এ আলেখ্য কিছুটা দীর্ঘ, কিন্তু যদি আজ আপনি নিজের ব্যস্ত জীবন হতে দশ মিনিট বের করে সম্পূর্ণ লেখা পড়ে থাকেন, তাহলে ইতিহাসকে দেখা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ের জন্য পরিবর্তন হয়ে যাবে। এরূপ ঐতিহাসিক সত্যকে খোঁজা এবং একেক অকাট্য লিখিত বিষয়ের (Reference) সাথে আপনার সামনে নিয়ে আসতে অনেক মাস ব্যাপী কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। যদি আপনার মনে হবে যে, এ অপ্রিয় সত্য এবং বৈজ্ঞানিক সত্য প্রত্যেক মূল নিবাসী ভাই-বোন পর্যন্ত পৌঁছা উচিত বলে মনে করেন, তাহলে ইহাকে অধিক হতে অধিকতর শেয়ার করার চেষ্টা করবেন।
আপনি কি জানেন যে, যাঁকে আজ ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম রাম’ দাবী করে ঐতিহাসিক প্রমাণ করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে, তা সত্যিকারভাবে কোনো স্বতন্ত্র বা ঐতিহাসিক চরিত্র নয়? বৌদ্ধ ধম্মের বিজ্ঞান এবং মৌর্য সম্রাজ্যের গৌরবকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করার জন্য ভগবান তথাগত বুদ্ধ এবং সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকের জীবনের বাস্তবিক ঘটনা সমূহকে মিশ্রিত করে ‘রাম’ এর এ কাল্পনিক পৌরাণিক পাত্র গড়া হয়েছে। আসুন, তাহলে জন্ম হতে নিয়ে সম্রাজ্যের অন্ত পর্যন্ত একেক ঐতিহাসিক দিক, সেগুলির অকাট্য প্রমাণ এবং যৌক্তিক সত্যকে মুখোমুখি রেখে বুঝার চেষ্টা করব।
১) দেরীতে জন্ম এবং অনেক বিবাহের ইতিহাস (The Late Birth and Marriage)
—————————————-
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ঐতিহাসিক রূপে রাজা শুদ্ধোদনের বহু আশা-প্রত্যাশা ও মানতের পরে অনেক বিলম্বে রাজকুমার সিদ্ধার্থকে পুত্র রত্ন রূপে লাভ করেছিলেন। রাজা শুদ্ধোদন স্বীয় জীবনে দু’টি বিবাহ (সহোদর বোনদ্বয়-মহামায়া এবং মহাপ্রজাপতি গৌতমী) করেছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ডগণ হুবহু সে ইতিহাসকে চুরি করেছেন এবং কাহিনী বানিয়েছেন যে, রাজা দশরথের বৃদ্ধাবস্থায় এবং বহু দেরীতে রামের জন্ম হয়েছিল। নিজের কাহিনীকে বৌদ্ধ ইতিহাস হতে বড় এবং চমৎকারী দেখানোর জন্য ভণ্ড প্রথারকগণ রাজা শুদ্ধোদনের দু’ রাণীর বিপরীতে রাজা দশরথের চার বিবাহ (চারজন রাণী) দেখিয়েছে, যাতে তাঁকে বৌদ্ধ রাজার চেয়ে শ্রেষ্ট দেখাতে পারে।
অকাট্য প্রমাণ (Reference) : বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাবস্তু’ (Mahavastu) এবং ‘ললিতবিস্তর’ এর বিপরীতে বাল্মীকি রামায়ণে (বাল কাণ্ড), যেখানে দশরথের রাণীগণের পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অতিশয়োক্তি কাহিনী যুক্ত করা হয়েছে।
২) বাল্যকালের পক্ষী প্রেম এবং জটায়ুর রূপক
———————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের বাল্যকালের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কাহিনী হংসের রক্ষা করার বিষয় রয়েছে। (সিদ্ধার্থ এবং দেবদত্তের হংস বিবাদ) এখানে রাজকুমার সিদ্ধার্থ তিরবিদ্ধ হংসকে জীবন দান দিয়েছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড প্রতারকগণ রাজকুমার সিদ্ধার্থের এ পক্ষী-প্রেমের (হংস) প্রতীককে রামায়ণে ‘জটায়ু’ (গিদ্ধ) রূপে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা রামের জন্য নিজের জীবন দিয়েছে দেখানো হয়েছে।
সন্দর্ভ প্রমাণ (Reference): বৌদ্ধ জাতক কাহিনীর বাল্যকালের সংস্করণ এবং অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ (Buddhacharita).
৩) স্বয়ম্বর এবং ভারী ধনুষ চালনার ইতিহাস (The Archery tournament)
——————————-
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থের বিবাহ কোনো সাধারণ বিবাহ ছিলনা। শাক্য পরাক্রমীদের পরম্পরানুসারে রাজকুমারী যশোধরার হাত পাওয়ার জন্য সিদ্ধার্থকে যুদ্ধকলার এক খোলা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে (শিল্প-প্রদর্শন স্বয়ম্বরা) যেতে হয়েছিল। এ প্রতিযোগিতায় সিদ্ধার্থ পরাক্রমীদের এক প্রাচীন এবং অনেক ভারী ধনুষকে উঠিয়ে নিশানা লাগাতে হয়েছিল। যা অন্য কোনো রাজকুমারেরা উঠাতে পারছিলেননা। এ বীরত্বকে দেখেই যশোধরা তাঁকে বরমাল্য পরিয়ে দিয়েছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড -প্রতারকেরা বুদ্ধের জীবনের এরূপ ঐতিহাসিক স্বয়ম্বর এবং ভারী ধনুষ চালানোর কৌশলকে চুরি করেছে। তারা ইহাকে ভগবান শিবের পিনাক ধনুষ নাম দিয়ে অমানবীয় এবং জাদুকরী চমৎকারে পরিবর্তন করে দিয়েছিল যে, রাম ধনুষ উঠিয়েছিলেন এবং তা মাঝখানে ভেঙ্গে গিয়েছিল। যাতে মূল মানবীয় বীরত্বকে লুকানো যেতে পারে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘ললিত বিস্তর’ (Lalitavistara) অধ্যায়-১২) এবং মহাকবি অশ্বঘোষ বিরচিত ‘বুদ্ধচরিত’ (Buddhacharita) সর্গ-২) যেখানে সিদ্ধার্থ দ্বারা ভারী ধনুষ চালিয়ে দেবদত্ত এবং অন্য রাজকুমারদেরকে হারিয়ে যশোধরার সাথে বিবাহ করার সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে।
৪) সর্বদা সাথে থাকা বিশ্বাসী ভাই (The Companion)
———————————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের সাথে সর্বদা ছায়ার মতো তাঁর চাচাতো ভাই এবং সবচেয়ে বিশ্বাসী শিষ্য ‘আনন্দ’ স্থবির থাকতেন। তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে বুদ্ধের সাথে ছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড প্রতারকগণ আনন্দ স্থবিরের এরকম ঐতিহাসিক এবং বিশ্বাসী চরিত্রকে রামের সাথে ‘লক্ষ্মণ’ রূপে যুক্ত করে দিয়েছে, যিনি ছায়ার মতো রামে সাথে থাকতেন।
প্রামান্য সন্দর্ভ (Reference): পালি গ্রন্থ দীর্ঘ নিকায়ের (Digha Nikaya) ‘মহাপরিনির্বাণ সূত্র’, যেখানে বুদ্ধ এবং আনন্দ স্থবিরের অটুট সম্বন্ধের বিবরণ রয়েছে।
৫) সম্মতির সাথে গৃহত্যাগ বনাম গর্ভবতীর ক্রুরতা সহকারে ত্যাগ
——————————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ভণ্ড-প্রতারকগণ এরূপ দেখিয়ে থাকে যে, রাজকুমার সিদ্ধার্থ স্বীয় পত্নীকে রাতের গভীরে ঘুমন্ত অবস্থায় ত্যাগ করে পলায়ন করেছিলেন, যা হল সরাসরি মিথ্যা। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যশোধরার সম্পূর্ণ সম্মতি এবং মানসিক প্রস্তুতির পরেই নতুন অনুসন্ধান এবং ধম্মের মার্গের খোঁজে বের হয়েছিলেন। সিদ্ধার্থের শ্বশুড় সুপ্রবুদ্ধ স্বয়ং ছিলেন বৌদ্ধ পরম্পরার জ্ঞাতা। বুদ্ধত্ব বা বুদ্ধ হওয়া প্রাচীন ভারতে এক সর্বোচ্চ মানসিক পদ (Title), যা তিনি কঠোর সাধনায় অর্জন করেছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ এরূপ বৈজ্ঞানিক গৃহত্যাগকে বিকৃত করেছে এবং রাম দ্বারা গর্ভবতী সীতাকে ধোবীর অভিযোগের ভিত্তিতে অমানবীয় পদ্ধতিতে জঙ্গলে ত্যাগের ক্রুরতাপূর্ণ কাহিনী গড়ে দিয়েছে, যাতে সমাজে পিতৃ তান্ত্রিকতাকে স্থাপন করা যায়।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): থেরীগাথা (Therigatha) এবং বৌদ্ধ ইতিহাসের ব্যখ্যা সমূহ, যা যশোধরা এবং সিদ্ধার্থের বৈচারিক ভাবনার প্রগাঢ় সম্বন্ধের প্রমাণ করে থাকে।
৬) ঘরের বাহিরে বার বছর থাকার সময় চক্র
——————————-
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থ যখন স্বীয় জ্ঞান মার্গের অনুসন্ধানের জন্য বের হয়েছিলেন, তখন তিনি ছয় বছর পর্যন্ত জঙ্গলে কঠিন তপস্যা এবং ভ্রান্ত পথে ঘুরাফিরার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এর পর তিনি ধম্মের প্রচার করতে এবং নিজের ভিত শক্ত করতে নিয়োজিত ছিলেন। অর্থাৎ জ্ঞান প্রাপ্ত করার পর প্রায় ১১ বছর পর্যন্ত কপিলবাল্তুর বাহিরে থেকেছিলেন। এরপর তাঁর স্বীয় পিতৃরাজ্যে প্রত্যাবর্তন হয়েছিল।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড- প্রতারকেরা প্রাসাদ হতে বুদ্ধের ১১ বছর বাহিরের থাকার এরূপ ১১ বছরের ঐতিহাসিক সময় চক্রকে চুরি করেছে। বাল্মীকি রামায়ণে ইহাকে ১৪ বছরের বনবাস বানিয়ে দিয়েছে। যাতে, ইহার মূল বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘দশরথ জাতক’ হতে কিছুটা আলাদা হয়ে দেখা যায়। কিন্তু ইহার মূল শিকড় বুদ্ধের ১১ বছর হতেই চুরি করা হয়েছে।
প্রামাণিক সন্দর্ভ (Reference) বৌদ্ধ গ্রন্থ খুদ্দক নিকায়ের ‘দশরথ জাতক’ (Dasaratha Jataka- Jataka No. ৪৬১) যেখানে রামকথার সবচেয়ে প্রাচীন রূপ পাওয়া যায় এবং সেখানে পরিস্কার লিখা রয়েছে যে, রাজা দশরথ কর্তৃক পুত্র রামকে কেবল ১২ বছরের জন্যই বনবাসের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
৭) দীপাবলীতে দীপ সমূহের প্রকৃত রহস্য (দীপদানোৎসব)
——————————
প্রকৃত কথা বৌদ্ধ ইতিহাস: যখন বুদ্ধ সম্বোধি জ্ঞান (Enlightenment) লাভ করে ১২ বছর পরে প্রথমবার কপিলবাস্তু প্রত্যাগমণ করেছিলেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে লোকেরা হাজার হাজার দীপক জ্বালিয়েছিলেন। বৌদ্ধ পরম্পরায় দীপের অর্থ ‘আন্তরিক জ্ঞানের আলো’ (Enlightenment) হয়ে থাকে। এজন্য আজও সমগ্র পৃথিবীতে বুদ্ধের মূর্তির সামনে দীপক জ্বালানো হয়।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: রামের দীপক বা আন্তরিক প্রকাশের (Enlightenment) বিজ্ঞানের কোনো লেনাদেনা নাই।
ভণ্ড-প্রতারকেরা বুদ্ধের পিতৃরাজ্যে প্রত্যাগমণের উপর পালনকারী এরূপ ঐতিহাসিক ‘দীপদানোৎসব’কে (কয়েক দশক হতে কার্তিক অমাবশ্যাতে পালনকারী উৎসব) চুরি করেছে এবং ইহাকে রামের অযোধ্যা প্রত্যাগমণের কাহিনীর সাথে জুড়ে দিয়েছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ ( Reference): বৌদ্ধ কালক্রমের ঐতিহাসিক নথি এবং সম্রাট অসোকের শিলালেখ যা কার্তিক অমাবশ্যাকে ‘দীপদানোৎসব’ রূপে প্রমাণিত করে থাকে।
৮) সর্বজীবে সদ্ভাব এবং আদিম হিংসা রোধ বনাম জাতিবাদ
——————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের ভাবনায়, উপদেশে এবং আদর্শে জন্মের ভিত্তিতে উঁচু-নীচু বন্টনের জাতি বিদ্বেষ ব্যবস্থা ছিলনা। মানব সভ্যতার প্রারম্ভে যখন কৃষির দ্বারা চাষাবাদের অনুসন্ধান করা হয়নি, তখন লোকেরা জীবন-যাপনের জন্য নানা রকমের পশুদের হত্যা করে ভক্ষণ করতো। এরূপ পরম্পরা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছিল। সিন্ধু সভ্যতা হতে বৌদ্ধ পরম্পরা সমাজকে কৃষি এবং করুণার বৈজ্ঞানিক মার্গ দেখিয়ে এরূপ পশু হত্যা বন্ধ করেছিল এবং মনুষ্য হোক বা পশু, প্রত্যেক জীবের বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করা হয়েছিল।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ইহার বিপরীতে রামের চরিত্র সমাজকে জন্মের ভিত্তিতে বন্টন এবং বর্ণ ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে লাগু করা হয়েছে। এরূপ ব্যবস্থা অনুসারে রামের দ্বারা শুদ্র তপস্বী ‘শম্ভূককে বধ’ করা হয়েছে। কেননা তিনি জ্ঞান আহরণ করছিলেন এবং শষ্যাদির ক্ষেত হওয়ার কারণে রামকে ক্রুরতা সহকারে হত্যা ( হরিণ শিকার) করতে দেখা গিয়েছে। যা বুদ্ধের সর্বজীবে সমভাবের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ ছিল।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): বাল্মীকি রামায়ণ (উত্তর কাণ্ড), যেখানে রাম দ্বারা শুদ্র তপস্বী শম্বুককে হত্যার সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে।
৯) হৃদয়ে বুদ্ধ বনাম হনুমান (The Title Rahul):
——————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্তানের নাম রাহুল ছিল, যিনি বুদ্ধের ধম্মকে স্বীয় হৃদয়ে স্থান দিয়ে ভিক্ষু হয়েছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ এ রাহুল শব্দের ভাবকে পরিবর্তন করে হনুমান নামে পাত্র বানিয়েছে, যে স্বীয় বুকে ছিড়ে হৃদয়ের ভিতরে রামের স্তুতি করার মতো দেখিয়েছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): পালি গ্রন্থ ‘মজ্ঝিম নিকায়’ এর রাহুলোবাদ সূত্র, যেখানে বুদ্ধ তৎপুত্র রাহুলকে জ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছেন।
১০) সম্রাট অসোকের সম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বনাম রাম-সীতার যুদ্ধ
———————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস : সম্রাট অসোক কলিঙ্গের উপর আক্রমণ কোনো রাজকুমারী কারুবাকীর সাথে প্রেম বা তার উপর স্বীয় অধিকারের জন্য করেন নাই, কলিঙ্গ মৌর্য সম্রাজ্যের বাণিজ্যিক সমুদ্র মার্গের মধ্যে (Sea Routes) আসা শক্তিশালী স্বতন্ত্র গণরাজ্য ছিল। অসোক মৌর্য সম্রাজ্যের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং এবং আর্থিক বিস্তারের জন্য এরূপ ভীষণ যুদ্ধ লড়েছিলেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা : যখন ভণ্ড-প্রতারকেরা এ মহান সম্রাজ্যবাদী ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তখন তিনি অসোকের এরূপ বিশাল রাজনৈতিক এবং পরাক্রমী যুদ্ধকে ‘রাম এবং রাবণ’ এর নিজস্ব যুদ্ধে পরিবর্তিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, কোনো নীতির জন্য নয়, বরং স্বীয় পত্নী সীতাকে আবার ফিরে পাওয়ার জন্য লড়েছিলেন। যাতে সম্রাট অসোকের চক্রবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস সবসময়ের জন্য মুছে যায়।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference) : সম্রাট অসোকের ত্রয়োদশ শিলালেখনী (Major Rock Edict XIII) যা স্পষ্ট রূপে কলিঙ্গ যুদ্ধের শুদ্ধ রাজনৈতিক এবং রণনীতির কারণকে দর্শিয়ে থাকে। সেখানে কোনো রাজকুমারীর কোনো বর্ণনা নাই।
১১) কলিঙ্গ যুদ্ধের অন্ত এবং ‘অসোক বিজয়াদশমী’র অপহরণ
———————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: কলিঙ্গ যুদ্ধের ভীষণ রক্তপাতের ঠিক পরে প্রায় ৮ হতে ১০ দিনের মধ্যে সম্রাট অসোক সম্পূর্ণরূপে শস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন এবং বৌদ্ধ ধম্মের দীক্ষা নিয়েছিলেন। যুদ্ধ বিজয়ের পরে ঠিক আশ্বিন শুক্লা দশমী দিনে সম্রাট অসোক দ্বারা বৌদ্ধ ধম্ম গ্রহণের এ ঐতিহাসিক ঘটনাকে ‘অসোক বিজয়াদশমী’ (Asoka Vijaya Dashami) বলা হয়।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ সম্রাট অসোকের ধম্ম বিজয়ের (অহিংসার প্রারম্ভ) এরূপ বাস্তবিক দিনকে সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা অসোক বিজদয়াদশমীকে ‘দশাহরা’ নাম দিয়েছে এবং কাহিনী বানিয়ে দিয়েছে যে, এ দিন রাম কর্তৃক রাবণকে বধ করা হয়েছে, যাতে লোকেরা ধম্ম বিজয়কে ভুলে হাতিয়ার এবং হিংসার ভণ্ডদেরকে পূজা করতে থাকে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): ঐতিহাসিক বৌদ্ধ পরম্পরা সমূহ এবং মৌর্য কালক্রমের নথিপত্র, যেগুলির ভিত্তিতে আজও ভারতের বহুজন সমাজ অসোক বিজয় দশমী পালন করে থাকে।
১২) রামসেতুর যৌক্তিক এবং গণিতীয় সত্য বনাম মৌর্য ইঞ্জিনিয়ারিং (The Floating Bridge Evidence)
————————————
লিখিত রামায়ণের ভুল গণিত: যেহেতু বাল্মীকি রামায়ণের চেয়ে পুরাতন রাম কথার আর কোনো লিখিত প্রমাণ উপলব্দ হয়না, সেহেতু আমরা ইহার লিখিত অক্ষরকেই অন্তিম সত্য বলে মান্য করব। বাল্মীকি রামায়ণ (যুদ্ধ কাণ্ড, সর্গ ২২, শ্লোক ৭৬) অনুসারে নল-নীল দ্বারা বানানো সেতুর দৈর্ঘ ১০০ যোজন এবং প্রস্ত বা চওড়া ১০ যোজন ছিল। প্রাচীন ভারতীয় পরিমাপ বিজ্ঞান অনুসারে ১ যোজন = ১২.৫ কিলোমিটার হয়ে থাকে।
এরূপ হিসাবে বাল্মীকি রামায়ণের সেতু ১২৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২৫ কিলোমিটার চওড়া বানিয়েছে। এদিকে ভারত হতে শ্রীলঙ্কার বাস্তবিক ভৌগোলিক দূরত্ব হল মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। বাস্তবিক দূর হতে অনেক গুণ বেশী বড় এ সেতু এবং ভুল গণিত স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এখানে সকল পাত্র এবং সম্পূর্ণ কাহিনী হল কাল্পনিক।
প্রকৃত ইতিহাসের চুরি পাটনার পীপা সেতুর প্রমাণ: মৌর্য কালে মগধ (বিহার) হতে কলিঙ্গ বা দক্ষিণ ভারত যাওয়ার জন্য সেনাকে গঙ্গা, পুনপুন বা মহানদীর মতো বিশাল এবং চওড়া নদী সমূহ পার করতে হতো। মৌর্য প্রকৌশলী নৌকা এবং ড্রামের মতো বিশাল বস্তু সমূহ যুক্ত করে নদী সমূহে বিশাল অস্থায়ী ভাসা সেতু (Floating Pontoon Bridges) বানাতো। যাতে হাজার হাজার সেনা এবং হাতী নদী পার করে যেতে পারে। এরকম পদ্ধতি এখনও পাটনায় গঙ্গা এবং পুনপুন নদীতে ‘পীপা সেতু’ রূপে জীবিত দেখা যায়। ভণ্ড-প্রতারকগণ মৌর্য কালের এরকম বাস্তবিক নদী প্রকৌশল বিদ্যাকে চুরি করেছে এবং ইহাকে বানরের দ্বারা সমুদ্রের উপর ভাসমান পাথরের যাদুকরী রামসেতু’র কাল্পনিক ভণ্ডামিতে পরিবর্তন করেছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): বাল্মীকি রামায়ণ (যুদ্ধ কাণ্ড-সর্গ-২২, শ্লোক-৭৬) এবং ইহার প্রতিপক্ষে মৌর্য কালীন প্রশাসনিক নথিপত্র (মেহাস্থিনীজের ‘ইণ্ডিকা’ নাবি অধ্যক্ষ পদ) যা মৌর্যদের নদী-সেতু ইঞ্জিনীয়ারিংকে প্রমাণিত করে থাকে।
১৩) সোনার লঙ্কা এবং অশোক বাটিকার সত্যতা (The Golden Splendour)
————————————-
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: মৌর্য সম্রাজ্য এবং মৌর্য সম্রাট অসোকের নিজের আলীশান, সবুজে ভরা এবং সমৃদ্ধ মহল ও উদ্যান ছিল। যার নামই ছিল অসোক বাটিকা। মৌর্য সম্রাজ্যের রাজধানী পাটলীপুত্রের মহল সোনা এবং রূপার কারুকার্য এবং বৈভব দ্বারা এতই পূর্ণ ও সমৃদ্ধ ছিল যে, বিদেশী যাত্রীগণও আশ্চর্যান্বিত হতেন।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: পৌরাণিক কাহিনীতে এরকম ঐতিহাসিক নাম এবং মৌর্যদের ‘সোনা-রূপার প্রাসাদ সমূহের বৈভব’কে চুরি করা হয়েছে এবং তাকে রাবণের ‘সোনার লঙ্কা’র ভিতরে স্থিত ‘অশোক বাটিকা’ রূপে পেশ করে দিয়েছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): মৌর্য কালীন পুরাতাত্বিক অবশেষ এবং পাটলিপুত্রের প্রাসাদের ইতিহাস (মেগাস্থিনীজের প্রসিদ্ধ পুস্তক ইণ্ডিকা)।
১৪) সীতার জন্ম (ক্ষেত হতে বের হওয়া) যৌক্তিক এবং সামাজিক সত্যতা (The Fiction Proof)
——————————-
কাল্পনিক চমৎকার: বিজ্ঞান এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে যেকোনো জীবিত বাচ্চা জমিনের নীচে কলসীতে বন্ধ হয়ে জীবিত থাকতে পারেনা। ইহা হল সম্পূর্ণরূপে অমানবীয়, অসম্ভব এবং কাল্পনিক বিষয়। এ ঘটনা নিজেই প্রমাণ করে থাকে যে, ইহা হল একটি কাল্পনিক পাত্র (Fictional Character).
সামাজিক অপ্রিয় সত্য: প্রাচীন কাল হতে আজ পর্যন্ত সমাজে এরূপ দেখা যায় যে, যখন যেকোনো বাচ্চা লোক-লজ্জা, অবৈধ সম্বন্ধ বা সামাজিক ভয়ের কারণে জন্ম হয়, তখন লোকেরা ইহাকে নীরবে ক্ষেত, ঝোপঝাড় অথবা জঙ্গলে ফেলে দিয়ে থাকে।
কাহিনীর রূপক: বিচারকদের মান্যতা ইহাই যে, রাজা জনকও কোন এরকমই অবৈধ বাচ্চা ক্ষেতে পেয়েছিলেন, যাকে তিনি পালন-পোষণ করেছেন। পরে সে অপ্রিয় সামাজিক সত্যকে লুকানোর জন্য এবং রাজার পোষণ করা কন্যাকে ‘চমৎকারী’ প্রমাণ করার জন্য ভণ্ড-প্রতারকগণ কাহিনী বানিয়েছে যে, তিনি হলেন ধরিত্রীর কন্যা এবং সরাসরি মাটির কলসী হতে প্রকট হয়েছে।
১৫) রাবণ কে ছিলেন? মৌর্য বংশের অন্ত
—————————
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ভণ্ড-প্রতারকগণ রাবণকে মহাপণ্ডিত এবং জ্ঞানী বলেছেন, কিন্তু তাঁকে খলনায়ক (Villain) বানিয়ে দিয়েছে। বাস্তবে রাবণের চরিত্র হল মৌর্য সম্রাজ্যের অন্তিম রাজাগণ (বৃহদ্রথ মৌর্যের মতো) এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দ্বারা স্থাপিত বৌদ্ধ শাসন ব্যবস্থার প্রতীক।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: পুষ্যমিত্র শুঙ্গ যখন অন্তিম মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথ মৌর্যকে হত্যা করে বৌদ্ধ সম্রাজ্যকে নষ্ট করে দিয়েছেন, ইতিহাসের এ ঘটনাকে ভণ্ড-প্রতারকগণ ‘রাম দ্বারা রাবণ বধ’ এবং বৌদ্ধ মৌর্য শাসনের উপর প্রতারকদের জয় রূপে পৌরাণিক কাহিনীতে পরিবর্তন করে দিয়েছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): ইতিহাসবিদ ড. রোমিলা থাপারের পুস্তক এবং বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’, যা পুষ্যমিত্র শুঙ্গ দ্বারা অন্তিম মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের হত্যার ইতিহাসকে প্রমাণ করে থাকে। ইহার পরেই রামায়ণের বর্তমান স্বরূপ লিখা হয়েছে।
১৬) মহাপুরুষ বনাম মর্যাদা পুরুষোত্তম
————————-
প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধকে ইতিহাসে ‘মহাপুরুষ’ (মহান বৈজ্ঞানিক এবং যৌক্তিক মানব) বলা হয়।
কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ তাঁর বিপরীতে রামকে ‘মর্যাদা ‘পুরুষোত্তম’ এর খেতাব প্রদান করেছে।
প্রামাণ্য সন্দর্ভ (Reference): পালি সূত্ত সমূহে বুদ্ধের জন্য ‘মহাপুরিস লক্খণ’ (Great Characteristics of a Great Man) এর বিবরণ রয়েছে।



0 Comments