Hot Posts

6/recent/ticker-posts

সম্রাট হর্ষবর্ধন, ভাষ্কর বর্মা এবং হিউয়েন সাং: ঐতিহাসিক এবং কুটনৈতিক সম্বন্ধের সারগর্ভ অধ‍্যয়ন

চৈনিক বৌদ্ধ বিদ্বান ও পর্যটক ভিক্ষু হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪) সপ্তম শতাব্দীতে (৬৪২-৬৪৩) ভারতে এসেছিলেন। তখন কামরূপের (বর্তমান আসাম) রাজা ভাষ্কর বর্মা (৬০০-৬৫০) দ্বারা তাঁকে অভূতপূর্ব সম্মান-সৎকার ও অভ্যর্থনা করা হয়েছিল। এরপর তিনি সম্রাট হর্ষবর্ধন (৫৯০-৬৫০) দ্বারা আয়োজিত কন্নৌজের মহান ধাম্মিক সভায়ও সম্মানিত হয়েছেন। এ ঘটনাক্রম হল প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, কূটনীতি এবং জ্ঞান-পরম্পরার এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়।

ভাগ-১: কামরূপ আগমণ এবং ‘হো-লী’র বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক রহস্য
———————————-
১) প্রাথমিক ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক প্রমাণ
——————————
‘The Life of Hiuen-Tsiang’
———————————-
হিউয়েন সাংয়ের জীবনী লেখক হুই লী (Hwui-Li) দ্বারা রচিত গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন হিউয়েন সাং কামরূপ হতে উত্তর ভারতের দিকে প্রস্থান করছিলেন, তখন রাজা ভাষ্কর বর্মা তাঁকে অত্যধিক বৃষ্টি এবং তীব্র গরম হতে সুরক্ষার জন্য ‘হো-লা’ (Ho-Li/ Ho-La-Li) নামক টুপি (জাপী) উপহার দিয়েছিলেন।
‘সী-য়ু-কী’ (SI-YU-KI):
——————————-
স্বয়ং হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ বিবরণী ‘সী-য়ু-কী’ নামক ডাইরীতে কামরূপের ভূগোল, বর্ষা প্রধান মৌসুম তথা বাঁশ এবং তালের পাতা দ্বারা হস্তনির্মিত সুরক্ষাত্মক আবরণ সমূহের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
২) ভাষা এবং নৃ-তত্ত্ব বিজ্ঞান (Ethnographic) সাক্ষ্য ‘হো-লী’ হতে ‘জাপী’তে রূপান্তর:
——————————-
‘ইতিহাসকার ড. বাণীকান্ত কাকতি এবং অন্যান্য ভাষাবিদগণের মতে, চীনা লিপিতে স্থানীয় কামরূপী শব্দের ধন্যাত্মক লিপ্যান্তর (Phonetic Transliteration) করা হতো।
কামরূপের মূল ভাষায় (বোড়ো-কছারী এবং প্রাচীন অসমীয়া) বাঁশ/ তাল পাতা হতে নির্মিত পারম্পরিক টুপিকে জাপী (Jaapi) বা ঝাপী বলা হতো। চৈনিক উচ্চারণে এ শব্দ ‘হো-লী-‘ বা ‘হো-লা-লী’ রূপে উল্লিখিত হয়েছে।
৩) বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশ উপযোগী (Material Culture) জলবায়ু অনুকুল ডিজাইন:
——————————
আসামের ভূ-ভাগ অত্যধিক আর্দ্রতা এবং বর্ষার জন্য প্রসিদ্ধি রয়েছে। বাঁশ, বেত এবং তাল/টোকা পাতা দ্বারা নির্মিত শঙ্কাকৃতি (Cone-Shaped) জাপী জল নিরোধক (Waterproof) হওয়ার সাথে সাথে মাথার পাশে বায়ু-সঞ্চালনও (Air-Circulation) সুগম হয়ে থাকে।
রাজা ভাষ্কর বর্মার এ উপহার কেবল একটি প্রতীকাত্মক সম্মান ছিলনা, বরং ভ্রমণ কালীন বিদ্বানের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার এক ভৌতিক-বিজ্ঞানের সমাধানও ছিল।
ভাগ-২: কন্নৌজের মহাসভা (৬৪৩ খৃষ্টাব্দ)-জ্ঞান, ধম্ম এবং কূটনীতির মহাসঙ্গম-কামরূপ হতে বিদায় নিয়ে হিউয়েন সাং সম্রাট হর্ষবর্ধনের আমন্ত্রণে রাজধানী কন্নৌজে (বর্তমান উত্তর প্রদেশের কানপুর) এসেছিলেন, যেখানে রাজা ভাষ্কর বর্মা নিজেও স্বীয় নৌকা-বহরের সাথে সামিল হয়েছিলেন।
১) আয়োজনের স্বরূপ এবং উদ্দেশ্য:
—————————
সম্রাট হর্ষবর্ধন হিউয়েন সাংয়ের বৌদ্ধিক জ্ঞান শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান করতে এবং বৌদ্ধ ধম্মের মহাযান শাখার প্রচার-প্রসারের জন্য ২৩ দিবসীয় এ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন।
বিশাল উপস্থিতি:
———————-
এ মহা সম্মেলনে কুড়ি জনেরও অধিক মিত্র/ সামন্তরাজা, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১,০০০ বিদ্বান, মহাযান এবং হীনযান (থেরবাদ) সম্প্রদায়ের ৩,০০০ হাজার ভিক্ষু এবং সহস্রাধিক ব্রাহ্মণ এবং জৈন বিদ্বান একত্রিত হয়েছিলেন।
