Hot Posts

6/recent/ticker-posts

ADD

সিংহচর্ম পরিহিত ধূর্ত শৃগাল

বর্তমানে আমরা সর্বত্র অবলোকন করছি, মানুষের মধ‍্যে ধম্ম অনুশীলনের চেয়ে ধম্মোন্মাদনাই অধিক। নাম ধম্মের হলেও কাজ হল উন্মাদনা, প্রদর্শন, ধম্মকে পণ‍্য বানিয়ে ব‍্যবসা করা ইত্যাদি। এরকম মানসিকতা অধিকাংশ ভিক্ষু কিংবা গৃহস্থ সবার মধ‍্যেই পরিলক্ষিত হয়। তাই সেগুলি অনুষ্ঠান সর্বস্বই হয়ে থাকে, প্রকৃত ধম্ম অনুসরণ হয়না। আমাদের সমাজে কি গৈরিক বসনধারী কিংবা কি গৃহস্থ, প্রায় সকলের মধ‍্যেই দেখা যায় একটা সব জান্তার ভাব। নিজেদের আমিত্ব, কর্তৃত্ব প্রকাশে তাঁরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করে থাকে, নিজেদের সুরত দেখিয়ে মাইকের সামনে গিয়ে বক্তব্য প্রদান করার জন‍্য। তা অন‍্যের দ্বারা সমাদৃত হচ্ছে কিনা, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই। কেবল মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি দেখাতে পারলেই সীমাহীন আত্ম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে থাকে।

তখন তাঁরা অন‍্যের কাছে প্রদর্শন করতে থাকেন, দেখো, আমার স্থান কোথায়! আমি কোথায় ভাষণ দিয়ে থাকি! এভাবে নিজেদের মধ‍্যে ভারী আত্ম তুষ্টিতা অনুভূত হয়। অথচ আমরা প্রত‍্যক্ষ করছি যে, যাঁরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করছেন, যাঁরা সেখানে বক্তব্য প্রদান করছেন, তাঁরা যদি নিজেদের প্রদত্ত বক্তব‍্যের ছিটে ফোটাও দৈনন্দিন জীবনে অনুশীলন-অনুকরণ করতেন সমাজে এত বিশৃঙ্খলা ও ভেদ-বৈষম‍্য থাকতো না। তাঁরা যে কথাগুলি অন‍্যের সামনে সভায় বলে থাকেন, সেগুলি তাঁরা নিজেদের পরিবারেও লাগু করতে পারেননা। কেননা নিজেদের মধ‍্যে ধম্মের আচরণ নাই, ধম্মের শৃঙ্খলপূর্ণ শীলানুশীলন নাই, এজন‍্য তাঁদের কথাগুলো গুরুত্ব পায়না। বরং সেগুলি শুনে লোকেরা পেছনে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে থাকে, হাঁসি-তামাশা করে থাকে এবং উপহাস করতে থাকে। বুদ্ধ ধম্মপদের নিরয় বর্গের ৩১৬ সংখ‍্যক গাথায় ব‍্যক্ত করেছেন-
অলজ্জিতাযে লজ্জন্তি, লজ্জিতাযে ন লজ্জরে,
মিচ্ছাদিট্ঠি সমাদানা সত্তা গচ্ছন্তি দুগ্গতিং।’
অর্থাৎ যেখানে লজ্জা করতে নেই, সেখানে লজ্জা করে এবং যেখানে লজ্জা করতে হয়, সেখানে লজ্জা করেনা, সে সকল ভ্রান্ত দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ দুর্গতি প্রাপ্ত হয়।
আমরা পালি সাহিত‍্য অধ‍্যয়ন করে জানতে পারি বুদ্ধ রাজপুত্র হয়েও সাধারণভাবে জীবন-যাপন করেছেন, সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা করেছেন, সাধারণ শয়নাসন ব‍্যবহার করেছেন এবং সাধারণ স্থানে বসে ধম্মবাণী শুনিয়েছেন। তিনি তাঁর শিষ‍্য-শিষ‍্যাদেরকেও অনুরূপ সহজ-সরল জীবন-যাপনের নীতি অনুসরণ করার জন‍্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন। ’উচ্চাসযন-মহাসযন বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।’ অর্থাৎ উচ্চ ও রাজকীয় বিলাস বহুল মহাশয়নাসন ব‍্যবহার হতে বিরত থাকতে বলেছেন। তৎকালীন সমাজের শ্রেষ্ঠ ধনী, পরাক্রমী রাজা-মহারাজাদের অনেকেই ছিলেন বুদ্ধের পরম ভক্ত অনুগামী ও অনুসারী। তাঁরা বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ‍্য-শিষ‍্যাদেরকে সে সময়ের উত্তম, উৎকৃষ্ট সব কিছু ব‍্যবহারের জন‍্য দান দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেগুলি গ্রহণ বা ব‍্যবহার করতে বুদ্ধ আগ্রহী ছিলেননা। বুদ্ধ বরং রথ বা অন‍্যান‍্য যান-বাহনের পরিবর্তে পায়ে হেঁটে যেতেই ভালবাসতেন, প্রতিদিন বুদ্ধকে অনেকেই সুস্বাদ ভোজন বিহারে নিয়ে গিয়ে দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি পিণ্ডপাত করে ভোজন করতেই বেশী স্বচ্ছন্দবোধ করতেন, সিংহাসন ত‍্যাগ করে সাধারণ ভূমিজ বিছানায় বসে ধম্মোপদেশ প্রদান করেছেন। এমনকি বোধিরাজ কুমারের আমন্ত্রণে ভিক্ষু সঙ্ঘকে নিয়ে বুদ্ধ তাঁর প্রাসাদে উপস্থিত হলে, সেখানে উপরে উঠার সিঁড়িতে বহুমূল‍্য কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে বলে তাতে পা মাড়িয়ে উপরে উঠতে শাস্তা অনীহা প্রকাশ করেছিলেন এবং রাজকুমারকে তা তুলে নেওয়ার জন‍্য আদেশ দিলে তিনি তা উঠিয়েছিলেন। এরপর বুদ্ধ স্বশিষ‍্যে উপরে উঠেছিলেন। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বুদ্ধ চাকচিক্য কিংবা আড়ম্বরতার বিরোধী ছিলেন। আর এখনকার চিত্র আমরা সবাই প্রত‍্যক্ষ করছি সম্পূর্ণ উল্টা। গ্রামে গ্রামে যে সুসজ্জিত ও সু-অলঙ্কৃত আসনাদি বানিয়ে ভিক্ষুরা দেশনা প্রদান করে থাকেন, তা রাজকীয় সিংহাসনকেও হার মানাবে। হাঁটার সমর্থ থাকা সত্তেও ভক্তদের কাঁধে চেপে আসা-যাওয়া করা কত যে অমানবিক ও গর্হিত তা বলাই বাহুল‍্য। হয়তো অনেকে বলবেন-ভক্তদের আগ্রহে তাদেরকে পূণ‍্য সঞ্চয় করার সুযোগ দিচ্ছেন। আসলে এরকম অতিভক্তি বা অন্ধভক্তি বিপজ্জনক। যা হতে ভিক্ষুদের মান-অহঙ্কার বৃদ্ধি হয়, নিজেকে মহান এবং অন‍্যকে হীন মনে করার প্রবৃত্তি, তাতে হয় শীলের পরিহানী। এখনকার ভিক্ষুদের মনে বোধোদয়ের জন‍্যই বুদ্ধ বোধিরাজ কুমারের পাতানো কার্পেটের উপর হেঁটে যাননি।
বুদ্ধের ধম্ম প্রচারের উদ্দেশ্যই হল বহু লোকের হিত-সুখ সাধন করা। সাধারণভাবে পদব্রজে চলাফেরা করলে, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার হতে প্রত‍্যেকদিন পিণ্ডপাত করে খাদ‍্য-ভোজ‍্য গ্রহণ করলে এবং খোলা মাঠে-ময়দানে কিংবা বৃক্ষমূলে বসে ধম্মোপদেশ প্রদান করলে, যত অধিক লোকের সাথে মেলামেশা করা যায়, দর্শন দেওয়া যায় এবং উপকার করা যায়, তা অন‍্যভাবে কখনও সম্ভব হয়না। এজন‍্যই তিনি সব সময় আড়ম্বরতা এড়িয়ে চলার এবং জীবন-যাপন করার পক্ষপাতী ছিলেন। বুদ্ধের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাজা, মহারাজা, ধনী ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা আসতেন সাক্ষাৎ পাওয়ার জন‍্য বুদ্ধের নিকট এবং অন‍্যদিকে বুদ্ধ সাক্ষাৎ দিতে যেতেন গরীব, অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদেরকে। এজন‍্য তাঁকে বলা হয় মহাকারুণিক। এখন আমরা এর বিপরীত চিত্রটাই সবসময় দেখে থাকি। বর্তমানে আমাদের ভিক্ষুরা প্রায়ই ধনীদের, ক্ষমতাবান ব‍্যক্তিদের, পদবীধারী ব‍্যক্তিদের মন পেতে, সুবিধা পেতে, স্বার্থ সিদ্ধি করতে যেভাবে পদলেহন করে থাকেন এবং লেজুর বৃত্তি করে থাকেন, ঠিক বিপরীত মানসিকতায় তাঁরা আবার গরীব ও দুর্বলদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং অবহেলা করে থাকেন। কেননা তাঁদের উদ্দেশ‍্য বুদ্ধের মতো ভেদ-বৈষম‍্যহীনভাবে নি:স্বার্থ ধম্ম সেবা নয়, তাঁদের মানসিকতা হল নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল করা। সমাজের কর্তা ব‍্যক্তিদেরও মানসিকতা হল ভিক্ষুদের‍ ব‍্যবহার করে নিজেদের অহং-আমিত্বকে জাহির করা। সুতরাং উভয় কুলের উদ্দেশ‍্যের মধ‍্যেই রয়েছে সততার অভাব, যা ধম্ম সম্মত নয়। সবখানে নিজেদের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। এজন‍্য ধম্ম প্রেমের পরিবর্তে প্রদর্শনী তথা ধম্মোন্মাদনাই অনুষ্ঠানাদিতে অধিক দেখা যায়।
আজকাল প্রায় ভিক্ষুদের অনেকে উপরে উপরে যেভাবে শীলবানের ভাব দেখায় এবং অন‍্য ভিক্ষুদের চেয়ে নিজেদের শুদ্ধতা প্রমাণে তৎপরতা দেখায় এবং কথায় কথায় স্বর্গ পাইয়ে দেওয়ার, নির্বাণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তাঁদের অনেকেই নিজেদের ভিক্ষুত্বই তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন। চতুর্পারাজিকার যে কোনো একটি লঙ্ঘনের করে ধূর্ত শৃগাল সিংহচর্ম পরিধানের ন‍্যায় সার বিহীন খোলস নিয়ে বিরাজ করছেন। তাঁরা আবার উপরে উপরে শীলবান, ধ‍্যানী, জ্ঞানীর ভাব দেখিয়ে আস্ফালন করে অন‍্যদের কটাক্ষ করে হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকেন। এখন কিছু কিছু ভিক্ষুদের মধ‍্যে এরকম মানসিকতা সম্পন্ন অধিক দেখা যাচ্ছে। কিছু নেতৃস্থানীয় ভিক্ষুরা এ সমস্ত বিষয় জেনেও স্বজন প্রীতির কারণে, আঞ্চলিকতার কারণে, গুরু-শিষ‍্যত্বভাবের কারণে, স্বার্থের কারণে, জনপ্রিয়তা হারাবার ভয়ের কারণে, সবলতার কারণে অথবা নিজেদের কৃত দোষ ঢাকা সহ ইত্যাদি নানা কারণে তাঁরা না জানা ও না দেখার ভাণ করে থাকেন, অথবা মনগড়াভাবে নিজেদের মত করে ব‍্যাখ‍্যা তৈরী করে গুরু কর্মকে লগু করে দেখাতে তৎপর হয়ে উঠেন। যেখানে নিজের স্বার্থ থাকবেনা, সেখানে লঘুকেও গুরুভাবে দেখে থাকেন। মরার উপর খাঁড়ার ঘা চাপিয়ে তামাশা দেখতে থাকেন। এরকমই দেখা যায় সবখানে বিচারের নামে প্রহসন। ধম্মের নামে অধম্ম, ন‍্যায়ের নামে অন‍্যায়-অনাচার। অনুসারী গৃহস্থদের অবস্থাও তথৈবচ। আজকাল আর কেহ ন‍্যায়-অন‍্যায়, সত‍্য-মিথ‍্যা, সুশীল-দু:শীল, ধম্ম-অধম্ম, আচার-অনাচারের ধার ধারেননা। ক্ষমতা, অর্থ, স্বার্থ, পদ-পদবী ও জনবলের কাছে সকলেই আত্ম সমর্পণ করে থাকে। তাই বলছিলাম-এখন কেহ আর ধম্ম বিচার করেনা, অনুষ্ঠানের উন্মাদনাই হল মুখ‍্য। কঠিন চীবর, প্রবারণার ফানুস ইত্যাদির নামে উন্মাদনার শেষ নাই। যাঁদেরকে কঠিন চীবর দান করবেন এবং যাঁরা কঠিন চীবর নেবেন, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তাঁদের রয়েছে কেবল উপরে আবরণরূপ গেরুয়া বল্কল, ভিতরে ঘুনে ধরা অসার।
এজন‍্য বুদ্ধের বচন হল-‘ভিক্ষুগণ! তোমরা তথাগত প্রবর্তিত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, উপাসক-উপাসিকা-এ চারিপরিষদ ধম্ম-বিনয়কে নিষ্ঠার সহকারে অধ‍্যয়ন করবে, ধারণ করবে এবং অনুশীলনে রত থাকবে, যতদিন তোমরা ধম্মানুবর্তী থাকবে, ততদিন শাসন তথা সদ্ধম্মের অন্তর্ধান হবেনা।’ বর্তমানে নিষ্ঠার সাথে ধম্মের অধ‍্যয়ন, ধারণ এবং ব‍্যাখ‍্যা যেমন নাই, তেমনি ধম্ম এবং বিনয়ের অনুশীলনও নাই। অন‍্যকে যা উপদেশ প্রদান করে থাকি, সেগুলি নিজেরা অনুশীলন করিনা। তাহলে এমতাবস্থায় ধম্মের পরিহানী না হয়ে শ্রীবৃদ্ধি হবে কি? ধম্মের গৌরব মুখে ভাষণের মাধ্যমে কেবল বৃদ্ধি পায়না, অনুশীলনের মাধ‍্যমেই অধিক মহিমা প্রসারিত হয়। সর্বজ্ঞ বুদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এমন এক সময় আসবে, তখন লোকের কাছে ধম্মের বাণী অপ্রিয় হবে, যাঁরা ধম্ম-বিনয়ে আনুগত্য দেখাবে, তাঁরা লাঞ্ছিত হবে, অপমানিত হবে, সেজন‍্য শঙ্কিত হয়ে প্রকাশ করতে হবে ধম্ম-বিনয়ের বাণী। এখন আমরা সে সময়কেই প্রত‍্যক্ষ করছি।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement