Hot Posts

6/recent/ticker-posts

উৎপলবর্ণা ও বৌদ্ধসংঘ

বুদ্ধদেবের জীবতকালেই গৌতমীর অনুরোধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভিক্ষুণীসংঘ। প্রথমে বুদ্ধদেব এই বিষয়ে খুব একটা ইচ্ছুক ছিলেন না। এমনকি আনন্দের যুক্তিজাল ভেদ করতে না পেরে যখন তিনি এতে মত দিতে বাধ্য হন তখনও তিনি এ কথা বলেন যে ভিক্ষুণীসংঘ প্রতিষ্ঠার কারণে ধম্মে র আয়ু পাঁচশত বৎসর কমে গেল। তার এই উক্তির/মনোভাবের বিরূপ সমালোচনা আমরা অনেক সময়েই করে থাকি। কিন্তু ভিক্ষুণী সংঘের সদস্যাদের সুরক্ষা, ভিক্ষু ভিক্ষুণীদের সংঘকে একসাথে, ত্রুটিমুক্ত ও যথাযথভাবে পরিচালনা করা,যার সঙ্গে সামগ্ৰিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মের সুনাম জড়িত..এই সমস্ত দিক রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যাঁর একলার উপর ন্যস্ত, তাঁর মানসিক দিকটিও এ প্রসঙ্গে অনুধাবন করার দায় থাকে। বিশেষ করে সেই আড়াই হাজার বছর আগের প্রেক্ষাপটে।

বুদ্ধের সময়ে বহু নারী ভিক্ষুনি সঙ্গে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে অনেকে সাধন মার্গে উচ্চ স্থান লাভ করেন। সাধনমার্গে উত্তরোত্তর উন্নতি লাভের সময় তাঁদের হৃদয়ের সেই উচ্ছ্বাসমূলক উচ্চারণ যেন এক প্রকার মঙ্গলগীতি। কালক্রমে সেইগুলি সংগৃহীত হয়ে রূপ পায় থেরীগাথায় এবং হয়ে ওঠে বৌদ্ধধর্মের সম্পদবিশেষ।
থেরীগাথা সংকলনে সব নারীর তাৎক্ষণিক অনুভূতিমাত্রই কেবল ধরা নেই। রয়েছে তাদের গভীর উপলব্ধি। বহু ক্ষেত্রেই তাদের অতীত জীবন, সেই জীবনের নানা অপ্রাপ্তি বা অনিবার্যতা যা ভিক্ষুণী জীবনের প্রেক্ষাপট হিসাবে তাঁরা নিজেরাই বিবৃত করেছেন। সব মিলিয়ে থেরীগাথা এক উজ্জ্বল উত্তরণের সার্থক সাক্ষ্য।
থেরীগাথায় উল্লেখিত এবং গাথা রচনাকারী এমনই এক নারী উৎপলবর্ণা। উৎপলবর্ণার প্রথম জীবন সম্পর্কে যা জানা যায় তা হল তিনি শ্রাবস্তীর তত্রত্য শ্রেষ্ঠীর কন্যা ছিলেন। এই কন্যার গাত্রবর্ণ ও রূপ ছিল নীল পদ্মের মতো।তাই তার ঐ নাম হয়। বিবাহের উপযুক্ত বয়স হলে এত সংখ্যক পাণিপ্রার্থীর সমাগম হতে থাকে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ এদের মধ্যে ধনবান শ্রেষ্ঠী থেকে রাজা বা রাজ পরিবারের পুত্ররাও ছিলেন। এই অবস্থায় পিতার পরামর্শক্রমে, স্বইচ্ছাতেই যদিও, উৎপলবর্ণা বৌদ্ধ সঙ্ঘে যোগ দেন। খুব দ্রুত তিনি পরমজ্ঞান লাভ করেন। ঘটনাটি এই প্রকার। কোন এক উপসোথ দিবসে যে কক্ষটিতে ভিক্ষুণীরা সমবেত হবেন সেটি পরিচ্ছন্ন করার দায়িত্ব ছিল তাঁর।তিনি একটি দীপ জ্বালিয়ে ঘরটি আলোকিত করে সেটি পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। ওই কক্ষে একাকী সেই নারীর মন নিবদ্ধ হয় প্রজ্জ্বলিত আলোকশিখাটিতে। তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন হন ও সেই ধ্যানই তাকে পৌঁছে দেয় সকল মানবের ইপ্সিত দিব্যজ্ঞানে। সেই সঙ্গে নানা অলৌকিক ক্ষমতা বা ঋদ্ধিও লাভ করেন তিনি।
এই ঋদ্ধিলাভ বিষয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ করা নানা কারণে প্রয়োজন। এই সময়ে পিন্ডোল ভরদ্বাজ নামে বুদ্ধদেবের এক শিষ্য এমন একটি সমাগমের আয়োজন করেন, যেখানে ঋদ্ধিপ্রাপ্ত সাধকগন তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন। কিন্তু বুদ্ধদেব এই ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শনের বিরোধী ছিলেন। এবং তার শিষ্যদের তিনি সেই মর্মে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। বুদ্ধদেবের এই মনোভাবের সুযোগ নিয়ে ছয় জন ধর্মীয় নেতা প্রচার করেন যে বুদ্ধদেব এই ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শনে সক্ষম নন। তখন বুদ্ধদেব সেই স্পর্ধিত দাবীর প্রত্যুত্তর দেবার জন্যই প্রদর্শন করেন এমন এক ঋদ্ধিক্ষমতা যা ‘জমক পতিহারিয়’ নামে পরিচিত। তাঁর দেহের উর্ধাংশ থেকে অগ্নি উৎপাদিত হতে থাকে এবং নিম্নাংশ থেকে প্রবাহিত হতে থাকে জলের ধারা। আবার এই ঘটনা ক্ষণে ক্ষণে ঘটতে থাকে বিপরীত ক্রমে। এটি জমক ঋদ্ধি। এই ঘটনার সময়ে বুদ্ধদেবের অনেক শিষ্য তাদের ঋদ্ধি শক্তি দেখাতে আগ্রহী হন। যাদের মধ্যে উৎপলবর্ণাও ছিলেন। বুদ্ধদেব উৎপলবর্ণার ঋদ্ধিশক্তির পরিচয় নেন। (অবশ্যই ঐ প্রদর্শনীতে নয়)।তারপর তাঁকে নিজের প্রধানা সাহায্যকারীর ভূমিকাটি দেন। নারীদের মধ্যে ক্ষেমা ও উৎপলবর্ণা এবং পুরুষের মধ্যে সারিপুত্ত ও মোগ্গল্লায়ন এই বিরল সম্মানের অধিকারী ছিলেন।
“” আমি ঋদ্ধিপ্রাপ্ত,আসব মুক্ত।আমি ষড় অভিজ্ঞায় পারদর্শিনী।বুদ্ধের ইচ্ছা পূর্ণ হইয়াছে।””..থেরীগাথা।।
থেরীগাথায় ‘মার’ এর সঙ্গে উৎপলবর্ণার কথোপকথনের কিছু গাথা সংকলিত আছে। একদিন শালকুঞ্জে ধ্যানরতা উৎপলবর্ণাকে বিক্ষিপ্তমনা করতে সচেষ্ট হয় মার। যথারীতি বিফলমনোরথও হয়। এটি সংযুক্তনিকায় তেও রয়েছে। গাথাগুলি নিম্নরূপ–
মার– “পুষ্পিত তরুকুঞ্জে আগমনপূর্বক তুমি একাকিনী বৃক্ষমূলে দন্ডায়মান; তুমি অরক্ষিতা; মূঢ়ে, তুমি ধূর্ত্তভয়ে ভীত নও?”
উৎপলবর্ণা–” তোমার ন্যায় সহস্র ধুর্ত্ত আসিলেও আমার কেশাগ্র কম্পিত হইবে না।একাকী তুমি কি করিবে?
আমি এই ক্ষণেই অদৃশ্য হইয়া তোমার দেহে প্রবেশ করিতে পারি।দেখ ,আমি তোমার ভ্রু যুগের অভ্যন্তরে দণ্ডায়মান। কিন্তু তুমি আমায় দেখিতেছো না!
চিত্ত আমার বশীভূত। আমি ঋদ্ধিপাদে প্রতিষ্ঠিত। আমি ষড় অভিজ্ঞায় পারদর্শিনী। বুদ্ধের ইচ্ছা পূর্ণ হইয়াছে।
কামতৃষ্ণা ও স্কন্দসমূহ শূলের ন্যায় বিদ্ধ করে। তোমার কাছে যাহা ভোগের আনন্দ, আমার কাছে তাহা অকিঞ্চিৎকর।
অজ্ঞানের অন্ধকার বিদূরিত করিয়া আমি সর্ববিধ ভোগতৃষ্ণার বিনাশ সাধন করিয়াছি। হে পাপী, ইহা জানিয়া রাখো; হে কাল, তুমি পরাজিত।”
মারকে পরাজিত করলেও উৎপলবর্ণা তাঁর মাতুল পুত্র আনন্দের দ্বারা উৎপীড়িত হয়েছিলেন। উৎপলবর্ণার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সে অনেক আগে থেকেই তাঁকে বিবাহ করতে উৎসুক ছিল। এমনকি উৎপলবর্ণা ভিক্ষুণী ব্রত গ্রহণ করলেও আনন্দ বিবাহের আশা ত্যাগ করতে পারেনি। অন্ধবনে ছিল উৎপলবর্ণার কুটির। একদিন তাঁর অনুপস্থিতিতে আনন্দ (ইনি বুদ্ধশিষ্য আনন্দ নন ।) সেখানে প্রবেশ করে এবং রাত্রে উৎপলবর্ণা কুটিরে ঢুকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে, উৎপলবর্ণা পরদিন এই ঘটনা ভিক্ষুণীদের জানিয়ে দেন। তারা আবার জানায় বুদ্ধকে।
ঘটনাটি নিয়ে ভিক্ষুসংঘে আলোড়ন ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠে আসে যে উৎপলবর্ণা দোষী না নির্দোষ। বুদ্ধদেব উত্তর দেন যে সে নির্দোষ কারণ ঘটনা তার অনিচ্ছাক্রমে ঘটেছে(অনাপত্তি ভিক্ষভে, অসাদিয়ন্তিয়াতি)।বুদ্ধ আরো বলেন যে উক্ত ঘটনা উৎপলবর্ণার আসক্তির জন্ম দিতে সক্ষম হয়নি। তার লব্ধ দিব্যজ্ঞানে এর কোন প্রভাব নেই।
অবশ্য ঘটনার অভিঘাতে ভিক্ষুণীসঙ্ঘে কিছু পরিবর্তন আসে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, তাদের একাকী বসবাস এবং বনাঞ্চলে বসবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, কোশলরাজ প্রসেনজিৎকে বুদ্ধদেব এই ঘটনা জানালে প্রসেনজিৎ শ্রাবস্তীতে ভিক্ষুণীদের জন্য সুরক্ষিত বৃহৎ সংঘ গৃহ নির্মাণ করিয়ে দেন।
এরপরে উৎপলবর্ণা সম্পর্কে আরো একটি ঘটনা জানা যায়, যেটি উল্লেখের দাবি রাখে। শংকর্ষ নামক স্থানে এক সমাবেশে বুদ্ধদেবের আদেশক্রমে উৎপলবর্ণা তাঁর বিভিন্ন প্রকার ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন। তারপর বুদ্ধের চরণ বন্দনা শেষে তিনি সমবেত ভক্তদের উদ্দেশ্যে ধম্মের বাণীসম্বলিত দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন।
উৎপলবর্ণার একেবারে শেষ জীবনের তেমন কোন উল্লেখ বৌদ্ধ সূত্রগুলিতে আমরা পাইনি।
—--------------------------------------------
এই বরেণ্য নারীর জীবনের কাহিনী জানার পর, কিছু প্রশ্ন মনে আসে। একদম প্রথমেই যেটি, সেটি হল তাঁর সঙ্ঘে যোগ দেবার মূল প্রেরণা কি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ছিল, নাকি অজস্র ক্ষমতাশীল পাণিপ্রার্থীর উপদ্রব? তাঁর পিতাও তাঁকে সঙ্ঘে যোগ দেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যিনি কিনা একজন ধনবান শ্রেষ্ঠী ছিলেন। কিন্তু যতই সম্পদশালী হন, তাঁর পক্ষেও তাঁর অপেক্ষা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সাথে মতান্তর হানিকারক। এই সত্য কি ওই পরামর্শটির মধ্যে নিহিত ছিল না? একই প্রকার ঘটনা আমরা আর এক নারীর ক্ষেত্রেও দেখি। তিনি আম্রপালি। তাঁর পরিণতি অবশ্য সঙ্ঘে যোগ দেওয়ার মতো সুখকরও হয়নি। তাঁকে নগর-বধু ঘোষণা করা হয়েছিল। সেটি কতদূর তার ইচ্ছাক্রমে?? এই দুজনের ক্ষেত্রে কি ঘটেছিল তা আমরা জানতে পারছি,কেননা তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। (আম্রপালিও অবশ্য শেষপর্যন্ত বুদ্ধকেই আশ্রয় করে শান্তি পান)।কিন্তু তেমন বিখ্যাত নন, এমন কোন নারীর জন্যেও একই প্রকার ঘটনা ঘটেছিল কিনা তা আমাদের অজানা। অজানা মানেই এমনটা ঘটেনি, এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না বোধহয়। যাইহোক, ভিক্ষুণীসঙ্ঘ নারীর আশ্রয়স্থল হিসেবে সদর্থক ভূমিকা রেখেছিল,তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এরপর আসা যাক উৎপলবর্ণার ধর্ষিতা হবার ঘটনায়।ঐ ঘটনাটিতে ভিক্ষুসঙ্ঘে অন্তত প্রশ্ন উঠেছিল, বৌদ্ধ গ্ৰন্থগুলিতেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বুদ্ধদেব তার উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু এটাও তো মিথ্যা নয়, জনসমক্ষে যে ঋদ্ধি প্রদর্শন তাঁর মনোমত ছিল না, এবং প্রথমবার উৎপলবর্ণাকে যা প্রদর্শনের অনুমতি তিনি সম্ভবত দেননি,পরে তাঁর নির্দেশেই উৎপলবর্ণা সেই ঋদ্ধি দেখিয়েছিলেন সমাবেশে।এই ঘটনা থেকে যদি মনে করে নেওয়া হয় যে উৎপলবর্ণার অর্হত্বলাভে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টি কোনো প্রভাব ফেলেনি,সেটা প্রমাণ করাই পরবর্তীকালীন ঋদ্ধি প্রদর্শনের একটি লক্ষ্য ছিল,তবে তা খুব অযৌক্তিক হবে কি?
পরিশেষে উল্লেখ করা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে এই ধরনের ঘটনার আরও বেশ কয়েকটি উল্লেখ আমরা বৌদ্ধ গ্রন্থাদিতে পাই। যার মধ্যে সঙ্ঘে যোগদানকারী বা সঙ্ঘবহির্ভূত নারী-পুরুষের ভূমিকা ছিল এমন ঘটনা রয়েছে।হয়তো সেগুলি সংখ্যায় নগণ্য। কিন্তু এগুলিকে নিরোধ করার জন্য বুদ্ধদেবকে তৈরি করে যেতে হয় একের পর এক নিষিদ্ধকরণ-নিয়মাবলী। পারাজিকা, পাতিমোক্ষ ও অন্যান্য নিয়ম থেকে যার পরিচয় মেলে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement