আজকের দিনে ইহা একটি সাধারণ প্রশ্ন যে, বুদ্ধ ধম্ম তার উৎপত্তি স্থান ভারত হতে কেনো বিলুপ্ত হল? বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ তিব্বত, চীন, নেপাল পৌঁছল কিভাবে? এ সম্বন্ধে ইতিহাস কি বলে?
সর্ব প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্টরূপে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, ভগবান বুদ্ধের সময় বর্তমানের ন্যায় ভারত এবং নেপালের মতো আধুনিক রাষ্ট্রীয় সীমা সমূহ ছিলনা। সে সময় জম্বুদ্বীপ অনেক জনপদ, গণরাজ্য এবং মহাজনপদের এক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র ছিল। বুদ্ধের জন্ম, তাঁর উপদেশ এবং বৌদ্ধ ধম্মের বিকাশ হয়েছিল এহেন সংসারেই। আজকে লুম্বিনী হল নেপালে, কিন্তু তখন মগধ, কোশল, শাক্য, বৈশালী প্রভৃতি ক্ষেত্রের মধ্যে ছিল গভীর সাংস্কৃতিক সম্বন্ধ। ত্রিপিটক পরম্পরার বিকাশও এভাবেই হয়েছে।
তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সোমপুর, জগদ্দল, তালহারা, বল্লভী এবং পুষ্ফগিরির মতো মহান বৌদ্ধ মহাবিহারও এরকম ভারতবর্ষেই হয়েছে।
পৃথিবীর অনেক দেশে ভিক্ষু এবং বিদ্যার্থী এখানে আসতেন এবং তাঁরা দর্শনশাস্ত্র, যুক্তি বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যা, ব্যাকরণ, ধ্যান-ভাবনা তথা ভাষা বিজ্ঞানের অধ্যয়ন করতেন। কিন্তু এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসছে যে, ভারতে জন্ম নেওয়া বৌদ্ধ সাহিত্য আজ ভারতে কেনো নাই? সংস্কৃতের অনেক বৌদ্ধ গ্রন্থ আজ তিব্বত, চীন, ভূটান এবং নেপালে কেনো সুরক্ষিত রয়েছে?
ভারতের বৌদ্ধ মহাবিহারের বিশাল পুস্তকালয় সমূহ কোথায় গায়েব হলো? ভারতীয় বৌদ্ধ আচার্যগণ নিজেদের সাথে গ্রন্থ সমূহ নিয়ে হিমালয়ের দিকে গিয়েছিলেন কেনো? তাঁরা কি নিজেদের ইচ্ছায় চলে গিয়েছিলেন? অথবা পরিস্থিতি তাঁদেরকে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছিল?
এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্য আমাদেরকে উপলব্দ ঐতিহাসিক প্রমাণকে দেখতে হবে।
খৃষ্টীয় সপ্তম হতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষে নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং ওদন্তপুরীর মতো বিশ্বের প্রমুখ শিক্ষা কেন্দ্র ছিল। এগুলির উল্লেখ চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং ভারতে আসা তীর্থ যাত্রী ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২), হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪) এবং ইৎ-সিং (৬৩৫-৭১৩) প্রমুখের ভ্রমণ বিবরণী, পাল সম্রাটগণের শিলালেখনী তথা পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণে পাওয়া যায়।
খৃষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে উক্ত মহাবিহার সমূহের উপর আক্রমণ হয়েছিল। ইহার উল্লেখ সমকালীন ফার্সী ইতিহাসকার মিনহাজ-সিরাজ (১১৯৩-১২৬৬) স্বীয় ‘তবকাত-এ-নাসিরী’ গ্রন্থে দেখা যায়। তিব্বতি ভিক্ষু ধম্মস্বামীন (১১৯৭-১২৬৪) যখন নালন্দা এসেছিলেন, তখন তিনি সেখানকার ধ্বংসাবশেষ এবং বেঁচে থাকা কিছু ভিক্ষুর কথা উল্লেখ করেছেন। পুরাতাত্বিক গবেষণাও এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের বিনাশের পুষ্টি করে থাকে।
খৃষ্টীয় ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে জীবিত তিব্বতি ইতিহাসকার লামা তারানাথ (১৫৭৫-১৬৩৪) ভারতে বৌদ্ধ ধম্মের ইতিহাস লিখেছিলেন। তিনি ভারতীয় বৌদ্ধ আচার্যগণের পরম্পরা, মহাবিহার সমূহের পতন এবং ভারতীয় আচার্যগণের তিব্বত গমণের বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরেছেন।
বাস্তবিকতা ইহাই যে, লামা তারানাথ কয়েক শতাব্দী পরে এ গ্রন্থ লিখেছেন ঘটনা সমূহের বিবরণ। তারপরেও তাঁর অনেক বিবরণের সাথে শিলালেখ, চৈনিক ভ্রমণকারীদের বিবরণ, তিব্বতি গ্রন্থ সমূহ এবং পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ সমূহের সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়। এজন্য ইতিহাসকারগণ তাঁর গ্রন্থকে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্রোতরূপে মান্য করে থাকেন।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে থাকে যে, ভারতে হাজার হাজার গ্রন্থ লিখা হয়েছে, কিন্তু এগুলির মধ্যে এত অধিক সংখ্যক গ্রন্থ আজ কেবল তিব্বতেই কেনো পাওয়া যায়?
এর উত্তরে উপলব্দ প্রমাণ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদেরকে দিয়ে থাকে।
প্রথমত, ভারতীয় বৌদ্ধ আচার্যগণ তাঁদের গ্রন্থ সমূহ নিজেদের সাথে তিব্বতি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে রাজকীয় সংরক্ষণে সেগুলির ব্যাপকভাবে তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছিল এবং মূল পাণ্ডুলিপি সমূহকেও সুরক্ষিতভাবে রাখা হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অনেক মহাবিহার বুদ্ধ বিদ্বেষীদের দ্বারা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাতে সেখানে রক্ষিত অসংখ্য গ্রন্থও নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু যে সমস্ত পাণ্ডুলিপি পূর্ব হতেই তিব্বত, চীন, নেপাল এবং ভূটান পৌঁছে গিয়েছিল, সেগুলি সুরক্ষিতভাবে বেঁচে গিয়েছে।
তৃতীয়ত, হিমালয় অঞ্চলের শীতল জলবায়ু তালপত্র এবং ভোজপত্র পাণ্ডুলিপি সমূহের সংরক্ষণের জন্য ছিল অনুকুলে। এজন্য সেখানে অনেক গ্রন্থ শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত সুরক্ষিত থেকেছে।
এ সমস্ত কারণে আজ ভারতে উপলব্দ অপ্রাপ্ত অনেক সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ তিব্বতি অনুবাদের ভিত্তিতে পুনরায় পুনর্লিখন করা হচ্ছে।
এখন আরও কিছু প্রশ্ন আমাদের সামনে রয়েছে। যখন ভারতে বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা এতই শক্তিশালী ছিল, তাহলে পরবর্তী শতাব্দী সমূহে এত সংখ্যক বিদ্বান কোথায় চলে গিয়েছিলেন? বৌদ্ধ সঙ্ঘের সংস্থাগত ব্যবস্থা কিভাবে দুর্বল হলো? ভারতীয় বৌদ্ধ আচার্যগণ তিব্বতে কোন্ কোন্ গ্রন্থ নিয়ে গিয়েছিলেন?
শাক্য এবং নারথঙ্গের মতো তিব্বতি বৌদ্ধ গুম্পা (বিহার) সমূহ এ সমস্ত গ্রন্থকে এতই সাবধানতা সহকারে কেনো সংরক্ষণ করেছে?
ভারতে অনুপলব্দ গ্রন্থ সমূহকে পুনরায় বুঝতে এবং পুনর্লিখন করার জন্য আজ কিরকম গবেষণা চালানো হচ্ছে? এ সমস্ত প্রশ্ন সমূহের উত্তর কল্পনাতে পাওয়া যায়না।
সেগুলির উত্তর রয়েছে শিলালেখনীতে, পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ সমূহে, তিব্বতি ইতিহাস গ্রন্থ সমূহে, চৈনিক যাত্রীদের ভ্রমণ বিবরণী সমূহে এবং সমকালীন ফার্সী ইতিহাস গ্রন্থ সমূহের মধ্যে।
.jpg)
0 Comments