Hot Posts

6/recent/ticker-posts

স্বয়ংয়ের করণীয় স্বয়ংকেই করতে হয়

আমাদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন, যাঁরা কোনো কথিত মার্গ লাভী অর্থবা ধম্মচার্যের সান্নিধ্য প্রাপ্ত হওয়াকে অত্যন্ত দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী এবং পুণ্য লাভী বলে মনে করে থাকেন। কেবল তা নয়, এরকম লোকেরা গর্বের সাথে যত্রতত্র গলার উঁচু করে বলতেও শুনা যায় যে, আমি অমুক ভন্তের বা আচার্যের সান্নিধ্যে ছিলাম বা তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তাঁকে সেবা করেছি, তাঁর উপদেশ শুনেছি এবং তাঁর মার্গ দর্শনও পেয়েছি। তাঁর মতো মহাপ্রাণের সাক্ষাৎ পাওয়া, সেবা করতে পারা, ধম্ম শুনতে পারা, মার্গ দর্শন পাওয়া বুঝতে হবে যে, তা হল নিশ্চিতরূপেই কল্যাণকারী। কিন্তু কেবল কোনো উচ্চ সাধক-সাধিকা কিংবা আচার্যের সমীপে থাকলে, সেবা করলে, ধম্ম শুনলে, উপদেশ শুনলে অথবা মার্গদর্শন লাভ মাত্র হতে মনে এরূপ অহঙ্কার, গর্ব বা আমিত্বভাব পোষণ করা উচিত বা সমীচীন নয় যে, আমিও উচ্চ স্তরের ধম্মচারী কিংবা ধম্মের সাধক-সাধিকা হয়ে গিয়েছি। অথবা লোকদেরও মনে করা উচিত নয় যে, তিনি উচ্চস্তরের কোনো কিছুর লাভী হয়েছেন।
যেভাবে একই পাত্রে রাখা কাপুর বা হিং নিজের নিজের গুণধম্ম ত্যাগ করেনা, কাপুরের সুগন্ধ হীংয়ের মধ্যে নিজেই নিজ থেকে আসেনা বা হিংয়ের গুণধম্মও কাপুরের মধ্যে প্রবেশ করেনা, অনুরূপভাবে প্রত্যেক মানুষের সাধনা, কর্ম, সংস্কার, প্রয়াস এবং আন্তরিক গুণধম্ম পৃথক-পৃথক হয়ে থাকে। কোনো মহান সাধক-সাধিকা বা আচার্যের নিকটতা প্রেরণা এবং মার্গ দর্শন দিতে পারে, কিন্তু তাঁর সাধনার ফল নিজের মধ্যে অনুশীলন ব্যতীত কেবল নিকটে থাকলেই কখনও উৎপন্ন হবেনা।
বৌদ্ধ ইতিহাসে ইহার অত্যম্ত সুন্দর এবং যথার্থ উদাহরণ হলেন ধম্মভাণ্ডাগারিক বুদ্ধের প্রধান সেবক (উপস্থায়ক) ভদন্ত আনন্দ স্থবির। তিনি তথাগত বুদ্ধের চাচাতো ভাই, বুদ্ধের অত্যন্ত নিকটে অবস্থান করেছেন, দীর্ঘ পঁচিশ বছর তাঁর সেবা করেছেন, তাঁর প্রায় সমস্ত দেশনা শ্রবণ করেছেন ও কণ্ঠস্থ করেছেন এবং তিনি ধম্মেরও অতীব গম্ভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি তথাগত বুদ্ধের সাথে ছায়ার ন্যায় অহোরাত্র অবস্থান করেছেন এবং তাঁর সেবায় নিজের জীবন ব্যতীত করেছেন। কিন্তু সেবা এবং ধম্মের স্মৃতি-সংরক্ষণে তিনি অত্যধিক মনোযোগী ও ব্যস্থ থাকার কারণে নিজের জন্য সেরকম গভীর ব্যক্তিগত সাধনা করেননি, যদ্বারা তাঁর অরহত্ব প্রাপ্তির জন্য যতটুকু অনুশীলনের প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি।
পরিণাম স্বরূপ, তথাগত বুদ্ধের এত দীর্ঘকাল কাছে থেকেও বুদ্ধের জীবিত থাকা অবস্থায় আয়ুস্মান আনন্দ স্থবির অরহত্ব ফল লাভ করতে পারেননি। বৌদ্ধ সাহিত্য ও পরম্পরা অনুসারে, বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরেই তিনি গভীর ধ্যান-ভাবনা করে প্রথম ধম্ম মহাসঙ্গীতি প্রারম্ভের ঠিক পূর্ব ক্ষণে অরহত্ব ফলে উপনীত হয়েছিলেন।
এরূপ প্রসঙ্গের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধম্ম সন্দেশ পাওয়া গিয়েছে যে-‘অরহত্বের সেবা অবশ্যই করবেন, ধম্মাচার্যের সেবা, সম্মান অবশ্যই করবেন, তাঁদের সান্নিধ্যে অবস্থান করে অবশ্যই শিখবেন এবং তাঁদের মার্গদর্শন অবশ্যই গ্রহণ করবেন, কিন্তু নিজের মুক্তির সাধনা স্বয়ংকেই করতে হবে। বুদ্ধ নিজেও বলেছেন-‘অত্তা হি অত্তনো নাথো, কোহি নাথো পরোসিযা?’ অর্থাৎ নিজেই নিজের আশ্রয়, আশ্রয়ের অপর আর কে আছে?
কোনো আচার্য্য বা আচার্য্যা আমাদেরকে মার্গ দর্শাতে পারেন এবং ধম্মের মার্গে চলার জন্য প্রেরণা দিতে পারেন, কিন্তু মার্গের উপর চলা, নিজের ক্লেশ রাশিকে অবলোকন করা, তৃষ্ণা এবং অহঙ্কারকে ক্ষীণ করা এবং নির্বাণের দিকে এগিয়ে যাওয়া হল সাধক-সাধিকাগণের নিজেরই কাজ।
এজন্য কোনো মহান সাধক-সাধিকা বা আচার্যের নৈকট্য পাওয়াকে নিজের মধ্যে ধম্ম বুঝার অহঙ্কার পোষণ ত্যাগ করা উচিত। মহাপ্রাণের আলোতে নিজের মার্গ অনুসন্ধান করতে হবে। কিন্তু চলতে হবে নিজের পায়ের দ্বারা। আমার জন্য অন্য কেহ হাঁটবেনা। হাঁটলেও আমাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেনা।
আচার্য মার্গ দেখিয়ে থাকেন, ধম্মের দিশা দেখিয়ে থাকেন, কিন্তু সাধনা-ভাবনা স্বয়ংকেই করতে হয়। ইহাই হল বিনয়, ইহাই হল সম্যক দৃষ্টি এবং ইহাই হল বিমুক্তি মার্গের বাস্তবিক প্রারম্ভ।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement