Hot Posts

6/recent/ticker-posts

গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে নয়টি মিথ‍্যা প্রচার


আমার এ লেখাতে আমি ভগবান তথাগত বুদ্ধের সম্পর্কে প্রসারিত হওয়া নয়টি প্রচলিত মিথ্যা তথ্য বিষয়ে খতিয়ে দেখবো এবং জ্ঞাত হবো যে, সেগুলির মধ্যে সত্য কি এবং মিথ্যা কি?

১) তথাগত বুদ্ধের জন্ম কি হিন্দু পরিবারে হয়েছিল?
———————————
ইহা সম্পূর্ণরূপে একটি মিথ্যা প্রচার। এ সম্পর্কে আমি পূর্বেও বিস্তৃতভাবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে লিখেছি। এরপরেও আমাদের অনেক লোকেরা সহ হিন্দুরা সবসময় বলে থাকে যে, বুদ্ধের জন্ম হয়েছে হিন্দু পরম্পরায়। কিন্তু ইহা হল হাঁস্যকর অপপ্রচার। গৌতম বুদ্ধ এবং তাঁর শাক্য পূর্বজগণ ছিলেন প্রাচীন ভারতের মূল নিবাসী শ্রমণ পরম্পরার অনুসারী এবং সে পরম্পরা পূর্ববর্তী ২৭ জন বুদ্ধের পরম্পরা হতে এসেছেন। তাঁর জন্ম হিন্দু ধর্মে যেমন হয়নি, তেমনি বৈদিক পরম্পরায়ও হয়নি। যদি সেরকম হতো তা বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতো। বুদ্ধের পিতা বা তাঁদের শাক্যবংশ হিন্দু হওয়ার কোনো প্রমাণ বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায়না। বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম নামে তখন কোনো ধর্মই ছিলনা। একাদশ শতাব্দীর পরেই ‘হিন্দু’ শব্দ ভারতবর্ষে অস্তিত্বে এসেছে। বুদ্ধের পূর্বে কেবল বমন এবং শ্রমণ-এ দু’ পরম্পরাই ছিল। বৌদ্ধ এবং জৈন পরম্পরা উভয়ই শ্রমণ পরম্পরা হতে বের হয়েছে। বমনদের বৈদিক পরম্পরা হতে নয়। মেগাস্থিনীজও তাঁর ‘ইণ্ডিকা’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে তখন ভারতবর্ষের বমন-শ্রমণ-এ দু’ পরম্পরার কথা উল্লেখ করেছেন।
২) বুদ্ধের মাতা কি হাতীর সাথে সম্ভোগ করেছিলেন?
————————————
ইহাও একটি বড় মিথ্যা, যা অনেক হিন্দুরা প্রসারিত করেছে। বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে স্পষ্ট দেখা যায় যে, বুদ্ধের মাতা রূম্মন দেই (মহামায়া দেবী) কর্তৃক এক স্বপ্ন দর্শন হয়েছিল, তাতে বলা হয় যে, একটি শ্বেত হস্তী তাঁর গর্ভে প্রবেশ করে সমাহিত হয়েছিল। ইহা কোনো বাস্তবিক ঘটনা নয়। বরং তা ছিল একটি প্রতীকাত্মক স্বপ্ন। ইহাকে বিকৃত করে বুদ্ধ বিদ্বেষী বমণেরা হাতীর সাথে সম্ভোগ করেছেন বলে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছে। যা হল সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট কাহিনী।
৩) বুদ্ধ কি ক্ষত্রিয় ছিলেন?
————————————
এরকম দাবীও মিথ্যা এবং অপপ্রচার। বুদ্ধের সময়ে ‘ক্ষত্রিয়’ শব্দ ভারতে প্রচলিত ছিলনা। এ শব্দ প্রাচীন ফার্সী (ক্ষত্রিয়-ছতীয়) হতে এসেছে। যেমন-ইরানের রাজা ডেরিয়সের শিলালেখনীতে এ শব্দ পাওয়া যায়। বুদ্ধ বাস্তবে জাতিবাদী কোনো ‘ক্ষত্রিয়’ ছিলেননা। তিনি ছিলেন বাস্তবে ‘খত্তিয়’ অর্থাৎ ইহা ছিল এরকম এক বর্গ যাঁদের কাছে ক্ষেত এবং ক্ষেতের বিস্তর ভূমি থাকতো। তাঁরা নিজেদের মধ্যে রাজা নির্বাচন করতেন। সুতরাং খত্তিয়’কে জাতিবাদী ক্ষত্রিয় বলা ঐতিহাসিকভাবে সরাসরি মিথ্যা ও অপপ্রচার।
অনুরূপভাবে, ‘বমণ’ও হল জাতিবাদী সম্প্রদায়। বমণকে পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহে ‘ব্রাহ্মণ’ বলা হয়েছে। ইহাও ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ধম্মপদ অনুসারে ব্রাহ্মণই হল শ্রমণ। তা জাতি-বর্ণবাদী বমণ নয়। বুদ্ধ কখনও জাতিবাদ-বর্ণবাদকে মান্যতা দেননি। ইতিহাসবিদদের দ্বারা কৃত এরূপ ভ্রম প্রসারিত হয়েছে যে, বুদ্ধগণ সবসময় ব্রাহ্মণ অথবা ক্ষত্রিয় কুল হতে এসে থাকেন। এসবই হল বুদ্ধ সম্পর্কে দুষ্প্রচার। বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহেও সেসময় বিষয় প্রবেশ করেছে। বাস্তবে বুদ্ধ ক্ষত্রিয় হতেও হননা এবং ব্রাহ্মণ হতেও হননা।
৪) কুমার সিদ্ধার্থ কি রাতের অন্ধকারে পুত্র-পত্নীকে ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন?
———————————-
এ কাহিনী মহাযান বৌদ্ধ পরম্পরার কবি অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধ চরিত’ এবং সর্বাস্তিবাদী গ্রন্থ ‘ললিত বিস্তর’ হতে এসেছে। এগুলির চেয়ে অধিকতর প্রাচীন থেরবাদ পরম্পরায় এর ভিন্নতা দেখা যায়। থেরবাদের ‘অঙ্গুত্তর নিকায়ের অন্তর্গত ‘সুকমাল সূত্র’তে বুদ্ধ স্বয়ং বলেছেন যে, তিনি দিনের বেলায় নিজের মাতা-পিতার সন্মুখে বিদায় নিয়েই ক্রন্দনরত মাতা-পিতাকে ত্যাগ করেছিলেন। তিনি নিজের কেশ-শ্মশ্রু কর্তন পূর্বক কাষায় বস্ত্র ধারণ করেছিলেন এবং গৃহত্যাগ করেছিলেন। রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি বের হয়ে যাওয়ার কাহিনীটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। থেরবাদ পরম্পরা হল মহাযান হতে অধিকতর প্রাচীন। সুতরাং, প্রাচীনত্বকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। জাতকের কাহিনী সমূহেও এ সম্বন্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না। নীচের একটি পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণের চিত্র দেখুন, কুমার সিদ্ধার্থ দিবালোকে গৃহত্যাগের সময় নগরবাসী কিভাবে নতমস্তক হয়ে বিদায় জানাচ্ছেন।
৫) তথাগত বুদ্ধ কি বিষ্ণুর অবতার ছিলেন?
———————————
ইহাও হল সম্পূর্ণ অসত্য প্রচার। এরূপ দাবী বমণদের রচিত ‘বিষ্ণু পুরাণ’ এবং ‘ভাগবত পুরাণ’ গ্রন্থদ্বয়ে পাওয়া যায়। যেগুলির সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হল অষ্টম শতাব্দীর পরের। অর্থাৎ বুদ্ধ হতে প্রায় ১৪০০ বছর পরের রচনা। এর বিপরীতে কারণ্ডব্যুহ সূত্র, সদ্ধর্ম পুণ্ডরিক সূত্র, মহাবস্তু, ললিত বিস্তারের মতো মহাযান গ্রন্থ সমূহে বিষ্ণুকে লোকপাল অর্থাৎ বুদ্ধের ধম্মকে রক্ষাকারী দেবতা বলে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ, সর্বশক্তিমান নন। যদি বুদ্ধ বিষ্ণুর অবতার হতেন, তাহলে রামায়ণে বুদ্ধকে অপমান করে শ্লোক রচনা করা হতোনা এবং প্রত্যেক বিষ্ণু মন্দিরে তাঁর মূর্তি দৃশ্যমান হতো।
৬) বাসুদেবকে কি সর্বপ্রথম ‘ভগবান’ বলা হয়েছে?
——————————-
ইহাও সরাসরি অপপ্রচার, মিথ্যা ও বানোয়াট। সর্বপ্রথমে গৌতম বুদ্ধকেই ‘ভগবান’ বলা হয়েছে। ইহার লিখিত প্রমাণ সম্রাট অসোকের ‘ভাব্রু-বৈরাট শিলালেখনীর তৃতীয় পংক্তিতে পাওয়া গিয়েছে। সেখানে রয়েছে-‘ভগবতা বুদ্ধেন।’ ইহা হল ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন লেখনী। হেলিয়োডোরসের স্তম্ভে ‘বাসুদেব’ এর যা উল্লেখ আছে বলা হয়েছে, তা হল বাস্তবে ‘বশ’ শব্দের ভুল অনুবাদ। যাকে ইতিহাসবিদদের অনেকে বাসুদেব বানিয়ে দিয়েছেন।
৭) গৌতম বুদ্ধ কি বেদ সম্বন্ধে চর্চা করেছেন?
————————————
ইহা প্রমাণ সিদ্ধ নয়। বুদ্ধের সময়ে অর্থাৎ ৫ম খৃষ্টপূর্বাব্দে বেদের কোনো ভৌতিক পাণ্ডুলিপির সময় ছিলনা। কিছু মৌখিক পরম্পরার কথা বাদ দিলে, সেসময়ের পূর্বে বা সমকালীন সময়ে বেদ সমূহের কোনো ভৌতিক প্রমাণ উপলব্দ হয়না। বেদের প্রথম স্পষ্ট উল্লেখ গুপ্তকাল হতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে আলোচনা অবশ্যই করা হয়েছে, কিন্তু প্রমাণ করা হয়নি যে, বুদ্ধ স্বয়ং ইহা আলোচনা করেছেন।
৮) বুদ্ধ কি বিদেশী বা আক্রমণকারী ছিলেন?
—————————
এরূপ বলা হল ইতিহাসের অজ্ঞানতা ছাড়া আর কিছু নয়। বুদ্ধ এবং মহাবীরের সময়ে (খৃষ্টপূর্ব ৫ম অব্দ) ভারতে কোনো বিদেশীদের আক্রমণের সময় ছিলনা। ভারতে আক্রমণকারী খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দ হতে আসতে শুরু করেছিল এবং সে সময় যাঁরা এসছিলেন (মিলিন্দ এবং পরে কনিষ্ক), তাঁরাও বৌদ্ধ ধম্মে সামিল হয়েছিলেন। যা হতে মহাযান শাখার উদয় হয়েছে। কোনোভাবে বুদ্ধ বিদেশী বা আক্রমণকারী ছিলেননা।
৯) বুদ্ধ কি নাস্তিক ছিলেন?
————————————
বুদ্ধ কখনও নাস্তিক যেমন ছিলেননা, তেমনি আস্তিকও ছিলেননা। ‘নাস্তিক’ এর মনুস্মৃতিতে উল্লিখিত পরিভাষা হল ‘যে বেদকে প্রমাণ মানেনা সেই নাস্তিক।’ ইহা বুদ্ধের সন্দর্ভে লাগু হয়না। কেননা তাঁর সময়ে বেদের অস্তিত্ব ভৌতিকরূপে সিদ্ধ হয়না। আধুনিক অর্থে নাস্তিক হল ‘যে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে মানেনা।’ ইহাও বুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়না। বুদ্ধ তো ঈশ্বর সম্পর্কে ‘হাঁ’ যেমন বলেননি, তেমনি ‘না’ও বলেননি। তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মনুষ্যের দুঃখকে নিবারণ করা। ঈশ্বরের খোঁজ নয়। তাঁর ধম্মের মুখ্য ধ্যান ছিল দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিবারণ এবং দুঃখ নিবারণের উপায়ের উপর।
সারাংশ
————-
এগুলিই ছিল নয়টি মিথ্যা অপপ্রচার, যা বুদ্ধ তথাগতের সম্পর্কে প্রসারণ করা হয়েছে। এরকম যেকোনো মিথ্যা প্রচারকে বিশ্বাস যেমন করতে নেই, তেমনি সেগুলির উত্তর দেওয়ারও দরকার নেই। এ সমস্ত মিথ্যার উপর দৃষ্টি দেওয়া এবং তর্ক-বিতর্ক করা অনর্থক সময় ও শক্তি নষ্ট করা, কেননা তারা জেনেও থাকে যে, এগুলি হল মিথ্যা, তারপরেও তারা মিথ্যা প্রচার ও আঘাত করার উদ্দেশ্যে এগুলি বলে থাকে। আশা করব যে, এ তথ্যগুলির দ্বারা আপনাদের ভ্রান্তি দূরীভূত হতে সহায়তা করবে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement