মৌর্য বংশের পরাক্রমী শাসক এবং অখণ্ড ভারতের জনক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু কখনও কাল্পনিক চানক্য ছিলেননা। বরং তাঁর গুরু ছিলেন বুদ্ধ তথাগত। পরবর্তী সময়ে ধূর্তরা ব্রাহ্মণ বলে এনে যুক্ত করে দিয়েছে কাল্পনিক চরিত্র চানক্যকে বুদ্ধের মহিমাকে আড়াল করার জন্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্পর্কে ব্রাহ্মণেরা অনেক ভ্রান্তি ছড়িয়েছে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন ভারতের প্রথম সম্রাট যিনি বিদেশী আক্রমকদের বিরুদ্ধে ভারতের সমস্ত গণসঙ্ঘকে একত্রিত করে বিশালাকার মৌর্য সম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ব্রাহ্মণীকরণ করার জন্য ব্রাহ্মণেরা এরূপ মিথ্যা প্রসারিত করেছেন যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ছিলেন চানক্য নামক ব্রাহ্মণ। কিন্তু ইতিহাস গবেষণা দ্বারা ইহা স্পষ্ট হয়েছে যে, চানক্য তথা কৌটিল্য নামে কোনো ব্যক্তি ইতিহাসে কখনো অস্তিত্ব ছিলনা।
বাস্তবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ছিলেন মাহন নামক একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং তাঁর মার্গদর্শনে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য স্বীয় সম্রাজ্যের নির্মাণ শুরু করেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তাঁর মিত্র পোরস উভয়ই বাল্যকাল হতে বৌদ্ধ ছিলেন এবং বুদ্ধের স্বপ্নের ভারত অর্থাৎ ধম্মরাজ্য বানাতে চেয়েছিলেন। একদিন ক্লান্ত হয়ে যখন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একটি বৃক্ষের নীচে শয়ন করেছিলেন, তখন একটি বিশালাকার সিংহ তাঁর স্বপ্নে এসেছিল এবং তাঁর নিকটে এসে তাঁকে অভয় প্রদান করছে এবং শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে সিংহনাদ করেছে।
তথাগত বুদ্ধকে শাক্যসিংহ বলা হতো এবং তাঁর ধম্মের মার্গদর্শনকে বলা হতো সিংহনাদ। একজন আদর্শ বৌদ্ধ রাজা বা সম্রাট কিরকম হওয়া উচিত এবং তাঁর আদর্শ ধম্মরাজ্য কেমন হবে, ইহার জ্ঞাতকরণ সূত্র পিটকের মধ্যম নিকায়ে বর্ণিত তথাগত বুদ্ধের ‘সিংহনাদ সূত্র’ হতে তথ্য পাওয়া যায়।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপর তথাগত বুদ্ধের সিংহনাদ সূত্রের গভীর প্রভাব ছিল এবং তদনুসারে তিনি স্বীয় সম্রাজ্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ইহা বর্ণনা করতে আজ আমি এখানে উপরিউক্ত বিষয়ের অবতারণা করেছি। অর্থাৎ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বুদ্ধানুরাগী সম্রাট ছিলেন এবং বুদ্ধের প্রভাবে তিনি স্বীয় সম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এতে স্পষ্ট হয়ে থাকে যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু এবং আদর্শ ছিলেন তথাগত বুদ্ধ। চানক্য হলেন কাল্পনিক চরিত্র।
পালি সাহিত্যের দীর্ঘ নিকায়ের ‘মহাপরিনির্বাণ সূত্র’ আমাদেরকে আরও তথ্য সরবরাহ করে থাকে যে, মৌর্যরা বুদ্ধের সময়েও বৌদ্ধ ছিলেন। সেজন্য তথাগত বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর পবিত্র অস্থিধাতুর যখন বুদ্ধানুসারী আটজন রাজার মধ্যে বিভক্ত করা হয়েছিল, তন্মধ্যে একটি অংশ পেয়েছিলেন পিপ্পলিবনের মৌর্যেরা। তাঁরা সেগুলি পূজার উদ্দেশ্যে স্তূপ নির্মাণ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। সুতরাং মৌর্যেরা যে পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ হয়েছেন তা নয়। বরং তথাগত বুদ্ধের জীবনকাল হতেই তাঁরা ছিলেন ত্রিরত্নের শরণাপন্ন।


0 Comments