২) মুখ্য পাত্রগণের বিশিষ্ট ভূমিকা সমূহ-হিউয়েন সাং (সভাপতি এবং মুখ্য বক্তা):
———————————-
হিউয়েন সাংকে এ বিশাল মহাসভার অধ্যক্ষ (Presiding Scholar) রূপে সমাসীন করা হয়েছিল।
হিউয়েন-সাং (অধ্যক্ষ এবং মুখ্য বক্তা)- সম্রাট হর্ষবর্ধনের বিশেষ অনুরোধে হিউয়েন সাংকে এ মহান ধাম্মিক সভার অধ্যক্ষ (Presiding Scholar) নিযুক্ত করা হয়েছিল।
হিউয়েন-সাং মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের উপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন এবং স্বীয় যুক্তির পক্ষে এক নিবন্ধ উপস্থাপিত করেছিলেন। তিনি খোলাখুলিভাবে হুসিয়ারী প্রদান করেছিলেন যে, যদি কোনো বিদ্বান তাঁর একটি শব্দকেও ভুল প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাঁরা তাঁর মস্তক ছিন্ন করতে পারবেন।
আঠার দিন পর্যন্ত কোনো বিদ্বান তাঁর সিদ্ধান্ত সমূহের খণ্ডন করতে পারেননি এবং তাঁকে অন্তত: ‘মহাযানদেব’ এবং ‘মোক্ষদেব’ এ দু’টি উপাধি দ্বারা বিভূষিত করা হয়েছিল।
কামরূপ নরেশ ভাষ্কর বর্মা (বিশিষ্ট সহযোগী): রাজা ভাষ্কর বর্মা স্বয়ং শৈব মতের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান, নিষ্ঠা এবং কূটনীতিক দৃষ্টি ছিল অতুলনীয়।
প্রতিদিন বের হওয়া বুদ্ধের সুবর্ণ মূর্তির শোভাযাত্রায়
———————————
সম্রাট হর্ষবর্ধন ‘ইন্দ্রের’ (শক্র) রূপ ধারণ করে বুদ্ধ মূর্তির উপর ছত্র (Canopy) স্থাপন করতেন।
কামরূপের রাজা ভাষ্কর বর্মা (বিশিষ্ট মিত্র এবং সংরক্ষক)-রাজা ভাষ্কর বর্মা স্বীয় সেনা এবং বিশাল নৌকা বহরের সাথে ব্রহ্মপুত্র নদ হতে গঙ্গা নদীর মার্গে কন্নৌজে পৌঁছেছিলেন।
সাংস্কৃতিক এবং ধাম্মিক ভূমিকা
——————————
প্রতিদিন বের হওয়া ভগবান বুদ্ধের স্বর্ণ মূর্তির ভব্য শোভাযাত্রাতে সম্রাট হর্ষবর্ধন স্বয়ং ইন্দ্রের বেশ ধারণ করে বুদ্ধের মূর্তির উপর ছত্র (Canopy) স্থাপন করতেন।
কামরূপের রাজা ভাষ্কর বর্মা ‘ব্রহ্মা’র বেশ ধারণ করে বুদ্ধ মূর্তির উপর শ্বেত পতাকা ঝুলিয়ে সাথে সাথে চলতেন।
এরূপ দৃশ্য পূর্বোত্তর ভারত (কামরূপ) এবং উত্তর ভারতের (কন্নৌজ) মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক এবং কূটনৈতিক সম্বন্ধ দর্শিয়ে থাকে।
সম্রাট হর্ষবর্ধন (সংরক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক)
————————————
সম্রাট হর্ষবর্ধন এ সভার জন্য গঙ্গার তীরে একটি বিশাল মণ্ডপ এবং ১০০ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন স্তম্ভ বানিয়ে দিয়েছিলেন, যার উপর বুদ্ধের বিশাল স্বর্ণ মূর্তি স্থাপন করেছিলেন।
যখন সভার সময়ে বৈচারিক মতভেদের কারণে মণ্ডপে হিংসাত্মক ঘটনা এবং সম্রাট হর্ষবর্ধনের উপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল, তখন সম্রাট অতীব সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং হিউয়েন সাংয়ের পূর্ণ সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছিলেন।
সারাংশ
————-
রাজা ভাষ্কর বর্মা দ্বারা হিউয়েন সাংকে ‘হো-লী’ (জাপী) উপহার দেওয়া পূর্বোত্তর ভারতের সমৃদ্ধ ব্যবহারিক পরম্পরারই প্রমাণ, তখন তাহাই হল কন্নৌজের সহভাগিতা ভারতের বৈচারিক উদারতা এবং সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার উদাহরণ। এর সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত হল পুরাতাত্বিক তাম্রপত্র সমূহে (যেমন দুবী এবং নিধানপুর অভিলেখ), ভাষা সাক্ষ্য এবং প্রামাণিক ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি সমূহের পরীক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে সিদ্ধ এবং স্বর্ণিম ইতিহাস।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement