Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

সদ্ধর্মে মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য - প্রকৌশলী সঞ্জীব কুমার বড়য়া


 সদ্ধর্মে মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

===================================
প্রকৌশলী সঞ্জীব কুমার বড়য়া
---------------
জন্মজন্মান্তরের সুকর্মের ফলশ্র“তিতে পিতার ঔরসে মাতার গর্ভে জন্ম নিয়ে মানবসন্তানের মনুষ্যলোকে আবির্ভাব ঘটে। জন্মের পর থেকে অপরিমেয় প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও মঙ্গল-কামনায় জন্মজাত সন্তান ক্রমেই বড় হয়ে ওঠে। অতঃপর, যুগপৎ মাতা-পিতা ও স্বীয় তৎপরতায় সন্তান এগিয়ে যায়। মাতাপিতা সন্তানকে সামর্থ্যানুযায়ী আজীবন কায়মনোবাক্যে সহায়তা প্রদানে সচেষ্ট থাকেন। তবে নানা কারণে কিছু েেত্র এর ব্যত্যয়ও ঘটে। সার্বিক বিবেচনায় সন্তানের জীবনে মাতাপিতার অবদান অপরিসীম। বর্ণনাতীত অবদানে সিক্তÑধন্যÑকৃতার্থ সন্তান তার মাতাপিতার প্রতি চিরঋণে আবদ্ধ হয়। তাঁদের প্রতি সঙ্গতকারণে সন্তানের কর্তব্যের পরিধি হয় সীমাহীন এবং সন্তান তা সম্পাদনে আজীবনই দায়বদ্ধ থাকে।
মাতাপিতা শিতি বা অশিতি, গ্রাম্য কিংবা শহুরে, সুশ্রী অথবা কুৎসিত এবং অন্ধ, বধির, বোবা, পঙ্গু যে প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য কিংবা চরিত্রের হোক না কেন তাঁদের প্রধান পরিচয় তাঁরা মাতাপিতা। মাতাপিতাকে যথার্থভাবে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ও অভিষিক্ত করা সন্তান মাত্রেরই কর্তব্য। তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্যের শেষ নেই। পাশ্চাত্য মনীষী রাস্কিন বলেছেন, ‘Duty towards God, duty towards parents and duty towards mankind.’ সন্তানের কর্তব্য প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন শরীফে ঘোষিত হয়েছে, ‘মাতাপিতার সাথে উত্তম আচরণ কর।’ এ প্রসঙ্গে শাস্ত্রে আরও বলা হয়েছে : আল্লাহর ইবাদত করার পর আসমানের নিচে আর জমিনের উপরে পিতামাতার চেয়ে অধিক সম্মানের, সদাচারণের উপযোগী, অধিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম পৃথিবীতে সন্তানের জন্য দ্বিতীয় আর কেউ নেই। পবিত্র বৈদিক শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, ‘জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ’ এবং ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাই পরম তপস্যা।’ খ্রিস্টানধর্মেও মাতাপিতার প্রতি সন্তানের করণীয় কর্তব্য সুচারুভাবে সম্পাদন করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মহামানব গৌতম বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনেও মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যাদির বিশদ উল্লেখ রয়েছে। আমাদের অভিপ্রায় এই ধর্ম-দর্শন তথা সদ্ধর্মের আলোকে মাতাপিতার প্রতি সন্তানের বিশেষ উল্লেখযোগ্য কর্তব্যসমূহ বর্ণনাপূর্বক সংপ্তি আলোচনা করা।
মাতার গর্ভে সন্তানের লণ প্রকাশ পেলেই মাতাপিতা তার প্রতি ব্রহ্মসদৃশ হয়ে অনুণ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপো ভাব বজায় রাখতে যথাসম্ভব সচেষ্ট থাকেন। এ জগতে মাতাপিতা ছাড়া অন্য কারও পে এইরূপ হৃদয়বান হয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। বস্তুত, সন্তানের প্রতি পিতামাতার ব্রহ্ম-বিহার ভাবনা সত্যি অচিন্ত্যনীয়। উল্লেখ্য, এ-েেত্র পিতার চেয়ে মাতার ভূমিকা পালন কিছুটা বেশিই পরিলতি হয়। দয়ার সাগর, গুণের আকর, চলার পথের অনন্যসাধারণ কাণ্ডারী মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তাই তাঁদের প্রতি করণীয় কর্তব্যাদির শুধু সারগর্ভ আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলাম।
ছেলে ও মেয়ে হচ্ছে মাতাপিতার সন্তান। ছেলেদের বেশির ভাগই নিজ পরিবারের সদস্য-সদস্যার সাথে গৃহী হিসেবে জীবনযাপন করে। মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর পরিবারে চলে যায়। স্বল্প সংখ্যক ছেলে-মেয়ে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিয়ে যথাক্রমে শ্রামণ ও শ্রামণেরী এবং ভিু ও ভিুণী হয়ে স্ব স্ব জীবনচর্যায় রত থাকেন। মুষ্টিমেয় সংখ্যক সন্তান অনাগরিক ও অনাগরিকা রূপে জীবন অতিবাহিত করে। গৃহীজীবনে নিয়োজিত ছেলেরাই মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য পালনের যোগ্য, অন্য সন্তানরা নয়, এমন সাধারণ বিশ্বাস বা নীতিকে বৌদ্ধোচিত বলে গণ্য করা হয় না। মেয়েরা বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে পিতৃগৃহে মাতাপিতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য সম্পাদনে রত থাকবেÑইহাই রীতিসিদ্ধ কাজ। প্রব্রজিত ও উপসম্পন্নদেরও মাতাপিতার প্রতি সুনির্দিষ্ট প্রতিপাল্য কর্তব্য রয়েছে। বিবাহিতা মেয়েও শ্বশুরালয়ে অবস্থান করে সময়, সুযোগ ও সঙ্গতি থাকলে মাতাপিতার প্রতি সম্ভবপর কর্তব্য পালন করতে পারে। সাধুকর্ম বলে তা প্রশংসিতও বটে। স্বামীর পরিবারে বউয়ের (মেয়ের) শ্বশুর-শাশুড়িরা তার মাতাপিতার সমতুল্য। সেখানে তাঁদের প্রতি সে মাতৃ-পিতৃ জ্ঞানে নিজ কর্তব্য সম্পাদনে অভ্যস্ত থাকবেÑইহাই স্বাভাবিক নিয়ম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রয়োজনে মেয়ের জামাই (ছেলে) মাতৃ-পিতৃ জ্ঞানে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি নানাভাবে কর্তব্য পালন করবেÑএটাই হচ্ছে যৌক্তিক বিষয়। বস্তুত, সন্তান যে শ্রেণি বা পর্যায়ভুক্ত হোক না কেন মাতাপিতার প্রতি নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদনে প্রত্যেকেই কম-বেশি দায়বদ্ধ; এই হচ্ছে সদ্ধর্ম-নীতি।
মাতাপিতা সন্তানের আদিগুরু, শিায় হাতেখড়ি-দাতা। শিশু-সন্তানকে সর্ববিষয়ে প্রারম্ভিক শিা প্রদানে মাতাপিতার কোন বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে অঙ্গুত্তর নিকায় গ্রন্থের সব্রহ্মক সূত্রে মাতাপিতার প্রশস্তি বর্ণনা করে তাঁদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে বুদ্ধ কর্তৃক বিবৃত হয়েছেÑ
‘ব্রহ্মাতি মাতা-পিতরো পুব্বাচারিয়াতি বুচ্চরে
আহুনেয়্যো চ পুত্তানং পজায় অনুকম্পকা।’
অর্থাৎ, মাতাপিতা ব্রহ্মার চেয়েও শ্রেষ্ঠ, তাঁরা পূর্বাচার্য ও আহ্বানীয় হিসেবে আখ্যায়িত। এইরূপ গুণসম্পন্ন ও প্রারম্ভিক জ্ঞানদাতা মাতাপিতাকে পূজা করা, তাঁদের প্রতি সম্মান জানানো সন্তানের আবশ্যিক কর্তব্য।
বুদ্ধের মুখনিঃসৃত বাণীর অনুপম সার-গ্রন্থ ধর্মপদের ৩৩২ নম্বর গাথায় উল্লেখ রয়েছেÑ
‘সুখা মত্তেয়্যতা লোকে অথো পেত্তেয়্যতা সুখা’
সুখা সামঞ্ঞতা লোকে অথো ব্রহ্মঞ্ঞতা সুখা।’
Ñধরাধমে মাতৃভক্তি সুখকর, পিতৃভক্তি সুখকর। শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ (বিমুক্ত পুরুষ) পরিচর্যাও সুখজনক। তাই মাতাপিতার প্রতি অকুণ্ঠচিত্তে নমিত হয়ে ভক্তি প্রদর্শনপূর্বক তাঁদের সেবা-যতেœ নিরত থাকা সন্তানের একান্ত কর্তব্য। পান্তরে মাতাপিতার প্রতি কখনো অবজ্ঞা প্রদর্শন একেবারেই অশোভনীয় ও অনুচিত। আর এইরূপ অবস্থা যা’তে সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপার সন্তানকে সর্বদা যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হয়। প্রসঙ্গত, অঙ্গুত্তর নিকায়ের চতুর্থ নিপাতে গ্রন্থিত নিম্নের উক্তিটি স্মর্তব্য-
‘তস্মা হি নে নমস্সসেয়্য সক্করেয়্যাথ পাণ্ডিতো
অন্নেন অত্থ পানেন বত্থেন সয়নেন চ:,
উচ্চাদনে নহাপনে পাদানং ধোবনেন চ।’
অর্থাৎ, ভালো মানুষ তথা পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁদের (মাতাপিতা) প্রণাম করবেন; অন্ন, পানীয়, বস্ত্র ও শয্যাসন প্রদান করে এবং ঋতু-উপযোগী গরম ও ঠান্ডা পানি দিয়ে তাঁদের পা ধুয়ে, স্নান করিয়ে সুগন্ধি মেখে ও প্রয়োজনে গাত্রমর্দনপূর্বক সেবা-শুশ্রƒষা করবেন।
‘মাতা-পিতু উপট্ঠনাং, পুত্তদারস্স সঙ্গহো,
অনবজ্জানি কম্মানি, এতং মঙ্গলমুত্তমং।’
মহামঙ্গল সূত্রের উপরি-উক্তি গাথায় মাতাপিতার সেবা করাকে উত্তম মঙ্গল বলে ভগবান বুদ্ধ দেশনার মাধ্যমে সন্তানের কর্তব্য নির্দেশ করেছেন। বুদ্ধ-বর্ণিত আটত্রিশ প্রকার উত্তম মঙ্গলের মধ্যে মাতাপিতার সেবা করা অন্যতম উত্তম মঙ্গল। এই গাথার মাহাত্ম্য অনুধাবনে মঙ্গলাকাক্সী ও পুণ্যার্থী হয়ে সন্তানের এহেন প্রতিপাল্য কর্তব্য সুচারুরূপে সম্পাদনের ল্েয সবসময় মাতাপিতার সেবাকর্মে নিবেদিত থাকা উচিত। তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে এ কাজের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে বেড়ে যায়। এ সময় সন্তানের কর্ম-তৎপরতাও আরও বাড়ানো অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ নিকায়ের সিগালকোবাদ (সিংগালোবাদ) সূত্রে গৃহীদের ছয়দিক রা বিষয়ক উপদেশ প্রসঙ্গে মহামানব বুদ্ধ মাতাপিতাকে পূর্বদিকরূপে অভিহিত করে বলেছেন, এই দিক রার্থে সন্তানকে মাতাপিতার প্রতি পাঁচটি কর্তব্য সম্পাদন করতে হয়। কর্তব্যসমূহ হচ্ছে- ১) মাতাপিতাকে আমরণ যাবতীয় ভরণ-পোষণ দিয়ে যথাযথভাবে তাঁদের লালন-পালন করা, ২) প্রাত্যহিক জীবনে নিজের কাজ করার আগে মাতাপিতার প্রতি করণীয় কাজ সম্পন্ন করা, ৩) বংশ পরম্পরায় কুল-প্রচলিত সুনীতি সুরায় তৎপর থাকা, ৪) বংশের ঐতিহ্য, মর্যাদা অুণœ রাখা ও ৫) মাতাপিতার উপদেশ অনুসারে উত্তরাধিকারী হিসেবে বিষয়-সম্পত্তির সুষ্ঠু রণাবেণে যতœপরায়ণ হওয়া। মাতাপিতাকে প্রয়োজনীয় ভরণ-পোষণ প্রদান করা সন্তানের প্রতিদিনেরই কর্তব্য। এটিকে সাময়িক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। বরং তাঁদের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বণ পর্যন্ত এই কর্তব্য পালন বলবৎ থাকে। নিজের কাজ বেশি বা গুরুত্বপূর্ণ এমন যুক্তি দিয়ে মাতাপিতার কাজের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন না করে তাঁদের কাজের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদান করা সন্তানের কর্তব্য। প্রয়োজনে মাতাপিতার সম্মতি নিয়ে সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনে মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোন কারণেও নিজ বংশে কখনো কুনীতি প্রচলনের অপচেষ্টা না করে সর্বজন-প্রশংসিত বংশীয় সুনীতি রায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকা সন্তানের দায়িত্ব। এতে মাতাপিতা সন্তুষ্ট থাকে, আনন্দ লাভ করে। কারণ, মাতাপিতা বংশ পরম্পরায় কুল-প্রচলিত সুনীতির রক, পর্যবেক, উপদেষ্টা। তাঁদের মনে প্রীতি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে সন্তান পরোভাবে মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য পালন করে থাকে। উল্লেখ্য, বংশীয় সুনীতি সুরা করা ‘সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম’রও একটি প্রতিপাল্য দিক। মাতাপিতা বংশের ঐতিহ্য, মর্যাদা রার উত্তরাধিকারী। তাঁদের কামনা বংশের সুনাম, পরিচিতি চিরদিন অটুট থাকুক। তাই বংশের ঐতিহ্য-মর্যাদা বিনষ্ট হয় এমন কাজ করা থেকে বিরতির মধ্যেও মাতাপিতার প্রতি প্রকারান্তরে সন্তানের কর্তব্য পালিত হয়। মাতাপিতার নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে যথার্থ কারণ ছাড়া তা বিক্রি বা হস্তান্তর না করে সর্বদা সুরার মধ্য দিয়েও সন্তানের কর্তব্য সম্পাদিত হয়ে থাকে।
প্রব্রজ্যা বা উপসম্পদায় ইচ্ছুক সন্তানকে মাতাপিতার অনুমতি নিতে হয়। মাতাপিতা জীবিত থাকলে তাঁদের অনুমতি ছাড়া এই কাজটি করা সম্ভব হয় না। জন্মদানসহ সন্তানের প্রতি মাতাপিতার স্নেহ-মমতা, লালন-পালন, শিা-দীা ইত্যাদির গভীর তাৎপর্য বিবেচনায় ঘটনা প্রসঙ্গে মহাকারুণিক বুদ্ধ বর্ণিত নিয়মটি প্রজ্ঞাপ্ত করেন। এতে মাতাপিতার সন্তান-বাৎসল্যের জয়ধ্বনি ঘোষিত হয়েছে এবং পূর্বানুমতির মাধ্যমে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সুনীতিও প্রকাশ পেয়েছে। অধিকন্তু, মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য অবহেলায় স্বেচ্ছাচারী সন্তানের অপকৌশলও যেন কার্যকর হওয়ার সুযোগ না থাকে তাও প্রকারান্তরে অনুমতি নেয়ার বাধ্যবাদকতায় ব্যাহত হবে। এমন একটা ধারণাও সাধারণ জনের মনে উদয় হওয়া অসম্ভব নয়, যাকে আমরা বুদ্ধের প্রজ্ঞাপ্ত বিষয়টির একটি অন্তর্নিহিত ভাব-রূপেও হয়তো প্রাসঙ্গিকভাবে চিহ্নিত করতে প্রয়াস পাচ্ছি।
ভিু গৃহী অবস্থায় মাতাপিতার সন্তান। উপসম্পদার পূর্বে সেই সন্তান গৃহত্যাগ করেন। আর ভিু হয়ে সর্বসাধারণের নিকট থেকে দ্বিপ্রত্যয় বা চতুর্প্রয়ের উপর তিনি নির্ভরশীল থাকেন। তথাপি মাতাপিতার প্রতি তাঁর কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। এ প্রসঙ্গে অঙ্গুত্তর নিকায়ের দুই নিপাত থেকে উদ্বৃত বুদ্ধের উপদেশ ল করলে মাতাপিতার প্রতি ভিুর কর্তব্য সম্পর্কে বিশেষ অবহিত হওয়া যায়। বুদ্ধ বলেন, ‘ভিুগণ! যদি সেই সন্তান সপ্তরতœ পরিপূর্ণ এ মহাপৃথিবীর চক্রবর্তী রাজত্ব তার মাতাপিতাকে প্রদান করে তবুও মাতাপিতার উপকারের প্রত্যুপকার করা যায় না, তার কারণ কী? ভিুগণ, মাতাপিতা সন্তানের পালনকারী, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বর্ধনকারী এবং এ ধরাধাম প্রদর্শনকারী আদি অপ্রমেয় উপকারী।’ ভিু হয়ে মাতাপিতার ভরণ-পোষণ করা যায়। সদ্ধর্ম-গ্রন্থে এ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, ‘দাতার দানকৃত শ্রদ্ধালব্ধ বস্তু ভিু প্রথম কিছু ভোগ না করেও মাতাপিতাকে প্রদান করতে পারবে।’ কায়-সংসর্গ বর্ণনায় বিবৃত হয়েছে, ‘মাতাকে যদি বিহারে এনে সেবা করতে হয়, মাতার মলমূত্রলিপ্ত কাপড় স্বহস্থে ধোয়াসহ অন্যান্য কাজগুলো করে মাতৃসেবা করা উচিত, তাঁকে স্পর্শ করা অনুচিত, ... শ্রামণ যেমন ভিুর সেবা করে, তেমন, ভিু স্বহস্থে ¯œান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি মাজন ইত্যাদি কাজের দ্বারা পিতৃসেবা করবে।’ উপরি-উক্ত বর্ণনার পরিপ্রেেিত বলা যায়, পরিবারে যদি মাতাপিতাকে ভরণ-পোষণ বা সেবা-শুশ্রƒষা অথবা ওষুধ-পথ্যাদি দিয়ে রণাবেণ করার কেউ না থাকে কিংবা অর্থ-সম্পদের অভাব হয় অথবা সামর্থ্যবান সন্তান থাকা সত্ত্বেও মাতাপিতার প্রতি অবহেলা করে তাহলে ভিু-সন্তান স্বীয় মাতাপিতার দায়িত্ব নিয়ে প্রয়োজনীয় কর্তব্যসমূহ সম্পাদনে রত থাকতে পারেন। ভিুর এহেন কর্তব্য পালন সদ্ধর্ম পরিপন্থী নয়, বরঞ্চ সদ্ধর্মানুগ।
মাতাপিতা তাঁদের সন্তানকে বহু যতœ ও অনেক কষ্টে বড় করে তোলেন। যতটুকু সম্ভব নানা বিদ্যাশিায় শিতি করেন, নিজ জীবনের বিনিময়ে রা করেন, বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করান, বিষয়-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেন এবং প্রব্রজ্যা বা উপসম্পদা গ্রহণের ব্যবস্থা নেন। বস্তুত, সন্তানের জন্য মাতাপিতা কত কিছু যে করেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। মাতাপিতার এইরূপ কাজে তাঁরা যে অপরিসীম দয়াবান, দায়িত্বপরায়ণ, সন্তানগত-প্রাণ তা-ই প্রত্য-েপরোে শতরূপে ফুটে ওঠে। এমন গুণধর মাতাপিতার প্রত্যুপকার করা সন্তানের পে কখনো সম্ভব হয় না। সর্বোত্তম পরিচর্যায় রাখা হলেও তাঁদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য অবশিষ্ট থেকে যায়। তাই মাতাপিতার ঋণও শোধ করা যায় না। মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যের শেষ কোথায় এবং তাঁদের ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা সম্ভব বা আদৌ তা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক ব্যাপার। এ প্রসঙ্গে অঙ্গুত্তর নিকায় থেকে উদ্ধৃত ভগবান বুদ্ধের দেশনাংশটুকু অনুধাবন করলেই এসব প্রশ্নের যথাযথ প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়। বুদ্ধের দেশনাংশটুকু হচ্ছে- ‘হে ভিুগণ! মাতাপিতার ঋণ কেউ জীবনে শোধ করতে পারে না। যদি কোন ব্যক্তি মাতাকে এক কাঁধে এবং পিতাকে অন্য কাঁধে নিয়ে বসবাস করে, ঐ অবস্থায় তাঁদের স্নান, গাত্রমর্দন, শুশ্রƒষা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ শত বছর ধরে করতে থাকলেও এর দ্বারা মাতাপিতার ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। যদি কোন লোক মাতাপিতাকে অগাধ ধন-সম্পত্তির অধিকারী করে, তা’তেও সন্তানের পে মাতাপিতার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। কারণ, মাতাপিতা অশেষ ত্যাগ স্বীকার করে এবং স্বীয় জীবনের বিনিময়েও সন্তানকে বড় করে তোলেন। ভিুগণ, যদি কোন জ্ঞানসম্পন্ন কৃতজ্ঞচিত্ত সন্তান মাতাপিতাকে মিথ্যাদৃষ্টি থেকে উদ্ধার করে সৎ-উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে সৎ-কর্মে নিয়োজিত তথা প্রতিষ্ঠিত করতে সম হন অর্থাৎ ত্রিরতেœ শ্রদ্ধাহীন মাতাপিতাকে শ্রদ্ধাবান, দুঃশীল মাতাপিতাকে শীলসম্পন্ন, কৃপণ মাতাপিতাকে ত্যাগপরায়ণ ব্যক্তিতে পরিণত করতে সম হন এবং আত্মত্যাগের সাহায্যে মাতাপিতার অন্তরে জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত করতে পারেন তবেই হবে মাতাপিতার প্রতি ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব।’
মহামানব গৌতম সম্যক সম্বুদ্ধ মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং নিজেও গৃহীজীবনের মাতাপিতার যথাযথ প্রত্যুপকার করে কৃতার্থ হয়েছেন। তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যের জীবনচরিতেও মাতাপিতার প্রতি যথার্থ কর্তব্য সম্পাদনের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ল করা যায়। বুদ্ধ প্রচণ্ড রোদ উপো করে ও পায়ে হেঁটে সুদূর রাজগীর থেকে কপিলবস্তু পৌঁছে তাঁর গৃহীজীবনের পিতা শাক্যরাজ শুদ্ধোধন ও বিমাতা রানি মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে সপ্তাহব্যাপী সদ্ধর্ম দেশনা প্রদান করেন। দেশনা শুনে তাঁর পিতা প্রথমে স্রোতাপত্তি, পরে সকৃদাগামী ও অনাগামী ফল লাভ করেন। আর তাঁর বিমাতা স্রোতাপত্তি ফলে অধিষ্ঠিতা হন। পঞ্চম বর্ষায় বৈশালীর মহাবনে অবস্থানের সময় বুদ্ধ শাক্যরাজের ভীষণ অসুস্থতার সংবাদ জানতে পারেন। তখন তিনি আকাশ মার্গে কপিলবস্তুর রাজপ্রাসাদে উপনীত হয়ে মুমূর্ষু রাজাকে ঋদ্ধিময় সদ্ধর্ম দেশনা প্রদান করে তাঁকে অর্হত্বে উন্নীত করান। সিদ্ধার্থের (পরবর্তী সময়ে গৌতম বুদ্ধ) জন্মের সপ্তাহ পর তাঁর মাতা রানি মহামায়া মৃত্যুবরণ করে তুষিত স্বর্গে দেবপুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। বুদ্ধ তাঁর সপ্তম বর্ষায় সেখানে গিয়ে দেবপুত্ররূপী মাতাকে উপল করে দেবসভায় তিন মাস ব্যাপী অভিধর্ম দেশনা প্রদান করেন। এতে সেই দেবপুত্র স্রোতাপন্ন হওয়ার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন। বুদ্ধ তাঁর বিমাতাসহ অন্যান্যদের ভিুণী-ধর্মে প্রবেশ করার সুযোগ দেন। ফলে তাঁর বিমাতা পরবর্তী সময়ে উচ্চস্তরে উন্নীত হন। এইভাবে বুদ্ধ তাঁর গৃহীজীবনের মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁদের ঋণ পরিশোধে ধন্য হন।
বুদ্ধের শিষ্য ধর্মসেনাপতি, অনুবুদ্ধ সারিপুত্র স্থবিরের মাতা সারি ব্রাহ্মণী ঘোর মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্না ছিলেন। মাতার প্রতি কর্তব্য সম্পাদন তথা ঋণ পরিশোধের মানসে তিনি পরিনির্বাণের খুব কাছাকাছি সময়ে তাঁর পিতৃগৃহে গমন করেন। তারপর তিনি তাঁর মাতাকে নানাভাবে সদ্ধর্মের মহিমা প্রদর্শনের সুযোগ প্রদান করে দিয়ে গৃহীজীবনের মাতার ভুল সংশোধন করান। অতঃপর সারি ব্রাহ্মণী ত্রিশরণ নিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে মার্গ-ফল সাাৎ করেন। ধর্মসেনাপতি মাতৃ-কর্তব্য সম্পাদন করে সেদিনই সেখানে অনুপাদিশেষ নির্বাণে পরিনির্বাপিত হন। স¤্রাট আশোকের অতিজাত পুত্র ছিলেন অর্হৎ মহিন্দ্র (মহেন্দ্র) স্থবির। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে জানতে পারেন তাঁর গৃহীজীবনের পিতা ক্রোধ-চিত্তে মারা যাওয়ায় মৃত্যুর পর অজগর সাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। তারপর তিনি সেই সাপের নিকট উপস্থিত হয়ে ঋদ্ধি প্রভাবে সর্পরূপী পিতাকে সদ্ধর্ম দেশনা প্রদান করেন। ফলে সেটি মুক্ত হয়ে স্বর্গবাসী হলে সেখানে গিয়ে পুনরায় দেশনা প্রদানের মাধ্যমে মার্গফল প্রাপ্ত করান।
বুদ্ধের শিষ্য অগ্রশ্রাবক মহামৌদগল্যায়ন একজন্মে গৃহীজীবনে স্ত্রীর কুপরামর্শে দৃষ্টিশক্তিহীন বয়োবৃদ্ধ মাতাপিতাকে সেবা-শুশ্রƒষার পরিবর্তে হত্যার জন্য কৌশলে গভীর বনে নিয়ে যায়। সেখানে নিজে ডাকাত সেজে মাতাপিতাকে দণ্ড দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করেন। এইরূপ হীন কাজের কারণে জন্মজন্মান্তরে তাঁকে বহুবার নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। সর্বশেষ জন্মেও মৃত্যুর পূর্বে ডাকাতরা তাঁকে দণ্ডের আঘাতে পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় (মাংস-পিণ্ডবৎ করে) ফেলে যায়। অথচ সেই সময় তিনি ছিলেন মহাঋদ্ধিসম্পন্ন অর্হৎ। অবজাত পুত্র যুবরাজ অজাতশত্র“ তার মহোপকারী, ধার্মিক, স্র্রোতাপন্ন পিতা রাজা বিম্বিসারকে নির্মমভাবে কষ্ট দিলে তিনি মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হন। পিতৃহত্যার কারণে অজাতশত্র“র অর্হত্ব-ফল লাভের হেতু নষ্ট হয়ে যায় এবং মৃত্যুর পর অজাতশত্র“ লৌহকুম্ভী নরকে উৎপন্ন হয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগে রত আছে। তবে পিতার মৃত্যুর পর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ত্রিরতেœর শরণ নিয়ে তৎ-প্রাণগত হয়ে জীবনযাপনের ফলে অনাগতে তাঁর পচ্চেক (প্রত্যেক) বুদ্ধত্ব পদ লাভ করে পরিনির্বাপিত হওয়ার কুশলও অর্জিত হয়। এতদসত্ত্বেও অজাতশত্র“র প্রতি সহজেই কেউ সুপ্রসন্ন হতে পারে না। অজাতশত্র“র পিতৃ-নির্যাতনের কাহিনী স্মরণ করা বা শুনা মাত্র একজন অবজাত পুত্রের প্রতিচ্ছবিই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে; এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। পিতা বা মাতাকে কষ্ট দিয়ে, নির্যাতন করে এবং তাঁদের প্রতি কর্তব্য সম্পাদনে অবহেলা বা ত্র“টি করে নিজে সদ্ধর্ম পথে চলার কোন গৌরব নেই। বরং এতে কুখ্যাতিই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। অনেক প্রবাসী সন্তান স্বীয় স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের অসুস্থতা কিংবা কোন অসুবিধায় অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, অথচ নিজের বয়োবৃদ্ধ মাতাপিতার সামান্য খোঁজ-খবর নিতে বড়ই পরাক্সমুখ। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধের উক্তি দুটি লণীয়-
‘যো মাতরং বা পিতরং বা - জিন্নকং গতযোব্বনং,
পহূসন্তো না ভরতি - তং পরাভবতো মুখং।’ (পরাভব সুত্তং)
‘যো মাতরং বা পিতরং বা - জিন্নকং গতযোব্বনং,
পহূসন্তো না ভরতি - তং জঞ্ঞা বসলো ইতি।’ (বসল সুত্তং)
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজের প্রভূত ধন-সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তার বিগতযৌবন জরাজীর্ণ মাতাপিতাকে ভরণ-পোষণ দেয় না, (পরাভব সূত্র মতে) তার পরাভব বা পরাজয় হয়। আর (বসল সূত্র মতে) সে বৃষল বা চণ্ডাল নামে অভিহিত হয়।
মাতাপিতার সব সন্তান সন্তানই, বিশেষ প্রভেদ কোথায়। তবে কোন সন্তান যদি অসুস্থ বা বিকলাঙ্গ অথবা আর্থিকভাবে দীন-হীন থাকে সেেেত্র মাতাপিতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালনে হয়তো কিছুটা শৈথিল্য পরিলতি হবে বা বিঘœ ঘটবে; ইহা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত কর্মজীবীকে খেয়াল রাখতে হয়, যেন স্বীয় মাতাপিতাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়। আর কোন পেশাজীবী সন্তানের নিয়মাতিরিক্ত সময় ব্যয় করে অধিক অর্থোপার্জনে মশগুল থেকে মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য পালনে ত্র“টি করা কি প্রশংসনীয় কাজ? স্মর্তব্য, কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অসদুপায় অবলম্বনে অর্জিত অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে মাতাপিতাকে পরিপোষণ করা হীনকর্মই বটে। কোন সন্তান অধ্যয়ন অথবা চাকরি-সংক্রান্ত প্রশিণ বা গবেষণা কাজে দূরবর্তী স্থানে কিংবা বিদেশে অবস্থানকালীন সময়ে মাতাপিতার প্রতি তাঁর কর্তব্যাদি পালনের ব্যাপারে পরিপূরকরূপে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য-সদস্যার নিকট থেকে বাড়তি সহায়তা লাভের ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করা অথবা যথোপযুক্ত কাজের লোক নিযুক্ত করে যাওয়া অত্যাবশ্যক। বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করে বা কোন বৃদ্ধাশ্রমে বয়োবৃদ্ধ মাতাপিতাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে নির্ভার, নিশ্চিন্ত মনে করা আদৌ বৌদ্ধোচিত কিনা তা সদ্ধর্মের নিরিখে যথার্থভাবে জানা আমাদের উচিত নয় কি? বৈদেশিক নাগরিকত্ব প্রাপ্ত ও প্রবাসী এমন বহু সন্তান আছে যারা নিজের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে তাদের কর্মরত-দেশে নিয়ে গিয়ে সুখে দিনযাপন করে, অথচ স্বীয় মাতাপিতা স্বদেশেই অবস্থান করতে বাধ্য হন। সন্তানের এহেন আচরণ কতটুকু শোভনীয় ও ন্যায়সঙ্গত, এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া অসঙ্গত নয়। তাঁদের প্রতি সংশ্লিষ্ট সন্তানের এরূপ আচরণ মাতৃ-পিতৃ কর্তব্য পালনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে সহজে।
মাতাপিতা সন্তানের মহোপকারী, অকৃত্রিম হিতাকাক্সী। তাঁদের প্রতি রয়েছে সন্তানের অপরিসীম কর্তব্য। এ কর্তব্য পালনে অবহেলার কোন সুযোগ নেই। মাতাপিতার প্রতি প্রাত্যহিক কর্তব্যাদি পালনের মাধ্যমে অপ্রমেয় পুণ্য এবং যথেষ্ট সাফল্য ও সুখ্যাতি অর্জন করা যায়। এ প্রসঙ্গে সদ্ধর্ম-শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছেÑ
‘তায় নং পরিচারিয়া মাতাপিত্সু পাণ্ডিতা
উধে’ব নং পসংসন্তি পেচ্চ সন্নে চ মোদতীতি।’
অর্থাৎ, জ্ঞানীগণ মাতাপিতার পরিচর্যাকারীকে বিভিন্নভাবে প্রশংসা করেন। এইরূপ সন্তান মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে জন্ম পরিগ্রহ করে বিপুল আনন্দময় সুখ ভোগ করেন। অন্যদিকে মাতাপিতার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন, কর্তব্য পালনে অনীহা প্রকাশ এবং কোনরূপ অন্যায় আচরণে জন্মে জন্মে ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দাস-দাসী দ্বারা মাতাপিতার সেবা-যতœ, নানা পরিচর্যা করালেও তাঁদের প্রতি সন্তানের পরিপূর্ণ কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। আর সন্তান গৃহী, শ্রামণ, শ্রামণেরী, ভিু ও ভিুণী হিসেবে যেকোন অবস্থায় থাকলেও মাতাপিতার প্রতি প্রত্যেকে স্ব স্ব কর্তব্য সম্পাদনে যথাযথভাবে যতœবান হওয়া বিজ্ঞতারই পরিচায়ক। আর এ কাজে নিজ স্বামীকে উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা বিবাহিতা মেয়ের অন্যতম কর্তব্য। এতে নিজের সন্তানরাও তাদেরও দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়ে স্বীয় মাতাপিতার প্রতিও নিজ নিজ কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ হবে, সচেষ্ট থাকবে। মাতাপিতার সার্বিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সন্তুষ্টি বিধান এবং দুঃখমুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য তাঁদের প্রতি করণীয় কর্তব্যসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে প্রতিপালনই হচ্ছে সন্তানের অত্যাবশ্যকীয় বৌদ্ধোচিত কাজ।
লেখক : চাকরিজীবী, প্রাবন্ধিক ।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement