Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের অনাত্ত তত্ব বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের অনাত্তবাদ :

চেতনার কোয়ান্টাম প্রবাহ এবং শূন্যের মহাবিস্ফোট-একটি তথ্যাত্মক, ক্রান্তিকারী এবং গম্ভীর বিশ্লেষণ করে আলোচনার প্রয়াস করছি আজকের লেখনীতে।

বহু শতাব্দী হতে মানব সভ্যতা মৃত্যু এবং এর পরবর্তী অস্তিত্বকে বুঝার জন্য নানা কাল্পনিক কাহিনী, অমূর্ত আত্মা এবং দৈবিক সত্তার আশ্রয় নিয়ে এসেছে। কিন্তু আড়াই হাজার বছর পূর্বে বৈজ্ঞানিক গৌতম বুদ্ধ কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ছাড়াই কেবল স্বীয় গভীর সজাগতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের শক্তিতে এক এরকম ক্রান্তিকে জন্ম দিয়েছেন, যিনি পারম্পরিক দর্শনের ভিত্তিকে ওলট-পালট করে দিয়েছিলেন। সে সিদ্ধান্ত ছিল-‘অনাত্তবাদ’ (Anatta) এবং ‘অনিত্য’ (Anicca)।
আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে কোয়ান্টাম ফিজিক্স (Quantum physics), যে কোনো ধার্মিক অন্ধবিশ্বাসের পুষ্টি করেনা, কিন্তু তাঁদেরকে বুদ্ধের এ অনাত্তবাদী সত্যের সামনে নতমস্তক হয়ে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। এ আলেখ্য হল এ উভয়ের কান্তিকারী মেল বন্ধনের একটি তথ্যমূলক দস্তাবেজ।
১) মিথকের অন্ত: আত্মা যেমন নাই, তেমনি কোনো অচল কেন্দ্রও নাই
————————————-
পারম্পরিক মতানুসারে শরীরের ভিতরে এক ‘আত্মা’ নিবাস করে থাকে, যা কিনা অমর, স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয়। মৃত্যুর পরে সে আত্মা বস্ত্র পরিবর্তনের মতো অন্য শরীর ধারণ করে থাকে। বিজ্ঞানবাদী বুদ্ধ এরূপ বিচারকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে ইহাকে ‘ভ্রম’রূপে আখ্যায়িত করেছেন।
্যুরোসাইন্সের তথ্য
————————
‘স্ব’ কেবল এক ভ্রম (The Illusion of Self) যা আধুনিক মস্তিস্ক বিজ্ঞান (Neuroscience) যখন অত্যাধুনিক উপকরণ সমূহের মাধ্যমে মানব মস্তিস্কের কাঁটা-ছিঁড়া করে থাকে, তখন তারা ইহা অনুসন্ধান করেছে যে, মস্তিস্কের কোথায় কোন ‘কন্ট্রোল রূম’ রয়েছে, যেখানে ‘আমি’ বা ‘আত্মা’ নামের মেনেজার বসে রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান এ পর্যন্ত সেরকম কোনো কেন্দ্রের হদিস পায়নি।
মস্তিস্ক হল কোটি কোটি ন্যুরান্সের এক গতিশীল নেটওয়ার্ক। বিচার, স্মৃতি এবং ভাবনা সমূহ বিদ্যুৎ রসায়নিক তরঙ্গ সমূহ (Electrochemical waves) রূপে আসা-যাওয়া করে থাকে।
বৈজ্ঞানিক এন্টোনিয়ো দমাসিয়ো (Antonio Damasio, 1944-) এবং ডেবিড ইগলমেনের (David Eagleman,1971-) মতে, ‘আমি’র মতো কোনো স্থায়ী সত্তা নাই। ইহা হল কেবল মস্তিস্ক দ্বারা অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নির্মাণ করা এক ভ্রম (Illusion)।
বুদ্ধের অনাত্মবাদ ((Anatta)
————————————
বুদ্ধ ইহাকে পঞ্চস্কন্ধের প্রবাহ বলেছিলেন। রূপ (শরীর), বেদনা (অনুভূতি), সংজ্ঞা (পরিচয়), সংস্কার (মানসিক প্রবৃত্তি) এবং বিজ্ঞান (চেতনা)-এ পাঁচটির নিরন্তর বহমান প্রবাহকেই আমরা অজ্ঞানতাশত: ‘আমি’ বা আত্মা’ মনে করে থাকি। দূর হতে নদীর প্রবাহ এক দেখালেও প্রতিক্ষণে তা যেমন পরিবর্তন হয়, তেমনি মনুষ্যের অস্তিত্বও হল সেরকম।
২) ক্ষণভঙ্গুরতার বিজ্ঞান: অনিচ্চা এবং কোয়ান্টাম ওয়েব (Quantum wave)
——————————————
বুদ্ধের দ্বিতীয় মূল সিদ্ধান্ত হল ‘অনিচ্চা’ অর্থাৎ সবকিছু হল ক্ষণভঙ্গুর, কোনো কিছুই নিত্য বা চিরস্থায়ী নয়।
কোয়ান্টাম ফিজিক্সের তথ্য: পদার্থের তরলতা
——————————
বিংশ শতাব্দীতে যখন ভৌতিক বিজ্ঞান পরমাণুর ভিতর ঝাঁকিয়েছে, তখন ন্যুটনের কঠিনত্বের ভৌতিকবাদ ধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে। কোয়ান্টাম স্তরে ইলেক্ট্রান বা ক্বায়ার্ক্সের মতো উপ-পরমাণু কণা (Subatomic Particles) কোনো এক স্থানে কঠিন স্থিররূপে টিকে থাকেনা।
সেগুলি তরঙ্গ (Wave) এবং কণার (Particle) মধ্যে নিরন্তর রূপ পরিবর্তন করতে থাকে। সেগুলি প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটিবার প্রকট এবং বিলীন হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর (১৮৭৯-১৯৫৫) সমীকরণ (E=mc^2) দ্বারা সিদ্ধ করেছেন যে, যাকে আমরা স্থির কঠিন পদার্থ মনে করে থাকি, তা হল বাস্তবে একত্রিত হওয়া শক্তি মাত্র।
বুদ্ধের ক্ষণভঙ্গুরবাদ:
—————————
বুদ্ধ বিদর্শন ভাবনার গভীর স্তরে অনুভব করে বলেছেন যে, আমাদের এ ভৌতিক শরীর এবং ব্রহ্মাণ্ডের ‘কলাপ’ সমূহ (অতি সুক্ষ্ম তরঙ্গ) থেকে তৈরী হয়। যেগুলি এক সেকেন্ডে কোটি কোটি বার উৎপন্ন এবং বিলয় হয়ে থাকে। ব্রহ্মাণ্ডে কোনো কিছুই স্থির নাই। সবকিছু হল সতত প্রবাহমান (Flux)।
৩) মৃত্যুর পরবর্তী কি? আত্মার স্থানান্তরণ নয়, শক্তির ‘পুনর্ভব’
——————————
যখন আত্মাই নাই, তাহলে মৃত্যুর পরে কি হয়ে থাকে? বুদ্ধ ‘পুনর্ভবের’র (Rebirth-যাতে আত্মা এক শরীর হতে অন্য শরীরে এসে থাকে) সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
[মৃত্যু ক্ষণ: সঞ্চিত কর্ম শক্তি (কম্ম বিঞ্ঞাণ)] >(শক্তির স্থানান্তরণ) [নবীন মাধ্যম: নতুন জীবন/চেতনার নতুন প্রবাহ]
বিজ্ঞানের নিয়ম
———————
শক্তি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত (Conservation of Energy) তর্মোডায়নামিক্সের প্রথম নিয়ম বলে থাকে যে, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে শক্তিকে নষ্ট যেমন করা যায়না, তেমনি উৎপন্নও করা যায়না। ইহাকে কেবল এক রূপ হতে অন্যরূপে রূপান্তরিত করা যেতে পারে।
বুদ্ধের যৌক্তিক সমাধান
—————————-
বুদ্ধের মতে, মৃত্যুর সময় এ ভৌতিক শরীর (রূপ) কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু জীবনভর সঞ্চিত করা মানসিক শক্তি, ইচ্ছা এবং কর্ম সমূহের গতিবেগ (কম্ম বিঞ্ঞাণ) নষ্ট হয়না।
যেমন একটি জ্বলন্ত দীপক হতে অন্য দীপক যখন জ্বালানো হয়, তখন প্রথম দীপকের শিখা তুলে অন্য দীপকে নিয়ে আসা হয়না। বরং কেবল শক্তির স্থানান্তরণ হয়ে থাকে। ‘আত্মা’ যাত্রা করেনা, বরং কর্ম সমূহের শৃঙ্খলা প্রকৃতির নিয়মানুসারে এক নতুন মাধ্যম (নতুন জীবন গ্রহণ করে নেয়) ইহা হল সম্পূর্ণরূপে কারণ-কার্যের সিদ্ধান্তের (প্রতীত্যসমুৎপাদ) উপর আধারিত।
ক্রান্তিকারী সামাজিক এবং বৈচারিক পরিণাম
——————————————
বুদ্ধের অনাত্মবাদ এবং বিজ্ঞানের এরূপ মেলবন্ধনে কেবল দার্শনিক ব্যাখ্যাই বুঝানো হয়নি, বরং তা অনেক শতাব্দীর প্রচীন সামাজিক শোষণ তন্ত্রকেও ধ্বস্ত করে দিয়েছে।
জন্মজাত শ্রেষ্ঠতার খণ্ডন
—————————-
যদি কোনো স্থায়ী, দিব্য আত্মাই না থাকে, তাহলে কোনো আত্মা জন্ম হতে কিভাবে ‘ব্রাহ্মণ’ বা ‘শুদ্র’ হতে পারে? বুদ্ধ দ্বারা স্থাপন করা হয়েছে যে, মনুষ্য স্বীয় কর্ম এবং বিচার সমূহের দ্বারা নির্মিত হয়, কোনো দৈবিক শক্তিতে নয়।
নিয়তিবাদ এবং ভাগ্যের অন্ত
———————————-
যখন কোনো অচল আত্মা বা বিধাতার অস্তিত্ব নাই, তখন ‘ভাগ্য’র সিদ্ধান্ত স্বত: সমাপ্ত হয়ে যায়। মনুষ্য হল নিজের ভাগ্য নির্মাতা নিজেই। কর্ম এবং চেতনার প্রবাহ যেরকম হবে, সেরকমই হবে তার ভবিষ্যৎ।
অহঙ্কার হতে মুক্তি
————————
‘আমি’ এবং ‘আমার’ অহঙ্কারই হল সমস্ত দুঃখ এবং সামাজিক সংঘর্ষের শিকড়। ইহা বুঝতে হবে যে, ‘আমি’ একটি সতত প্রবাহ মনুষ্যের ভিতর করুণা এবং সমতার সঞ্চার করে থাকে।
সারগর্ভিত সারাংশ
————————-
বুদ্ধের দর্শন কোনো কাল্পনিক পরলোকের কথা বলেনা, ইহা হল কোনো লোকের যথার্থের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। বুদ্ধের মতে, মৃত্যুর পরে আত্মা কোথাও যায়না, কেননা আত্মার মতো কোনো পৃথক, অচল সত্তা কখনও ছিলইনা। যা রয়েছে, তা হল কেবল চেতনা প্রবাহ।
আজ ন্যুরো সাইন্স এবং কোয়ান্টাম ভৌতিকী যে সত্য পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগার সমূহের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে, তথাগত বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর পূর্বে মানব চেতনার গবেষণাগারে তাকে প্রত্যক্ষ দেখে নিয়েছিলেন। বুদ্ধের মার্গ হল পরম্পরাকে বিনাশকারী পূর্ণত: যৌক্তিক, তথ্যাত্মক এবং একটি সমতামূলক, বৈজ্ঞানিক সমাজ নির্মাণের মার্গ।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement