Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

তথাগত বুদ্ধের ঐতিহাসিকতা

 

বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, সোশাল মিডিয়া এবং কিছু কল্পিত প্রচারের মাধ্যমে একটি নতুন ছদ্ম-ইতিহাস (Psedu-history) গড়ার প্রয়াস করা হচ্ছে।
এ দুষ্প্রচারের মুখ্য উদ্দেশ্য হল তথাগত বুদ্ধকে এক ‘কাল্পনিক পাত্র’ (Mythical Construction) বলে সিদ্ধ করা। এরূপ বিমর্ষের পেছনে লুকানো রাখা এজেণ্ডা, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যর প্রতি তাদের অজ্ঞানতা এবং তাদের যুক্তিতে সমাহিত বিরোধাভাসকে প্রকট করা অতীব জরুরী বলে মনে করি।
যদি কোনো ব্যক্তি বুদ্ধকে কাল্পনিক বলে থাকে, তাহলে তা কেবল ইতিহাসকেই প্রত্যাখ্যান করছে এমন নয়, বরং ভারতের সম্পূর্ণ প্রাচীন সভ্যতা, পুরাতত্ব এবং স্বয়ং নিজেদেরই ধার্মিক গ্রন্থ সমূহকেই আত্মঘাতী মোড়ে নিয়ে দাঁড় করাতে যাচ্ছে।
তাহলে আসুন, অকাট্য ঐতিহাসিক, পুরাতাত্বিক এবং সাহিত্যিক সাক্ষ্য সমূহের ভিত্তিতে এরূপ প্র্যাখ্যানবাদকে (Denialism) প্রকাশ করি।
১) পুরাতাত্বিক সাক্ষ্য
————————-
(পাথরের উপর উৎকীর্ণ সত্য (Archaeological Evidence): বুদ্ধকে কাল্পনিক বলতে থাকা লোকেরা সবসময় এরূপ কু-যুক্তি দিয়ে থাকে যে, বুদ্ধের সমকালীন কোনো শিলালেখ পাওয়া যায়না।
ইতিহাসের ক, খ অক্ষর জ্ঞান থাকার লোকও ইহা বুঝে থাকে যে, ভারতে পাথরের উপর রাজকীয় বার্তা উৎকীর্ণ করার (Epigraphy) ব্যাপক প্রারম্ভ খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দে মৌর্য সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকই করেছিলেন।
সম্রাট অসোকের শিলালেখ এবং রুম্মিনদেই (লুম্বিনী) স্তম্ভ: সম্রাট অসোক দ্বারা বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের প্রায় ২০০ বছর পরেই স্থাপন করা শিলালেখ আজও জীবিত জাগৃত অবস্থায় লুম্বিনীতে বিরাজমান রয়েছে।
নেপালের তরাই অঞ্চলে স্থিত রুম্মিনদেই স্তম্ভলেখনীতে স্পষ্ট লিখা হয়েছে যে-‘ইধ বুধে জাতে সাক্যমুনীতি।’ অর্থাৎ এখানে শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্ম হয়েছে। কোনো সম্রাট কি কোনো কাল্পনিক ব্যক্তির জন্মস্থানে গিয়ে কর মাফ করবে এবং পাথরের বিশাল স্তম্ভ দাঁড় করাবেন?
পিপ্পরহওয়া স্তূপ (কপিলবাস্তু): উত্তর প্রদেশের সিদ্ধার্থ নগর জিলার পিপ্পরহওয়া স্তূপের খননকার্যের দ্বারা যে অস্থি-মঞ্জুষা (Relic Casket) পাওয়া গিয়েছে, তাতে খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দের ধম্ম (ব্রাহ্মী) লিপিতে লিখা রয়েছে-‘ইযং সলিল নিধনে বুদ্ধস ভগবতে সকিযানং.. ‘ অর্থাৎ এখানে শাক্যবংশীয় ভগবান বুদ্ধের ধাতু (অস্থি) অবশেষ মওজুদ রয়েছে।
সারাংশ: যদি বুদ্ধ কাল্পনিক হন, তাহলে কি দেশ-বিদেশের সংগ্রহালয়ে রাখা এ অস্থি- মঞ্জুষা সমূহ এবং মৌর্যকালীন ধম্ম লিপিতে লিখিত অভিলেখও কি কাল্পনিক? পুরাতত্বকে মিথ্যা বলা মানে বিজ্ঞানকেই মিথ্যা বলার মতো হয়।
২) বৈশ্বিক এবং বহুভাষী সাহিত্যিক সাক্ষ্য (Global Literary Consensus):
——————————————
কোনো কাল্পনিক চরিত্রের নির্মাণ কোনো এক দেশ বা এক ভাষার কবি করতে পারেন। কিন্তু বুদ্ধ হলেন পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র এরকম মহাপুরুষ যাঁকে একটি ভাষায় নয়, বরং অনেক স্বতন্ত্র স্রোতের মধ্যেই পাওয়া যায়।
পালি ত্রিপিটক: দীর্ঘ নিকায়, মধ্যম নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় ইত্যাদিতে বুদ্ধের সমকালীন রাজাগণ যেমন-মগধ নরেশ বিম্বিসার, অজাতশত্রু, কোশল নরেশ প্রসেনজিতের সাথে তাঁর সরাসরি সাক্ষাত ও সংলাপের জীবন্ত বিবরণ রয়েছে। ইতিহাসে রাজা বিম্বিসার, রাজা প্রসেনজিৎ এবং রাজা অজাতশত্রুকে ঐতিহাসিক মান্য করা হয়। তাহলে তাঁদের সাথে বার্তালাপকারী বুদ্ধ কাল্পনিক কিভাবে হতে পারেন কিভাবে?
জৈন গ্রন্থ: বৌদ্ধ ধম্মের সমকালীন জৈন ধর্মের প্রাকৃত গ্রন্থ যেমন-‘উত্তরাধ্যয়ন সূত্র’ বা ‘ভগবতী সূত্র’তে স্পষ্ট বুদ্ধ এবং তাঁর ভিক্ষু সঙ্ঘের পরিস্কার উল্লেখ রয়েছে। দু’ পরস্পর বিরোধী বিচারধারায় পরস্পরের অস্তিত্ব তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন সেগুলির বাস্তবে অস্তিত্বে থাকে।
বিদেশী যাত্রীগণের যাত্রা বৃত্তান্ত: চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন চতুর্থ শতাব্দী এবং হিউয়েন সাং সপ্তম শতাব্দীতে যখন ভারতে এসেছিলেন, তখন তাঁরা সে শহর, বিহার এবং স্তূপ সমূহকে চাক্ষুষ দেখে বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, যা বুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। তাঁরা বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্যদের প্রজন্ম এবং পরম্পরার বিষয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন।
৩) বৈশ্বিক এবং পৌরাণিক সাহিত্যের বিরোধাভাস (The Mythical Contradiction):
————————————————-
বুদ্ধকে কাল্পনিক সিদ্ধ করার জেদের বশবর্তীতে ছদ্ম ইতিহাসকার অজান্তে নিজেদেরই পূজ্য গ্রন্থ সমূহকে ‘মিথ্যা’ এবং ‘কাল্পনিক’ প্রমাণ করে দিয়েছে।
বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে বুদ্ধের নাম থাকা, মহাভারতের শান্তিপর্বে শাক্যমুণির উল্লেখ থাকা এবং অষ্টাদশ পুরাণের বিষ্ণু পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণের মতো গ্রন্থ সমূহে বুদ্ধকে স্পষ্ট কীকটে (বিহার) জন্ম নেওয়া বিষ্ণুর অবতার ঘোষণা করা-এ সব কিসের সঙ্কেত?
যদি বুদ্ধ মাত্র একজন ‘বিদেশী কল্পনা’ বা আফ্রিকী মিথক হতেন (যেরকম কিছু দুষ্প্রচারকারীরা দাবী করে যাচ্ছে) তাহলে ভারতের ঋষি-মহর্ষীগণ একজন বিদেশী বা কাল্পনিক ব্যক্তিকে নিজেদের গ্রন্থ সমূহে স্থান দিয়ে তাঁকে ‘জগতের ত্রাতা’ বা ‘অবতার’ কেনো বানিয়েছেন?
সত্য ইহাই যে, বুদ্ধের ঐতিহাসিকতা এতই বিরাট ছিল যে, পরবর্তী পৌরাণিক লেখকদের জন্য তাঁকে এড়িয়ে চলা ছিল একেবারেই অসম্ভব। এজন্য তাঁকে কাল্পনিক বলতে থাকা লোকেরা সরাসরি রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণ গ্রন্থ রচয়িতাগণের প্রামাণিকতার উপরেই প্রশ্ন উঠিয়ে দিয়েছে এবং স্বয়ং সিদ্ধ করছে যে, এ সব গ্রন্থ হল কাল্পনিক, যা পরবর্তী সময়ে লিখিত হয়েছে।
৪) বাস্তুকলা এবং মূর্তিকলার ইতিহাস (Evolution of Art):
—————————————-
কিছু দুষ্প্রচারকারীগণ এরূপ যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে যে, বুদ্ধের প্রথম মূর্তি প্রথম শতাব্দীতে কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের রাজত্বকালেই নির্মিত হয়েছে। এজন্য বুদ্ধকে ৫০০ বছর পরে গড়া হয়েছে।
এ যুক্তি হল ঐতিহাসিক অজ্ঞানতার পরাকাষ্ঠা। বুদ্ধ স্বয়ংকে ‘অত্ত দীপো ভব’ অর্থাৎ নিজের দীপ নিজেকেই হতে বলেছেন এবং তিনি ব্যক্তি-পূজার বিরোধ করেছিলেন। ইহাই কারণ ছিল যে, প্রারম্ভিক সময়ে বৌদ্ধ কলায় সাঁচী এবং ভারহুতের স্তূপ সমূহে বুদ্ধকে মনুষ্য রূপে নয়, বরং তাঁর চরণচিহ্ন, বোধিবৃক্ষ, ধম্মচক্র এবং রিক্ত বজ্রাসনের মতো প্রতীক সমূহের মধ্যেই দেখানো হয়েছে।
কোনো মুর্খ কি কোনো কাল্পনিক চরিত্রের জন্য ‘রিক্ত বজ্রাসনের নক্সা পাথরের উপর বানাবেন? মূর্তি কলার প্রতীকাত্মকভাবে মানবরূপে পরিবর্তন হওয়া (Ani conic to Iconic) হল একটি স্থাপিত ঐতিহাসিক বিকাশক্রম। ইহা বুদ্ধের কাল্পনিক হওয়ার প্রমাণ নয়।
৫) প্রত্যখ্যানকারীদের প্রকৃত এজেণ্ডা কি?
———————————
বুদ্ধকে কাল্পনিক প্রমাণ করার পেছনে একটি গভীর মনোবৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে।
বৌদ্ধিক শ্রেষ্ঠত্বের ভয়: বুদ্ধের দর্শন হল যুক্তি, বিজ্ঞান, করুণা, মৈত্রী এবং সমতার উপর আধারিত। বুদ্ধ জন্ম দ্বারা জাতি ব্যবস্থা, অন্ধবিশ্বাস এবং ভণ্ড প্রতারকদের উপর কঠোর বিরোধ করেছেন। যে সকল প্রতারকেরা আজও সমাজকে যৌক্তিকতা এবং সমতা হতে দূরে রাখতে চায়, তারা বুদ্ধের এরূপ বৈজ্ঞানিক প্রভাবের দ্বারা সর্বদা ভয়ার্ত থাকে।
ইতিহাস চুরি: মৌর্য সম্রাজ্য, কুষাণ সম্রাজ্য এবং পাল বংশের স্বর্ণিম কালের সময়ে ভারত যে বিশ্বগুরু আখ্যা পেয়েছিল, বৌদ্ধ দর্শনই তা এনে দিয়েছিল। বুদ্ধকে কাল্পনিক বানিয়ে ভারতের গৌরবশালী, লিখিত এবং পুরাতাত্বিক রূপে প্রমাণিত ‘বৌদ্ধ কাল’কে ইতিহাসের পৃষ্টা হতে বুদ্ধকে কাল্পনিক বলে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র রচনা করা হচ্ছে।
জাতিগত অস্মিতার উপর আঘাত: ভারতের বহু সংখ্যক শ্রমণ জাতি যেমন-শাক্য, মৌর্য, সৈনী, কৌলী, বৌদ্ধ প্রভৃতির ইতিহাস এবং তাদের গৌরবকে হীন প্রমাণ করার জন্য মহেশ্বর তন্ত্রের মতো পরবর্তী গ্রন্থ সমূহে বুদ্ধকে ‘অসুর’ বলা হয়েছে এবং এখন ইন্টারনেটে তাঁকে ‘কাল্পনিক’ বানানোর প্রপঞ্চ রচনা করা হচ্ছে।
সারাংশ: সুর্যকে হাঁতুড়ি দ্বারা আড়াল করা যায়না। তথাগত বুদ্ধ হলেন ইতিহাসের আকাশে সে দেদীপ্যমান সূর্যের মতো প্রকাশমান, যাঁকে ছদ্ম ইতিহাস এবং ওয়াটসএপ য়ুনিভার্সিটির মিথ্যা পরিবর্তন দ্বারা আড়াল করা যাবেনা।
নালন্দা, তক্ষশীলা, বিক্রমশীলা, অজন্তা, ইলোরা, সাঁচী, সারনাথ, বুদ্ধগয়া এবং সমগ্র পৃথিবী যেমন-জাপান, চীন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, তিব্বত, ভূটান, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, কোরিয়া সহ আরও অনেক দেশে প্রসারিত সাক্ষ্য চক্ চক্ করে বুদ্ধের ঐতিহাসিকতাকে সাক্ষী দিয়ে যাচ্ছে। যারা বুদ্ধকে কাল্পনিক বলতে প্রয়াস রত আছে, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেরাই বৈচারিক এবং ঐতিহাসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement