Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

আমাদের একজন বড়ুয়া সুকুমার

 

আমাদের একজন বড়ুয়া সুকুমার
করেছেন মহাজয় ছড়াতে ধুন্ধুমার ,
আজ তিনিও প্রয়াত অচিন দেশেতে
মনে রবে অনুক্ষণ সন্ধ্যা প্রাতেতে।
প্রয়াণে শ্রদ্ধা হে গুণী
চলে গেলেন #ছড়াজাদুকর_সুকুমার_বড়ুয়া
তাঁর মহাপ্রয়াণে গভীর শোকাহত। তাঁর পারলৌকিক সংগতি ও নির্বাণ সুখ কামনা করছি। 🖤
***********************************
#সুকুমার_বড়ুয়া'র সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি
~ রাশেদ রউফ
#জন্ম : ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮। চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার বিনাজুরি গ্রামে। বাবা : সর্বানন্দ বড়ুয়া। মাতা : কিরণ বালা বড়ুয়া। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া নিরুদ্দেশ হন। ১৯৬১ সালের ২৭ ডিসেম্বরে মারা যান মা।
#শৈশব : একেবারে শিশু বয়সে বাবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় অভাবগ্রস্ত সংসারে হাল ধরতে হয়েছিল তাঁকে। ফলে শৈশবে নেমে পড়তে হয়েছিল রোজগারে। ১৯৫০ সালের ১ জুন তিনি তাঁর প্রথম নাম লেখান শিশুশ্রমিকের খাতায়। সুকুমার বড়ুয়া নিজেই বলেন আমার প্রথম চাকরি চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ নালাপাড়ার বাবু মনোমহন তালুকদারের বাসায়। প্রথম কাজ হলো একটি ৫ মাসের শিশুকে সঙ্গ দেয়া। মাসিক বেতন তিন টাকা। সেই শিশুটি এখন চিত্র পরিচালক চঞ্চল বড়ুয়া (ঘর ভাঙ্গাঘর)। সেই পরিবারে এসেই পেলাম কিছু উন্নত শ্রেণীর রুচিশীল মানুষ। কর্তাবাবু গম্ভীর প্রকৃতির হলেও বেশ স্নেহপ্রবণ, গৃহকত্রী মাসীমা এখনো জীবিত। তিনি আপন সন্তানের চেয়ে কম স্নেহ করেন না। শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা নাচ, গান, নাটক ইত্যাদি করে। আপন ভাইবোনের মতো সম্পর্ক। কারো মনে থাকে না আমি পরিবারের কে? ১৯৫২ সালে আমার এক মামতো ভাইয়ের সাথে চলে এলাম ভৈরব বাজার। কাজ দু’জনের রান্না করা। বেতন ৫ টাকা। চট্টগ্রামের চেয়ে এখানে দু’টাকা বেশি।” এভাবে অতিবাহিত থাকে সুকুমার বড়ুয়া’র সুবর্ণ শৈশব-কৈশোর। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে ছোটোবেলাতেই অনেক কিছু করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে সীমাহীন কষ্ট।
#শিক্ষা : একজন ভালো ছাত্র হয়েও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। আর্থিক অনটনের কারণে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষা তাঁর দেয়া হয় নি। তিনি বলেন-‘মাত্র আড়াই ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি আমি’। সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত সুকুমার বড়–য়া তাঁর স্কুল জীবন সম্পর্কে বলেন আমি যে প্রাইমারী স্কুলে পড়ি, সেই স্কুলে একদিন আসবেন ইন্সপেক্টর। মহেশ মাষ্টার. রমণী মাষ্টার আর সুশীল মাষ্টার; এই তিনজন ভালো সেজেগুজে এসেছেন। গ্রামের শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হলো। যথাসময়ে এক দাঁড়িওয়ালা স্পষ্টভাষী ইন্সপেক্টর এলেন। ছাত্রদের বুদ্ধিসুদ্ধি পরীক্ষা হবে। ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীর সাথে কিছু হাই স্কুলের বড় বড় ছেলেকে ভেজাল দিয়ে দাঁড় করানো হলো লাইন ধরে। ইন্সপেক্টর সাহেব বললেন-‘বুদ্ধি ধরো বুদ্ধি ধরো!’ সবাই হাঁ-করে আছে! বুঝলে না? দু’হাত এক করে পতাকা ধরার মতো মুষ্টিবদ্ধ করো। লাইনে আট-দশ ছেলে হবে ঐ দলের সাথে আমাকেও দাঁড় করানো হলো। কিছু মানষাঙ্ক ধরলেন। মানষাঙ্ক মানে-মনে মনে সমাধান করা। প্রথমে কয়েকটি আমি আগে বলতে পারি নি, পরে বেশ কয়েকটি আমি আগেই পেরেছি। তাঁর শেষ অংকটি ছিল ৩১-১৭= কত? চট করে বললাম ১৪। ইন্সপেক্টর সাহেব দারুণ খুশিতে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন। এর পরের অংকটি শ্লেটে করতে হবে বিশেষ কায়দায়। সবাইকে দাঁড় করানো হলো, যাতে একজনেরটা অন্যরা না দেখতে পায়। হুকুম দিলেন লেখ
এগারো হাজার এগারো,
তাকে এগারো দিয়ে ভাগ করো।
অনেকে ১১০১১ লিখতেই পারে নি। আমার এবং আরেকজন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রের ফলাফল হয়েছে ১০১। সবার অংক ভুল হলে ইন্সপেক্টর সাহেব আমার খুব তারিফ করলেন। কিনতু সে স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর পড়া আমার শেষ হয় নি!
স্কুল থেকে পরীক্ষার ফি মাপ করবেন বলে হেড মাষ্টার সুশীল বাবু জানালেও বড় দিদি আমাকে পরীক্ষা দিতে দেয় নি। স্কুলে যাওয়ার সময় বাধা দিয়ে বললেন যাও গরু ছাগল দেখো পড়তে হবে না। বাংলাদেশে এমনি কত লক্ষ কিশোরের ভাগ্যে এমন ঘটেছে কে জানে! প্রচুর কাজের চাপে ব্যবহারের বস্ত্রের অভাবে যখন আমি অতিষ্ট তখনই মামাবাড়ি থেকে মা এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। অন্য গ্রামে আমার মাসির অসুখ এবং আমাকে দেখতে আগ্রহী বলে ফাঁকি দিয়ে মামাবাড়ি এবং পরে চট্টগ্রাম শহরে দামপাড়া পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। মামাবাড়ির লোকেরা আমার দুরবস্থার কথা জেনে এই কৌশল প্রয়োগ করে আমাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন।”
#কর্মজীবন : কর্মজীবন তো সেই ছোটোকাল থেকেই শুরু। কোনো সময় শিশুর সঙ্গ দেয়া, কোনো সময় রান্না করা, আইচক্রিম বিক্রি করা ইত্যাদি কাজই তাঁর অবলম্বন ছিল। মা বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ৬৪ টাকা বেতনে একটি চাকরি জোটে। বিশ^বিদ্যালয়ের নিম্নপদস্থ কর্মচারী হয়েও লেখালেখির কারণে তিনি সবার নজরে চলে আসেন। বিশ^বিদ্যালয়ের পুষ্টিভবনের ‘সহকারী স্টোর কিপার’ পদ থেকে তিনি সম্প্রতি এল. পি. আর. এ চলে আসেন।
#সংসার_জীবন : সুকুমার বড়ুয়া বিয়ে করেছিল ২১ এপ্রিল ১৯৬৪ সালে। পাত্রী ননী বালা বড়–য়া, চট্টগ্রামের গহিরা গ্রামের একবিশিষ্ট শিক্ষকের (প্রতাপ চন্দ্র বড়ুয়া) মেয়ে। সন্তানঃ ৪ জন। ৩ মেয়ে (চন্দনা বড়ুয়া, রঞ্জনা বড়ুয়া, ও অঞ্জনা বড়ুয়া) ও ১ ছেলে (অরূপ রতন বড়ুয়া
#সাহিত্য_চর্চা : সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ৩ জুলাই ১৯৫৮ সালে (১৯ আষাঢ় ১৩৬৫), দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায়। ‘বৃষ্টি নেমে আয়’ শীর্ষক ছড়াটি প্রথম লেখা হলেও ঐ পাতার তৃতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। প্রথম হয়েছিলেন নাজমা জেসমিন এবং দ্বিতীয় হয়েছিলেন ইমরুল চৌধুরী। তাঁর লেখালেখিতে আগমন সম্পর্কে তিনি বলেন-“আমি কেমন করে ছড়ার জগতে প্রবেশ করলাম সে বিষযে স্পষ্ট কিছু ব্যাখ্যা করা সম্বব নয়। ছেলেবেলায় মনসার পুঁথি শোনার সময় শুনতাম ‘তোমার গান তুমি গাইবা উপলক্ষ আমি/ অশুদ্ধ হইলে মাগো লজ্জা পাইবা তুমি’। এক অদৃশ্য দৈবসত্তার উপর নির্ভরতা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতেও প্রচুর দেখতে পাই। আমার কৃতিত্ব দেখে অনেক সাধারণ পাঠক বলেন, এটা ঐশ^রিক দানÑজন্মান্তরের কর্মফল ইত্যাদি। এসব আমার মস্তিষ্কে খুব একটা ক্রিয়া করে না। সব বুঝি না।
আমি রাউজার থানার বিনাজুরি গ্রামে সেখানে জন্মেছিলাম। সেখানে শিল্প-সংস্কৃতি দূরে থাক, নিম্নতম লেখাপড়ার চর্চাও খুব একটা ছিল না। তাই বলে চট্টগ্রাম তথা বাংলার লোক ঐতিহ্যের অবদান লোকজ ছড়া বা শ্লোকের কোনো অভাব ছিল না। দলবদ্ধ গ্রাম্য শিশুদের রোদ ডাকা, বৃষ্টি নামানো, হাডুডু খেলা, চি-বুড়ি খেলা, ধাঁধা বা হেঁয়ালী ইত্যাদি ছড়াও ছন্দে ছন্দে ভাব প্রকাশের মাধ্যমগুলো আলোড়িত করতো।
১৯৪৪-৪৫ সনের দিকে যখন আমার বড়দিদির বাড়িতে অবস্থান করছিলাম-সেই ইদিলপুর আমাদের পাশ্ববর্তী গ্রাম। সে গ্রামে বৌদ্ধদের জন্য নিষিদ্ধ হলেও কিছু লোক সারারাত জেগে মনসার পুঁথি পাঠ করতো। দলবদ্ধ নরনারী সেই পুঁথির ছন্দে কাহিনীর যাদুতে মুগ্ধ হয়ে যেতো। আমি তো নাবালক শিশু। আমি আরো বেশি মুগ্ধ হতাম। কিনতু বাস্তব কারণে আমাকে যদিও খুব লাজুক বা মুখচোরা হয়ে থাকতে হতো, তবুও খেলাধুলো বা ছোটাছুটির সময় কিংবা পথে একা চলার সময় সেই পুঁথির কোরাসগুলো জোরে জোরে গাইতে গাইতে চলে যেতাম। তখন ঐ অঞ্চলে ভেলুয়ার পুঁথি, মনসার পুঁথি, বিশেষ ঘটনার কবিতা ইত্যাদি খুব জনপ্রিয় ছিল।
এরও আগে মামাবাড়িতে অবস্থানকালে আমি যোগীন্দ্রনাথ এর ‘হাসিখুশি’ পুরোটাই মুখস্থ করেছিলাম (১৯৪৩)। দিদির বাড়িতে আবার অনেকেই ঘিরে ধরতো সেই বর্ণমালার ছড়াগুলো মুখস্থ শোনার জন্য। আশ্চর্যের ব্যাপার এই ৫০ বছর পরও আমার ঢাকার আবাসিক এলাকার ছেলেমেয়েরা টিভি অনুষ্ঠানের চাইতেও আমার মুখের ছড়া বেশি পছন্দ করে বলে মনে হয়।”
#সুকুমার_বড়ুয়ার_বই :
পাগলা ঘোড়া (১৯৭০, বাংলা একাডেমী)
ভিজে বেড়াল (১৯৭৬, মুক্তধারা)
চন্দনা রঞ্জনার ছড়া (১৯৭৯, মুক্তধারা)
এলোপাতাড়ি (১৯৮০, বাংলা একাডেমী)
নানা রঙের দিন (১৯৮১, শিশু একাডেমী)
সুকুমার বড়–য়ার ১০১টি ছড়া (১৯৯১, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র)
চিচিং ফাঁক (১৯৯২, ওলট পালট প্রকাশনী)
কিছু না কিছু (১৯৯৫, বিশাখা প্রকাশনী)
প্রিয় ছড়া শতক (১৯৯৭, মিডিয়া)
বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া (১৯৯৭, সৌগতঃ ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয় ), ঠুস্ঠাস্ (১৯৯৮, প্রজাপতি প্রকাশন), নদীর খেলা (১৯৯৯, শিশু একাডেমী)
আরো আছে (২০০৩, আরো প্রকাশন)
ছড়া সমগ্র (২০০৩, সাহিত্যিকা)
ঠিক আছে ঠিক আছে (২০০৬, প্রবাস প্রকাশনী, লন্ডন), কোয়াল খাইয়ে (২০০৬)
ছোটদের হাট - (২০০৯, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী), লেজ আবিষ্কার - (২০১০, প্রথমা প্রকাশন)
#পুরস্কার :
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৭)
ঢালী মনোয়ার স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯২)
বৌদ্ধ একাডেমী পুরস্কার (১৯৯৪)
বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ ছাত্র সংসদ সম্মাননা (১৯৯৭)
অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য সম্মাননা (১৯৯৭)
জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা (১৯৯৮)
আলাওল শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯)
চোখ সাহিত্য পুরস্কার, ভারত (১৯৯৯)
নন্দিনী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব (শিশু সাহিত্য) (২০০০)
আইরিন আফসানা ছড়া পদক (২০০২)
স্বরকল্পন কবি সম্মাননা পদক (২০০৪)
শিরি এ্যাওয়ার্ড (২০০৫)
শব্দপাঠ পদক (২০০৬)
বৌদ্ধ সমিতি যুব সম্মাননা (২০০৬)
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সম্মাননা (২০০৬)
অবসর সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬)
মোহাম্মদ মোদাব্বের হোসেন আরা স্মৃতি পুরস্কার (২০০৭)
লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক (২০০৭)
রকিবুল ইসলাম ছড়া পদক (২০০৮)
লিমেরিক সোসাইটি পুরস্কার (২০০৯)[৩]
রাউজান ক্লাব সম্মাননা (২০০৯)
কবীর চৌধুরী শিশু সাহিত্য পুরস্কার (২০১০)
একুশে পদক (২০১৭)
মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার (২০২১)
#মৃত্য : ২ জানুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার। রাউজান, চট্টগ্রাম।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement