Hot Posts

6/recent/ticker-posts

মৌর্যগণ কি মূল নিবাসী ছিলেন অথবা ক্ষত্রিয়?

 



মৌর্যগণ কি মূল নিবাসী ছিলেন অথবা ক্ষত্রিয়? চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জাতি সম্বন্ধে পৃথক পৃথক দাবীর সত্যতা আমরা বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহের আলোকে জানতে চেষ্টা করবো।

Mauryan Dynasty Caste
————————————
ইতিহাসে এ প্রশ্ন দীর্ঘ সময় হতে চর্চার বিষয় রয়েছে যে, মৌর্যগণ কি ক্ষত্রিয় ছিলেন অথবা মূল নিবাসী? বৌদ্ধ গ্রন্থানুসারে কোশল মহাজনপদ, শাক্যগণ, বিডুঢ়ব এবং পিপ্পলীবনের ঘটনা সমূহের পরে মৌর্য বংশের উৎপত্তি হতে যুক্ত এক বহুল আলোচিত কাহিনী আমাদের সামনে এসেছে। আসুন, আমরা তা বিস্তারভাবে জানতে সচেষ্ট হই।
মৌর্য বংশের নাম ভারতীয় ইতিহাসে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকের কারণে সবচেয়ে প্রমুখ রাজবংশের মধ্যে গণ্য করা হয়। কিন্তু এ রাজবংশের সামাজিক এবং বংশগত পরিচয়কে নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ মৌর্যদেরকে মূল নিবাসী ক্ষত্রিয় বলে বর্ণিত হয়েছে এবং পিপ্পলীবনের মৌর্যদের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। পূর্বের বৌদ্ধ পরম্পরা তাঁদেরকে শাক্য পরম্পরার সাথেও যুক্ত করেছে। শাক্যদের বংশ পরম্পরা ইক্ষাকু বা সূর্যবংশের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে। সেখান হতে মৌর্যদেরকে ভগবান রামের ইক্ষাকু বংশের সাথে যুক্ত করার দাবী সামনে আনা হয়। কিন্তু পৌরাণিক কাহিনী এবং যুক্তির মধ্যে ইতিহাসের এ দাবীর সীমা বুঝার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
পিপ্পলীবনের মৌর্যদের সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ
—————————————-
মৌর্যদের উৎপত্তিকে বুঝতে বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ হল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ নিকায়ের মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরে তাঁর শরীর অবশেষ বন্টনের প্রসঙ্গ এসে থাকে। তাতে পিপ্পলিবনের মৌর্যদের সম্বন্ধে উল্লিখিত হয়েছে। মৌর্যগণ বলেছিলেন-‘বুদ্ধ ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং আমরাও ক্ষত্রিয়। এজন্য আমরাও বুদ্ধের পবিত্র ধাতু অবশেষের এক অংশ পাওয়ার অধিকারী।’ এ মৌর্য বা মোরিয় সম্প্রদায়ের ক্ষত্রিয় হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন স্রোত বা উৎসের মধ্যে একটি বলে মান্য করা হয়।
পিপ্পলীবন হতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য পর্যন্ত
——————————-
পরের বৌদ্ধ পরম্পরা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে এ মৌর্যকুলের সাথে যুক্ত করেছে। সিংহলী ইতিহাস পরম্পরায় ‘মহাবংশ’ গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্তকে মৌর্য ক্ষত্রিয় কুলের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে, এখানে মহত্বপূর্ণ বিষয় ইহাও উল্লেখ করা আবশ্যক যে, মহাবংশ চন্দ্রগুপ্তের সময়ের সমকালীন গ্রন্থ নয় এবং তা কয়েক শতাব্দী পরে লিখিত হয়েছে। এজন্য ইতিহাসকারেরা ইহার বিবরণকে এক পরম্পরা রূপে দেখে থাকেন। যাকে অন্য স্রোতের সাথে মিলিয়ে বুঝার প্রয়োজন হয়।
শাক্যদের সাথে যুক্ত হওয়া মৌর্য বংশ
———————————-
বৌদ্ধ পরম্পরার পূর্বের কথা মৌর্যদেরকে শাক্যদের সাথে যুক্ত করা হয়। ভগবান গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং ছিলেন শাক্যকুল জাত। কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ এবং পরের পরম্পরায় বলা হয়েছে যে, শাক্য পরিবারের এক শাখা পৃথক হয়ে মৌর্য সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং পিপ্পলীবনে বসবাস করতে শুরু করেছিল। এ পরম্পরার ভিত্তিতে চন্দ্রগুপ্তকে শাক্য পরম্পরার সাথে যুক্ত করার প্রয়াস করা হয়েছে। বাস্তবে সমগ্র এ বংশক্রমের প্রত্যেক দিকের জন্য চন্দ্রগুপ্তের সময়কালের প্রত্যক্ষ কোনো অভিলেখ উপলব্দ হয়নি।
আবার ভগবান রামের ইক্ষাকু বংশের সম্পর্ক এসেছে কিভাবে?
————————————
শাক্যগণ স্বীয় পরম্পরায় স্বয়ংকে ইক্ষাকু অর্থাৎ ওক্কাকের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ইক্ষাকু পরম্পরাকে ভারতীয় ধার্মিক সাহিত্যে সূর্যবংশের সাথে যুক্ত করা হয়েছে এবং রামকেও এ ইক্ষাকু পরম্পরার রাজা মান্য করা হয়। এজন্য যদি বৌদ্ধ পরম্পরায় প্রদত্ত শাক্যদের সাথে মৌর্য সম্বন্ধকে স্বীকার করা হয়, তাহলে মৌর্যদেরকে ব্যাপক ইক্ষাকু বা সূর্যবংশী পরম্পরার সাথে যুক্ত করার ভিত্তি রচিত হয়। কিন্তু এখানে ইতিহাস এবং পরম্পরায় পার্থক্য করা আবশ্যক। ঐতিহাসিকরূপে উপলব্দ প্রমাণ এরূপ সাক্ষ্য দেয়না যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ভগবান রামের সরাসরি বংশজ ছিলেন। এরূপ দাবী হল মুখ্যরূপে পরের বংশ পরম্পরা এবং ধার্মিক আখ্যান (Narrative) সমূহের ভিত্তি। ইহাকে প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক তথ্য বলা সঠিক হবেনা।
আবার মৌর্যদেরকে মূল নিবাসী বানানোর কথা আসলো কোথা হতে?
———————————
মৌর্যদের উৎপত্তিকে নিয়ে অন্য পরম্পরার মধ্যেও তথ্য দেখা যায়। ব্রাহ্মণদের সাথে যুক্ত কিছু উৎস এবং পরের ব্যাখ্যা সমূহে চন্দ্রগুপ্তকে নন্দ বংশের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংস্কৃত নাটক মুদ্রারাক্ষসে চন্দ্রগুপ্তের জন্য বৃশাল (বৃষল) এবং কুলহীনের মতো শব্দ পাওয়া যায়। পরের কিছু ব্যাখ্যাকারেরাও এ সমস্ত শব্দকে নিম্ন সামাজিক স্থিতি বা মূল নিবাসী শুদ্রের সাথে যুক্ত করেছেন।
ইতিহাসকারগণের সামনে কোন্ ছবি তৈরী হয়?
——————————-
মৌর্য বংশের উৎপত্তিকে নিয়ে প্রাচীন সমস্ত স্রোত এক রকম কাহিনী বলতে দেখা যায়না। জৈন পরম্পরা চন্দ্রগুপ্তের পৃথক পৃষ্টভূমি বলে থাকে। ব্রাহ্মণ্যবাদী পরম্পরায় নন্দদের সাথে সম্বন্ধের কথা পাওয়া যায়। অপরদিকে বৌদ্ধ পরম্পরায় তাদেরকে মৌর্য ক্ষত্রিয় কুলের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। আধুনিক ইতিহাস লেখনীতে চন্দ্রগুপ্তের প্রারম্ভিক পারিবারিক পৃষ্ঠভূমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হওয়া যায়না।
উপলব্দ প্রাচীন বৌদ্ধ উৎসের আধারে মৌর্যদের ক্ষত্রিয় হওয়া হল একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক পরম্পরা। পিপ্পলীবনের মৌর্যদেরকে ক্ষত্রিয় বর্ণনাকারী মহাপরিনির্বাণ সূত্র এদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু মৌর্যদেরকে সরাসরি ভগবান রামের বংশজ বানানোর জন্য সেরকম প্রাচীন তথ্য নয়। যেরকম কোনো অভিলেখ বা তৎকালীন নথি দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার মত দেখা যায়না। এজন্য সবচেয়ে সঠিক ইহাই যে, মৌর্যদেরকে বৌদ্ধ পরম্পরায় ক্ষত্রিয় এবং শাক্য পরম্পরার সাথে সম্বন্ধিত বলা হয়েছে। কিন্তু রামের প্রত্যক্ষ বংশজ হওয়ার দাবী ঐতিহাসিক রূপে সিদ্ধ করা যায়না।
তাহলে সত্য কি?
———————-
আধুনিক ইতিহাসকারগণের মধ্যে অধিকতর বৌদ্ধ স্রোতকে অধিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে থাকেন। কেননা, মৌর্যগণ নিজেদের শিলালেখনীতে নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বলেই উল্লেখ করেছেন। অসোক নিজেকে ক্ষত্রিয় বলেছেন।
মৌর্য শব্দের ব্যুৎপত্তি সংস্কৃত ময়ুরের সাথে সংযুক্ত করা যায়, যা ক্ষত্রিয়গণের প্রতীক ছিল। সোজা শব্দে-বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে মৌর্য বংশ অপ্রত্যক্ষরূপে শাক্য বংশেরই একটি শাখা ছিল, যাঁরা শাক্যদের কারণে বেঁচে ছিলেন। তবে তাঁরা ব্রাহ্মণ্য জাতিবাদী ক্ষত্রিয় ছিলেননা, ছিলেন ক্ষেত সম্পন্ন ভূ-স্বামী বিশিষ্ট খত্তিয় বা ক্ষত্রিয়।
পৌরাণিক (ব্রাহ্মণ্যবাদী) গ্রন্থ এবং শুদ্র পক্ষমুরার প্রসঙ্গ
———————————-
কিছু পৌরাণিক এবং মুদ্রারাক্ষসের মতো নাটক গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ‘মুরারাজ’ বা মুরা নামক শুদ্র স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নন্দ বংশের সাথে সম্বন্ধ
————————
কিছু মান্যতা অনুসারে, তাঁদেরকে নন্দ রাজ ঘরানার সাথেও যুক্ত করে থাকেন।
এগুলির ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ্যবাদী (হিন্দু ধর্মীয়) কিছু গ্রন্থে তাঁদেরকে নন্দদের পরের শাসকরূপে মান্য করতে গিয়ে শুদ্র বা সঙ্কীর্ণ কুলের বলা হয়েছে, এরূপ বিষয় ক্ষত্রিয় বনাম মূল নিবাসীর বিতর্ক রূপে জীবিত রয়েছে।
কিন্তু ইহাও সত্য যে, শৈক্ষণিক ইতিহাসে মৌর্যদেরকে ক্ষত্রিয় মান্যতাকারী প্রমাণ অধিকতর শক্তিশালী মানা হয়।
শিলালেখ সমূহের সাক্ষ্য
———————————
সম্রাট অসোক স্বীয় শিলালেখনীতে নিজেকে ক্ষত্রিয় হওয়ার সঙ্কেত দিয়েছেন। শাক্যগণের মতো উপাসকও বর্ণনা করেছেন।
মাস্কী এবং বৈরাট (ভাব্রু) শিলালেখ
——————————
উক্ত লঘু শিলালেখনীতে অসোক নিজেকে স্পষ্টরূপে ‘বুদ্ধশাক্য’ বা ‘উপাসক’ বলেছেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement