Hot Posts

6/recent/ticker-posts

গণপতি বপ্পা মৌর্যের সাথে বৌদ্ধ ধম্মের সম্বন্ধ

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, গণপতি বপ্পা মৌর্যের (মোরিয়া) সাথে সম্বন্ধ রয়েছে বৌদ্ধধম্মের। ইহার ইতিহাসকে মুচে দেওয়ার জন্য ‘গণপতি’কে হিন্দু ধর্মের দেবতা বানানো হয়েছে।

প্রাচীন বৌদ্ধ পরম্পরায় বিনয় পিটকের বিদ্বান ভিক্ষু এবং উপাসক-উপাসিকাদেরকে বিনায়ক বা বিনায়কীই বলা হতো। তন্ত্রযান বৌদ্ধ শাখায় এ সকল বৌদ্ধ বিদ্বানদেরকে বিনায়ক-বিনায়কী নামের দ্বারা পূজা হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ হাতির মতো ধীর-স্থির সংযম বিনয় পূর্বক জীবন-যাপন করতো। এজন্য বিনয়বাদী বৌদ্ধেরা হাতিকে তাদের বিনায়ক বিদ্বানদের প্রতীক বানিয়েছিলেন। গণপতি বা গণেশ হলো বৌদ্ধ দেবতা, ইহাকে এবং বৌদ্ধ স্থল সমূহকে পরবর্তীতে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্র ছিল বৌদ্ধ ধম্মের গঢ়, যেখানে ভারতের সবচেয়ে বেশী বৌদ্ধ গুহা রয়েছে। মহারাষ্ট্রে মহারাঠী মানে মহার এবং মারাঠা লোকদেরকে মৌর্য সম্রাটদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। মৌর্য সম্রাটদের প্রভাবে মহারাষ্ট্রের মারাঠী বৌদ্ধেরা সমগ্র মহারাষ্ট্রে বৌদ্ধ স্থানগুলি বিকশিত করেছেন, স্থানে স্থানে বৌদ্ধ গুহা এবং বৌদ্ধ বিহার সমূহ নির্মিত হয়েছে।
মহারাষ্ট্রে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ পরম্পরা জীবন্ত ছিল। এরকম কায়স্থ পুরাতত্ব গবেষক দেশপাণ্ডে মহোদয় গবেষণা সন্দর্ভের সাথে বর্ণনা করেছেন। তারপরেও বৃটিশেরা আসা পর্যন্ত সন্তগণ তথাগত বিট্ঠলের নামের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রে বৌদ্ধ পরম্পরা জীবিত রেখেছিলেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন বৃটিশেরা ভারতে বৌদ্ধ ধম্ম, বৌদ্ধ ইতিহাস তথা বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন, তখন ব্রাহ্মণেরা ঘাবড়ে গিয়েছিল এবং বৌদ্ধ জাগরণকে দাবিয়ে রাখার জন্য বৌদ্ধ স্থলগুলির উপর অবৈধ কব্জা শুরু করতে লাগলো। মহারাষ্ট্র হতে মৌর্য সম্রাজ্যের স্মৃতি মুচে ফেলার জন্য মাধব ভট নামক ব্রাহ্মণ পঞ্চদশ শতাব্দীতে নিজেকে নিজে মোরয়া বাবা বা মোরোবা গোলাবী নাম ধারণ করেছেন এবং গণেশ পুরাণ দ্বারা প্রেরণা লাভ করে বৌদ্ধ চৈত্য তথা মূর্তি সমূহকে গণপতি নাম দিয়েছেন। মাধব ভট দ্বারা প্রেরণা লাভ করে পেশবাওগণ পুণের আশেপাশে জুন্নর, মোরেগাও, লেণ্যাদ্রীর বৌদ্ধ স্থলগুলিকে মোরয়া গোসাবীর গণপতি স্থল নাম দিয়ে কব্জা করেছেন এবং আটটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ স্থলকে অষ্টবিনায়ক গণপতি নাম দেওয়া হয়েছে।
বাল গঙ্গাধর তিলক কর্তৃক পেশবাওগণের পরম্পরা সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ১৮৯৩ সালে প্রথমবারের মতো বঙ্গে দুর্গোৎসবের অনুকরণে দশদিনের গণেশোৎসব শুরু করা হয়েছিল। তিলক কারাগারে থাকাকালীন ধম্মপদ পড়েছিলেন এবং ইহাকে কাউন্টার করার জন্য ভগবদ্গীতার উপর গীতা রহস্য গ্রন্থ লিখেছিলেন।
এর মানে ইহাই যে, বৌদ্ধ ধম্মের প্রতিক্রিয়ায় পেশবা ব্রাহ্মণ এবং তিলক একত্রে কাজ করছিলেন। মোরোবা গোসাবী বৌদ্ধ ধম্মের মহত্বপূর্ণ প্রতীক হাতির মূল বৌদ্ধ পরিচয় মুচে ফেলার জন্য এবং ইহাকে ব্রাহ্মণীকরণ করার জন্য হাতির মুখ বিশিষ্ট গণপতি গ্রহণ করেছেন এবং ইহাকে ব্রাহ্মণদের দেবতা রূপে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পেশ করেছেন। তখন হতে ব্রাহ্মণ গণপতিকে নিজেদের গৃহে পূজা করতে লাগল। এরপূর্বে ব্রাহ্মণ এবং গণপতির সাথে কোনো সম্বন্ধ ছিলনা। কেননা, গণপতি ছিল বৌদ্ধদের দেবতা।
অমরাবতীর মতো প্রাচীন বৌদ্ধ গুহা সমূহে গণপতির শিল্পকলা পাওয়া যায়। সেখানে বৌদ্ধগণ বুদ্ধকে বালক হাতিরূপে পূজা করছেন দেখা যাচ্ছে, কেননা হাতি হল বালক বোধিসত্বের (বুদ্ধ) জন্মের প্রতীক। এরপর বজ্রযান এবং তন্ত্রযানেও গণপতি হল একজন বৌদ্ধ দেবতা। মাধব ভট নামক ব্রাহ্মণ কর্তৃক এ বৌদ্ধ দেবতা গণপতি বা গণেশকে চুরি করা হয়েছে এবং ইহাকে ব্রাহ্মণদের দেবতা বানানো হয়েছে। তিনি নিজের নামও মোরয়া গোসাবী রেখেছেন, যাতে মৌর্য সম্রাটগণের বৌদ্ধ পরিচয় মহারাষ্ট্রে সমাপ্ত করে মৌর্য (মোরয়া) শব্দের ব্রাহ্মণীকরণ হয়ে যায়। এভাবে মাধব ভট কর্তৃক বৌদ্ধ দেবতা গণপতি এবং মৌর্য নামের ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে। ভারতীয় মূল নিবাসী বহুজন লোকেরা সাংস্কৃতিক চুরির এ ইতিহাস না জানার কারণে তারা গণপতির বিরোধ করে থাকে এবং ইহাকে ব্রাহ্মণদের দেবতা মনে করে থাকে। ব্রাহ্মণেরা গণপতিকে গণেশোৎসব রূপে সম্পূর্ণ মহারাষ্ট্রে ভয়ঙ্কর উন্মাদনা উৎপন্ন করে বহুজনদেরকে ব্রাহ্মণীকরণ করেছে।
ব্রাহ্মণেরা আমাদের ইতিহাস, পরম্পরা তথা ঐতিহ্যকে চুরি করে সেগুলির উপর অবৈধ কব্জা করেছে। প্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাস, পরম্পরা তথা ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদেরকে এ সমস্ত বিষয়ের অব্রাহ্মণীকরণ করতেই হবে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement