দক্ষিণা বিভঙ্গ সূত্রের দেশনায় তথাগত বুদ্ধ ভগবান দান করার পদ্ধতি, দান গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ, এবং দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে থাকা উচিত এমন শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার গুণসম্পর্ক বিষয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এছাড়াও, বিভিন্ন ব্যক্তিকে দান করার মাধ্যমে যে ভিন্ন ভিন্ন ফল বা আনিসংস লাভ হয়, তাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, কোনো তির্যক প্রাণীকে কিছু দান করলেও শতগুণ পুণ্যফল লাভ হয় এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবার যখন দাতার শীল ও গুণ উচ্চতর হয়, তখন ব্যক্তিগত দান আরও শক্তিশালী কুশলকর্মে পরিণত হয় এ কথাও দেশনায় বলা হয়েছে। একইসঙ্গে, চার প্রকারে সংঘিক দান কীভাবে প্রদান করতে হয়, তাও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তথাগত বুদ্ধ ভগবান যখন জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন, তখন একদিন এক দেবতা তাঁর কাছে এসে দানের ফল সম্পর্কে জানতে চান। তখন ভগবান গাথার মাধ্যমে উত্তরে দানের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করেন।
সেই গাথার সারকথা হলো—কে শক্তি দান করে? কে সৌন্দর্য দান করে? কে সুখ দান করে? কে জ্ঞানচক্ষু দান করে? আর কে সর্বস্ব দান করে?
এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান বলেন—
"অন্নদো বলদো হোতি, বত্তদো হোতি বর্ণদো
যানদো সুখদো হোতি, দীপদো হোতি চক্ষুদো
সো চ সব্বদদো হোতি, যো দদাতি উপস্সয়ং
অমতং দদো চ সো হোতি, যো ধম্মানুসাসতি"
অর্থাৎ—যে খাদ্য দান করে, সে শক্তি দান করে। যে বস্ত্র দান করে, সে সৌন্দর্য দান করে। যে যানবাহন বা প্রয়োজনীয় উপকরণ দান করে, সে সুখ দান করে। যে প্রদীপ দান করে, সে জ্ঞানচক্ষু দান করে। যে বাসস্থান দান করে, সে সবকিছু দান করে। আর যে ধর্ম উপদেশ দেয়, সে অমৃত তথা নির্বাণ দান করে।
এই উপদেশের মাধ্যমে বোঝা যায় গৃহী হোক বা সন্ন্যাসী, সকল বৌদ্ধ অনুসারীর পথ কী হওয়া উচিত।
প্রথমত, একজন ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী সংসারের বন্ধন উপলব্ধি করে গৃহত্যাগ করেন। তাঁদের উচিত শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার গুণ উন্নত করা। তারা নিজে উপার্জন না করায় আমিষ দান (খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি) নিজেরা দিতে পারেন না। তবে তারা ধর্মানুগভাবে দাতাদের পরিচালনা করতে পারেন এবং সর্বোচ্চ দান ধর্মদান প্রদান করতে পারেন।
বুদ্ধ ভগবান ছয় প্রকার দানের কথা বলেছেন—রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ও ধর্মদান।
এছাড়াও, ভিক্ষুরা নিজেদের অর্জিত ধর্ম অন্যদের প্রতি মৈত্রী ও করুণার সঙ্গে প্রচার করতে পারেন। এজন্যই বুদ্ধ প্রথম ষাট আরহৎ ভিক্ষুকে বলেছিলেন—
“চরথ ভিক্ষবে চারিকং বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়…”
অর্থাৎ—অনেকের কল্যাণ ও সুখের জন্য ধর্ম প্রচার করো।
ধর্মদানই সর্বোচ্চ দান। এটি লৌকিক ও লোকোত্তর উভয় কল্যাণ সাধন করে। লৌকিকভাবে এটি সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ লাভে সহায়তা করে। আর লোকোত্তরভাবে এটি ক্লেশ দূর করে আর্যপথে উন্নীত করে।
বুদ্ধ ভগবান ভিক্ষুদের নির্দেশ দিয়েছেন—
“করোথ ধম্মদানেন তেসং পচ্চূপকারকং”
অর্থাৎ—যারা তোমাদের সেবা করে, তাদের ধর্মদান দ্বারা প্রতিদান দাও।
দান করার সময় তিন অবস্থায় চিত্ত পবিত্র রাখতে হয়—দান করার আগে, দানের সময় এবং দানের পরে। এই তিন অবস্থায় লোভ, দ্বেষ ও মোহমুক্ত মন নিয়ে দান করলে তা মহৎ ফল দেয়।
যদি দান কামনা বা প্রতিদানের আশা নিয়ে করা হয়, তবে তার ফল কমে যায়।
দান পারমী বোধিসত্ত্বদের প্রথম গুণ। তৃষ্ণা কাটানোর জন্য দান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দান তিন প্রকারে পরিপূর্ণ করা যায়—
১. পারমী – বস্তু দান
২. উপপারমী – শরীরের অংশ দান
৩. পরমার্থ পারমী – জীবন দান
১. দানদাস – নিজের থেকে নিম্নমানের বস্তু দান করে
২. দানসহায় – সমমানের বস্তু দান করে
৩. দানপতি – নিজের থেকে উত্তম বস্তু দান করে
দানকারী ব্যক্তি মেঘের মতো—যেমন মেঘ বৃষ্টি দিয়ে পৃথিবী শীতল করে, তেমনি দানকারী মানুষের জীবন সহজ করে।
দান করলে মানুষ প্রশংসিত হয়, সম্মান পায়, এবং বারবার সম্পদ লাভ করে।
বুদ্ধ বলেছেন—
“দানং খলু সভাবেন, সগ্গমানুসভোগদং…”
অর্থাৎ—দান স্বভাবতই স্বর্গীয় ও মানবীয় সুখ দেয়, এবং সঠিকভাবে করলে নির্বাণের কারণ হয়।
“পীতি মুদারং বিন্দতি দাতা, গারবমস্মিং গচ্ছতি লোকে”
অর্থাৎ—দানকারী এই জীবনেই আনন্দ ও সম্মান লাভ করে।
দান হলো মানুষের রক্ষাকবচ, আত্মীয়, দুর্গ ও আশ্রয়। এটি জীবকে দুঃখ থেকে মুক্ত করে সুগতি ও নির্বাণে পৌঁছে দেয়।
এই জগত জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ইত্যাদি দুঃখে জ্বলছে। এর মধ্যে দান হলো এমন কিছু, যা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত হয়।
অতএব, ন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ নিজে ভোগ করে এবং অন্যদের মধ্যে সঠিকভাবে দান করলে উভয় লোকেই কল্যাণ হয়।
দান করার সময় মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্বাণ। লৌকিক সুখ চাইলেও তা পাওয়া যায়, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত দুঃখমুক্তি।
দান মানুষকে আনন্দ দেয়, সম্মান দেয়, এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ খুলে দেয়।
এইভাবে জ্ঞানসহ দান করলে তা মহৎ পুণ্যে পরিণত হয়।
0 Comments