Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বিশুদ্ধানন্দ মহাথের।

 

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার হোয়ারাপাড়া গ্রাম থেকে উঠে এসে বৌদ্ধ ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজসেবায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বিশুদ্ধানন্দ মহাথের। বৌদ্ধ ধর্মীয় পণ্ডিত ও সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্ব পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরের জন্ম ১৯০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার হোয়ারাপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন কর্মধন বড়ুয়া এবং মাতা চিন্তাবতী বড়ুয়া। পিতার দেওয়া নাম ছিল শশাঙ্ক বড়ুয়া। স্থানীয় নোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু, পরে তিনি মহামুনি এ্যাংলো পালি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৫ সালে শ্রামণ্যধর্মে দীক্ষিত হলে তাঁর নাম রাখা হয় বিশুদ্ধানন্দ। এরপর বাংলা ভিক্ষু সংঘের প্রতিনিধি হিসেবে সর্বভারতীয় বৌদ্ধ সম্মেলনে অংশ নেন। কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সূত্রে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সান্নিধ্যও লাভ করেন।
১৯৩০ সালে তাঁর গুরু সংঘনায়ক অগ্রসার মহাস্থবিরের কাছে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। বৌদ্ধধর্মে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ১৯৩৪ সালে তিনি শ্রীলঙ্কায় যান এবং বিদ্যালঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিন বছর পড়াশোনার পর ১৯৩৭ সালে তিনি ‘শ্রীসদ্ধর্মভাণক’ অভিধা অর্জন করেন।
দেশে ফিরে বিশুদ্ধানন্দ মহাথের নিজেকে যুক্ত করেন শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজসেবামূলক নানা কর্মকাণ্ডে। তিনি কয়েকটি বিহার ও পালি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বেনীমাধব বড়ুয়া, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সহায়তায় ত্রাণ কমিটি গঠন করেন। পরে হোয়ারাপাড়া গ্রামের সুদর্শন বিহারে দরিদ্র বৌদ্ধদের জন্য ‘অগ্রসার অনাথালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে অগ্রসার মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিত।
জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে ১৯৪৪ সালে তিনি ‘অগ্রসার স্মৃতি সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৯৪৯ সালে শিলক বৌদ্ধ সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর উদ্যোগে। তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ‘বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ’ নামে পরিচিত।
তাঁর কর্মজীবনের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তখমা এ পাকিস্তান’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯০ সালে তিনি আন্তর্জাতিক শান্তিপদক লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে নরওয়ের অসলোস্থ গান্ধী শান্তি ফাউন্ডেশন তাঁকে মহাত্মা গান্ধী পুরস্কার প্রদান করে। আর সমাজসেবায় অবদানের জন্য ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।
১৯৯৪ সালের ২ মার্চ বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরের জীবনাবসান ঘটে। তবে শিক্ষা বিস্তার, বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার, সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাউজানের হোয়ারাপাড়া থেকে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রা চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

এমন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জানতে ফলো দিতে পারেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement