Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ছদ্মবেশী প্রতারক সন্ন‍্যাসী

বর্তমানে প্রকৃত সাধুর-সন্তের চেয়ে ভেক্ ধারী সাধু-সন্তের সংখ্যাই সর্ব সমাজে বেশী দেখা যায়। আর যারা ছদ্মবেশী হয়ে থাকে, লোক দেখানোর জন্য তাদের হাবভাব, চলন-বলন এমনই আকর্ষনীয় যে, প্রকৃত সাধুতাকেই তারা হার মানিয়ে থাকে। সাধারণ লোকেরাও তাদের বাহ্যিক বেশ-ভূষাতে আকৃষ্ট হয়ে প্রায়শ:ই প্রতারিত হয়ে থাকেন। তবে সেরকম কৃত্রিম সাধু-সন্ন্যাসীর উপস্থিতি কেবল এখন নয়, অতীতেও বেশী-কম ছিল। আজ এখানে আমি সেরকম জঘন্য একজন সন্ন্যাসীর কাহিনী সকলের অবগতির জন্য তুলে ধরবো।

শ্রাবস্তী নগরে এক শ্রেষ্ঠীর ঘরে একজন পুত্রের জন্ম হয়েছিল। তার অভ্যাস ছিল বড়ই অদ্ভূত-বডই বিচিত্র। সে বিছানার পরিবর্তে মাটিতে শুয়ে থাকত এবং সাধারণ-সচরাচর খাদ্য সামগ্রীর পরিবর্তে দুর্গন্ধযুক্ত মল খেতো। তার মাতা-পিতা এরূপ উদ্ভট আচরণের জন্য তাকে নগ্ন সন্ন্যাসীদের সমাজে প্রেরণ করেছিল, যাদের নাম ছিল আজীবক সন্ন্যাসী সমাজ।
তার এরকম বিচিত্র আচরণের কারণে তার নাম হয়েছিল 'জম্বুক।' লোকেরা তাকে 'জম্বুক আজীবক' নামে সম্বোধন করতে লাগল। জম্বুক রাত্রির অন্ধকারে গোপনে পেট ভর্তি করে মল খেতো এবং দিনের বেলায় মুখ খুলে হা করে এক পায়ের উপর ভর করে চৌরাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতো। লোকেরা এরকমভাবে দাঁডিয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বলতো যে, উভয় পা জমিনের উপর রাখলে ধরিত্রীর উপর বোঝা বেড়ে যাবে। এজন্য মাটির বোঝা হালকা করতে একপায়েই কেবল ভর দিয়ে থাকে। মুখ কেনো খোলা রাখে এর উত্তরে বলতো যে, বাতাস হলো তার আহার। মুখ দিয়ে বাতাস প্রবেশ করিয়ে যাতে সে জীবিত থাকতে পারে সেজন্য হা করে থাকে।
লোকেরা তাকে কোন কিছু খাওয়ার জন্য দিলে সেগুলি সে খেতো না। যদি কেহ তাকে অনেক জোরাজুরি করতো, তখন সে কুশাগ্রে সামান্য পরিমাণ নিয়ে মুখে দিতো এবং বলতো যে, এতে তোমাদের অনেক পূণ্য লাভ হবে। এভাবে জম্বুক ৫৫ বছর পর্যন্ত মল ভক্ষণ করে নগ্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেছিল।
একদিন মহাকারুণিক বুদ্ধ তথাগত স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা দেখেছেন যে, জম্বুক আজীবকের মধ্যে অরহত্ব লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। শাস্তা সেখানে পৌঁছলে রাত্রির বিভিন্ন প্রহরে বিভিন্ন দেবতা তথাগতকে স্তুতি করতে এসেছিল। তাদের আগমণে সমগ্র বন দিব্যালোকে আলোকিত হয়েছিল।
জম্বুক সেরকম আলোক যখন দেখল, তখন সে বুদ্ধের দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়েছিল এবং সেও বুদ্ধের স্তুতি করতে লাগল এবং বলল-
‘হে মহাপুরুষ! আপনি নিশ্চয়ই মহান। কেননা আমি অনেক দেবী-দেবতা আপনাকে স্তুতি করতে দেখেছি। আমি ৫৫ বছর পর্যন্ত তপস্যায় রত আছি। কিন্তু আমার নিকট এখনও পর্যন্ত কোনো দেবী-দেবতা আসেনি।
তখন শাক্যমুণি বুদ্ধ জম্বুককে ভৎর্সনা করতে গিয়ে বললেন-
‘জম্বুক! তুমি সাধারণ লোকদেরকে ধোঁকা দিতে পারো, কিন্তু আমাকে ধোঁকা দেওয়া তোমার সম্ভব নয়। তুমি পেছনের ৫৫ বছর পর্যন্ত কি করেছো তা আমার সবই জানা আছে। তুমি পূর্বে কশ্যপ বুদ্ধের সময় একজন ভিক্ষুকে কোন উপাসকের ঘর হতে ভোজন গ্রহণ করতে দাওনি। সে ভিক্ষুর ভোজনকে তুমি অবজ্ঞা-তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে জমিনে ফেলে দিয়েছিলে। সেজন্য এ অপরাধের কারণে পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আজ তোমাকে দুর্গন্ধময় মল খেয়ে জীবন-যাপন করতে হচ্ছে।’
এ সমস্ত শুনতেই জম্বুক স্বীয় ভুল সম্বন্ধে অনুসোচনা গ্রস্থ হলো এবং সে শাক্যমুণি বুদ্ধের শ্রীচরণে নত মস্তক হয়ে লুটিয়ে পড়লো। বুদ্ধের শরণাপন্ন হয়ে সে একজন ভিক্ষু হলো।
এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ সুগত বলতে লাগলেন-
‘মাসে মাসে কুসগ্গেন, বালো ভূঞ্জেথ ভোজনং,
ন সো সঙ্খত ধম্মানং, কলং অগ্গন্তি সোলসিং'তি।’
(ধম্মপদ-৭০)
অর্থাৎ মুর্খ যদি তপশ্চর্যা করে মাসে মাসে কুশাগ্রের দ্বারা একবার মাত্র আহার করে, তথাপি সে জ্ঞাত ধম্মা ব্যক্তির ষোল কলার একভাগও ধম্ম পূর্ণ হয়না।
বুদ্ধ আরও বলতে লাগলেন-‘যাবতা ভিক্খবে! ধম্মা সঙ্খারা বা অসঙ্খাতা বা, বিরাগো তেসং ধম্মানং অগ্গমক্খাযতি, যদিদং মদনিমদ্দনো পিপাস-বিনযো আলযসমুগ্ঘাতো-বট্টপচ্ছেদো তণ্হক্খযো বিরাগো নিরোধো ‘নিব্বানং।’
অর্থাৎ ভিক্ষুগণ! যতক্ষণ পর্যন্ত সংস্কৃত ধম্ম (Conditional Phenomena) এবং অসংস্কৃত ধম্ম রয়েছে, সে ধম্ম সমূহের বিরাগকে (নির্বাণ) অগ্র বলা হয়েছে। যা হল প্রমাদকে অপ্রমাদকারী, পিপাসাকে (তৃষ্ণা) নিবারণকারী, আলয়কে (রাগ) বিনাশকারী, বর্তমানকে (সংসার চক্র) সমুচ্ছেদকারী, ইহাই হল তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ, নিরোধ এবং নির্বাণ।
প্রকৃত ধম্ম অনুশীলন বিহীন বাহ্যিক প্রদর্শনকারী সাধু বেশধারীরা হলো সমাজের মহাচোর, মহাঠকবাজ এবং মহাপ্রতারক। তারা সাধারণ ধম্মভীরু লোকদের ধম্ম বিশ্বাসকে পূঁজি করে নিজের ও অপরের মহা ক্ষতি সাধন করে থাকে। অপ্রাপ্তকে প্রাপ্ত হয়েছে, আসক্তিকে অতিক্রম করে অনাসক্ত হয়েছে এরূপ কত কিছু উদ্ভট দাবী করতে থাকে। এদের বাহ্যিকরূপ দেখতে একরকম এবং ভিতরের রূপ হল খুবই দুর্গন্ধময়। তারা দাপটে বিচরণ করছে আমাদের চারিপাশে। এজন্য বলা হয়-'চক্ চক্ করলেই সব সোনা হয়না।'

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement