Hot Posts

6/recent/ticker-posts

আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে রক্ষা করুন:-

সময়ের সাথে সাথে বনভন্তের পরিচিতি ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দীঘিনালা এলাকায়। দীঘিনালা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও লোকমুখে তাঁর এই জয়গান শুনলেন। আর এ-ও শুনলেন যে, তাঁকে পূজা করলে প্রার্থিত বিষয় লাভ করা যায়। এসব কথা শুনে কর্মকর্তা মনে মনে চিন্তা করলেন, আচ্ছা, আমারও তো অনেক কাঙ্ক্ষিত বিষয় এখনো পূরণ হয়নি। সেগুলো লাভের জন্য উঁনাকে কিছু দান দিলে কেমন হয়। এতো লোকজনে যখন এ কথা বলছেন, সেটা তো মিথ্যা হবার নয়। কাজেই উঁনাকে কিছু দান দিয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো আশু লাভ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ চিন্তা থেকে একদিন অধীনস্থ কতিপয় পুলিশের মারফতে বনভন্তের জন্য কিছু দানীয়সামগ্রী প্রেরণ করলেন। কিন্তু ভন্তে তো একান্ত শ্রদ্ধার্ঘ ব্যতীত কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। তদুপরি সেই প্রেরিত দ্রব্যাদি যে অসদুপায়ে অর্জিত অর্থে ক্রয় করা, সেটা দিব্যজ্ঞানে জ্ঞাত হলেন। তাই পুলিশ কর্মকর্তার প্রেরিত সেসব দ্রব্যাদি গ্রহণে অসম্মতি বা অপারগতা প্রকাশ করলেন। আর অপারগতার কারণও জানায়ে দিলেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে পুশিলদল মনোদুঃখে ফিরে এলেন থানায়। কর্মকর্তাকে সবকথা জানালেন সবিস্তারে। তার প্রেরিত দ্রব্যাদি অসদুপায়ে অর্জিত অর্থে ক্রয় করা বলে বনভন্তে গ্রহণ করেননি শুনে কর্মকর্তার মন ভেতর থেকে ফুঁসে উঠলো। ‘অসদুপায়ে অর্জিত অর্থে ক্রয় করা’ কথাটা সহ্য করতে পারলেন না। তার কাছে এটা (নিজের সম্বন্ধে) মস্তো অশোভন উক্তি বলে মনে হতে থাকলো। আগ্রাসী মনে চিন্তা করতে থাকলেন- তিনি একজন নামকরা সাধু-সন্যাসী হয়েছেন, তাতে কী? তাই বলে আমার গোপনীয় বিষয় ফাঁস করে দিবেন, এটা কেমন কথা! এর মাধ্যমে তো আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, অপদস্ত করতে চেয়েছেন। কিছুতেই এটা মেনে নেওয়া যায় না। “না, মেনে নেওয়া যায় না” বলে একটা অনুচ্ছারিত চিৎকার বেরিয়ে আসলো কর্মকর্তার বুক ফেটে। তবে এই চিৎকার শুনতে পেলেন না অধীনস্থ পুলিশদল। রাগে কী করবেন ভেবে পান না কর্মকর্তা। উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, “যাও, এক্ষুণি তাঁকে বন্দি করে থানায় নিয়ে আসো।

কর্মকর্তার নির্দেশ পেয়ে পুলিশদল অগত্যা বনভন্তের কুটিরের দিকে রওনা হলেন। তবে তাদের মনে “উভয় সংকট” নামক ভয় অনুভূত হতে লাগল। একদিকে কর্মকর্তার নিদের্শ-এর ভয়, অন্যদিকে সাধুবাবাকে বন্দী করতে গিয়ে না জানি আমাদের কী ক্ষতি হয়; এই দু’ভয়ে চোখে-মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তবুও রাস্তা ধরে অগ্রসর হতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন তারা। এ-কী! এখন তো শীতকাল নয়; অথচ পুরো এলাকা গাঢ় কুয়াশাচ্ছন্ন। যেন মাঘের কুয়াশায় ঢেকে গেছে চারপাশ। কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল। খানিকক্ষণ একদৃষ্টি তাকিয়ে থেকে মনে সাহস সঞ্চার করে আবার হাঁটা শুরু করলেন। কোনো রকমে কুয়াশার অন্তরাল ভেদ করে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। বেশ কিছু অগ্রসর হবার পর হঠাৎ তাদের শরীরে চটচটে উষ্ণতা অনুভব হতে লাগল। সেই উষ্ণতা ক্রমেই প্রচণ্ড উত্তাপে পরিণত হল। আর পুরো শরীর যেন জ্বলে-পুড়ে যেতে লাগল। অসহনীয়, জ্বালাময় এ উত্তাপে প্রত্যেকের দেহ পুড়ে গিয়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হতে লাগল তাদের। ফলে কে আর সামনের দিকে অগ্রসর! কাঁপন ধরল সবার বুকে। ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে অনেকটা পালিয়ে থানায় ফিরে আসলেন। আর কর্মকর্তা কোনো প্রশ্ন করার আগেই তারা পূর্বাপর সব ঘটনা খুঁলে বললেন তাকে। এবার আরো বেশী ক্ষুব্ধ ও আগ্রাসী হয়ে উঠলেন কর্মকর্তা। আহত বাঘের ন্যায় উন্মত্তপ্রায় হয়ে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত একদল পুলিশ নিয়ে কুটিরের দিকে রওনা হলেন। কীভাবে বনভন্তেকে শায়েস্তা করা যায়, সে সম্বন্ধে নানা চিন্তা করতে করতে সদলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলেন। দেখে স্পষ্ট বুঝা যায়, ধ্বংসাত্মক একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার মনের ওপর। বেশ কিছুদূর অগ্রসর হবার পর হঠাৎ একটা বাঘ ঝোপের আড়ালে থেকে বেরিয়ে এসে তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল। মুহূর্তেই গা শিউরে উঠল তাদের। গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। কম্পিত হাতে বাঘের দিকে বন্দুক তাক করে ট্রিগার টিপতে উদ্যত হল। কিন্তু ততক্ষণে বাঘটি কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পেলেন না তারা। চোখের সামনে এরূপ অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে দেখে কর্মকর্তা কিছুটা দমে গেলেন। এটা চোখের ধান্ধা ভাবতে গিয়েও ভাবতে পারলেন না। কারণ একসঙ্গে এতো লোকের চোখে ভুল দেখবেন কীভাবে? তার বুক ধ্বক করে উঠল। তারপরও পুরোপরি ক্ষান্ত হলেন না। এক প্রকার তলিয়ে যেতে যেতে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। যতই কুটিরের কাছাকাছি পৌঁছতে লাগলেন ততই তার হৃদয়ের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে যেতে লাগল। একপর্যায়ে কুটিরের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছলেন। পৌঁছেই তারা দেখতে পেলেন একটি দেহহীন মস্তক শূন্যে ভেসে ভেসে ধর্মদেশনা প্রদান করছে। পরক্ষণে রক্তে রঞ্জিত দু’হাতে স্বীয় কলিজা টান দিয়ে ছিঁড়ছে যেন। এবম্বিধ ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুষড়ে যায় কর্মকর্তার মন। হাত, পা জমে যাওয়ার অবস্থা হয়। সমস্ত শরীর ঘেমে গেল। বুকে হাঁপ ধরে গেছে বেশ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হতে লাগল, এখনই পড়ে যাবেন রাস্তার। থর থর করে কাঁপতে কোনোমতে বনভন্তের নিকট পৌঁছে গেলেন। আর নতশিরে প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগলেন বার বার। সবকথা খুঁলে বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চাইলেন বটে, কিন্ত প্রচণ্ড ভয়ে গলা দিয়ে স্বর বের হয় না। কেবল “আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে রক্ষা করুন। আপনি রক্ষা না করলে মরে যাবো” বলে প্রায় কেঁদে ফেললেন। বুদ্ধের জীবদ্দশায় যেমন অঙুলিমাল ও আলবক যক্ষ পরাজিত হয়ে বুদ্ধের পদে লুটিয়ে নতি স্বীকার করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও বনভন্তের শরণাপন্ন হলেন। আর কৃত অপরাধের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ক্ষমা, মৈত্রী ও দয়ারসাগর বনভন্তে কর্মকর্তাকে ক্ষমাপূর্বক পুরো পুলিশদলকে উপদেশ প্রদান করলেন। ভন্তের উপদেশে বেশ প্রসন্ন চিত্তে থানায় ফিরে আসলেন তারা। সেই হতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বনভন্তের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে যান। প্রায়সময়ই ভন্তের সকাছে গিয়ে ধর্মোপদেশ শ্রবণ করেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement