও বৃদ্ধি হয়েছিল। সেখানে জয়মঙ্গল অট্ঠগাথা প্রত্যেকের দৈনিক পূজার অঙ্গরূপে স্থাপিত হয়েছিল।
তথাপি ভাষা ইতিহাসের কালক্রম এরূপ প্রসিদ্ধ রচনার মূল স্রোত শ্রীলঙ্কাকেই মান্যতা দিতে হয়। কিন্তু ইহার রচনাকার রয়েছে অজানা।
বাস্তবে পালি ভাষায় রচিত অনেক রচনা সমূহের রচনাকার অজ্ঞাত রয়েছে, কেননা, শতাব্দী পর শতাব্দী পর্যন্ত বুদ্ধ বচন শ্রুত পরম্পরায় সংরক্ষিত রয়েছে এবং রচনাকারেরাও স্বীয় নামোল্লেখকে অহংভাব প্রদর্শন বলে মনে করতেন। উক্ত রচনারারদের এরূপ বিনম্রতা হল শ্রদ্ধার যোগ্য। কিন্তু তথ্য এবং উৎসের সন্ধান পাওয়া না গেলে গবেষকগণকে অনুমান এবং পরোক্ষ প্রমাণ দ্বারা কাজ করতে হয়।
মূল ত্রিপিটকে না থাকার পরেও ইহাকে মহাপরিত্রাণ পাঠ চতুভাণবার পালি গ্রন্থে কেনো সমাহিত করা হয়েছে? এর উত্তরে বলা যায় যে, এ অষ্ট গাথাতে বর্ণিত সমস্ত প্রসঙ্গই রয়েছে মূল ত্রিপিটকে।
যদিও এ জযমঙ্গল অট্ঠগাথা মৌলিক রূপে ত্রিপিটকে নাই, কিন্তু এখানে আটটি গাথায় বর্ণিত ঘটনার মূল উৎস ত্রিপিটকের পৃথক পৃথক সূত্রে অথবা এদের অট্ঠকথা সমূহে বিস্তৃতভাবে পাওয়া যায়। যেমন-
‘বাহুং সহস্সমভিনিম্মিতসাযুধন্তং,
গিরিমেখলং উদিত ঘোর সসেন মারং,
দানাদি ধম্ম বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
এ প্রথম গাথায় বর্ণিত মার বিজয়ের মূল স্রোত সূত্র পিটকের সূত্ত নিপাতের পধান সূত্ত এবং জাতক অট্ঠকথার নিদান কথাতে উল্লেখ রয়েছে।
২) মারাতিরেকমভিযুজ্ঝিত সব্বরত্তিং,
ঘোরম্পনালবকমক্কমথদ্ধযক্খং,
খন্তিসুদন্ত বিধিনা জিতবা মূনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
দ্বিতীয় এ গাথায় বর্ণিত আলবক যক্ষ বিজয়ের প্রসঙ্গ সুত্ত পিটকের সূত্র নিপাত গ্রন্থের আলবক সূত্রে পাওয়া যায়।
৩) নালাগিরিং গজবরং অতিমত্থভূতং,
দাবগ্গি চক্কমসনীব সুগারুণন্তং,
মেত্তম্বুসেক বিধিনা জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
তৃতীয় গাথায় বর্ণিত নালগিরি হাতীকে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক মৈত্রী বলের দ্বারা জয় করেছিলেন। এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে বিনয় পিটকের চুলবর্গ গ্রন্থে।
৪) উক্খিত্ত খগ্গমতিহত্থ সুদারুণন্তং,
ধাবন্তি যোজনপথঙ্গুলিমালবন্তং,
ইদ্ধীভিসঙ্খতমনং জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
চতুর্থ গাথায় রচিত নরহন্তা অঙ্গুলিমাল প্রসঙ্গের মূল উৎস সূত্র পিটকের মধ্যম নিকায়ের অঙ্গুলিমাল সূত্রে রয়েছে।
৫) কত্বান কট্ঠমুদরং ইব গব্ভিনীযা,
চিঞ্চায দুট্ঠবচনং জনকায মজ্ঝে,
সন্তেন সোম বিধিনা জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
এ পঞ্চম গাথার চিঞ্চা প্রসঙ্গ সূত্র পিটকের খুদ্দক নিকায়ের ধম্মপদ অর্থকথার লোকবর্গে বর্ণিত হয়েছে।
৬) সচ্চং বিহায মতিসচ্চক বাদকেতুং
বাদাভিরোপিতমনং অতি অন্ধভূতং,
পঞ্ঞাপদীপ জলিতো বিধিনা জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
ষষ্ট এ গাথার মিথ্যাদৃষ্টিক সচ্চকের সাথে বুদ্ধের তর্ক প্রসঙ্গের মূল স্রোত সূত্র পিটকের মধ্যম নিকায়ের চুলসচ্চক সূত্রে রয়েছে।
৭) নন্দোপনন্দ ভূজগং বিবুধং মহিদ্ধিং,
পুত্তেন থের ভূজগেন দমাপযন্তো,
ইদ্ধুপদেস বিধিনা জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
এভাবে সপ্তম গাথায় রচিত নন্দোপনন্দ ভূজঙ্গ বিজয়ের কথানকের মূল স্রোত বিশুদ্ধিমার্গের মধ্যে রয়েছে, যা হল অনুপিটকের অঙ্গ।
৯) দুগ্গাহদিট্ঠি ভূজগেন সুদট্ঠ হত্থং
ব্রহ্মা বিশুদ্ধি জুতিমিদ্ধি বকাভিধানং,
ঞাণগদেন বিধিনা জিতবা মনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।
অষ্টম এ গাথায় বর্ণিত বক ব্রহ্মার মান মর্দনের প্রসঙ্গ সূত্র পিটকের মধ্যম নিকায়ের ব্রহ্মনিমন্তিক সূত্রে নিহিত রয়েছে।
সম্রাট অসোকের সংরক্ষণে আয়োজিত তৃতীয় সঙ্গীতিতে সঙ্গীতির অধ্যক্ষ অরহত মোগ্গলিপুত্র তিষ্য স্থবির দ্বারা বুদ্ধ ধম্মের নামে উৎপন্ন মিথ্যা মত সমূহের খণ্ডনের নিমিত্তে রচিত গ্রন্থ ‘কথাবত্থু’ ত্রিপিটকের অঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কেননা সমস্ত খণ্ডন অথবা মণ্ডন ভগবান বুদ্ধের মূল বাণী ত্রিপিটকের আলোকে করা হয়েছিল। কালান্তরে ভিক্ষু নাগসেন এবং যবনরাজ মিলিন্দের মধ্যে সম্পন্ন প্রসিদ্ধ বার্তালাপ ‘মিলিন্দ প্রশ্ন’কেও অনুপিটক রূপে মান্যতা প্রদান করা হয়েছে। আচার্য বুদ্ধঘোষের ‘বিশুদ্ধিমার্গ’ এবং টীকা সমূহকেও অনুপিটকরূপে গ্রহণ করা হয়েছে। কেননা, এসবের মূল স্রোত হল বুদ্ধ বচন সমূহের ত্রিপিটক। শ্রীলঙ্কায় সংরক্ষিত করে আচার্য বুদ্ধঘোষ অর্থকথা এবং টীকা সমূহের রচনা করেছেন, যেগুলি ত্রিপিটককে বুঝার জন্য সহায়ক গ্রন্থরূপে গ্রহণ করা হয়েছে।
তাৎপর্য ইহাই যে, কালান্তরে রচিত রচনা সমূহকেও ত্রিপিটক বা অনুপিটক রূপে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। যাতে এ সমস্ত রচনা ত্রিপিটক হতে প্রমাণিত হয়, বুদ্ধ বচন হতে বাহিরে না হয় এবং পালি ভাষাতে হয়।
শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত চতুর্থ সঙ্গীতির পরে সঙ্কলিত ‘মহাপরিত্ত পাঠ চতুভাণবার’ পালির উপগ্রন্থ অর্থাৎ পরিশিষ্টে সম্মিলিত অনেক সূত্র মৌলিকরূপে ত্রিপিটকে দেখা যায়না, কিন্তু মহাপরিত্ত পাঠের অঙ্গ হয়েছে, কেননা সে সূত্র সমূহ ত্রিপিটকের পরিধি এবং মানকের অন্তর্গত। যেমন, মহাজযমঙ্গল গাথা, চতুরা রক্খা, জিনপঞ্জর গাথা, অট্ঠবীসতি পরিত্ত, জলনন্দন পরিত্ত, জয় পরিত্ত, সীবলী পরিত্ত, সুবণ্ণদোণি, অট্ঠসংবেগ ইত্যাদি হল সূত্র উপগ্রন্থের অঙ্গ।
একজন শ্রদ্ধা সম্পন্ন বৌদ্ধের জীবনে জযমঙ্গল অট্ঠগাথা দৈনিক পূজা-বন্দনার অঙ্গ হওয়া উচিত। প্রত্যেকের উচিত জযমঙ্গল অট্ঠগাথা কণ্ঠস্থ করে নিত্য পাঠ করা।
0 Comments