Hot Posts

6/recent/ticker-posts

‘পানাতিপাতা’র বাস্তবিক অর্থ কি?

বুদ্ধ তথাগত প্রজ্ঞাপ্ত শীলের অন্যতম হল গৃহস্থদের নিত্য প্রতিপাল্য পঞ্চশীল। এ পঞ্চশীলের প্রথম শীল হল ‘পাণাতিপাতা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।’ অর্থাৎ পালি ভাষার এ বাক্যের সাধারণ অর্থ হল ‘প্রাণী হত্যা হতে বিরত থাকার শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।’ কিন্তু ভগবান তথাগত বুদ্ধ প্রবর্তিত ধম্মের দৃষ্টিতে ইহার বাস্তবিক অর্থ হল এরচেয়ে আরও অধিক গম্ভীর, ব্যাপক এবং মানবীয়।

‘পাণ’ এর অর্থ হল প্রত্যেক সংবেদনশীল, চেতন এবং জীবিত প্রাণী, যারা সুখ চায় এবং দুঃখ হতে বাঁচতে চায় এবং স্বীয় জীবনকে প্রিয় মনে করে।
‘অতিপাত’ এর অর্থ হল কোনো জীবসত্বের জীবনের উপর প্রাণনাশী আঘাত করা, এর উপর পীড়া প্রদান করা অথবা এর জীবনের অধিকার হরণ করা।
এভাবে ‘পাণাতিপাতা’র বাস্তবিক অর্থ কেবল কোনো প্রাণীকে হত্যা করা নয়, বরং কোনো জীবসত্বের জীবনের সুরক্ষা, সম্মান এবং অস্তিত্বের প্রতি হিংসক, নির্দয়ী অথবা বিনাশকারী ভাবনা রাখাও হল ‘পাণাতিপাতা।’
‘বেরমণী’ মানে বিরত থাকা। (হত্যাভাবও মনে উৎপন্ন হতে না দেওয়া এবং হত্যা না করা)।
‘সিক্খাপদং’ মানে শিক্ষাপদ (মনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া)।
‘সমাদিযামি’ গ্রহণ করা, প্রতিজ্ঞা করা।
এজন্য এখানে মানবতা এবং অন্য সকল প্রাণীর সুরক্ষা করার সময় বুদ্ধ বচন অনুসারে-
‘পাণাতিপাতা বেরমণি সিক্খাপদং সমাদিযামি।’
অর্থাৎ আমি সকল জীবসত্ব অথবা প্রাণী মাত্রেরই কায়, বাক্য এবং মনের দ্বারা জীবন নাশ করা হতে বিরত থাকব বা বিরত থাকার শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
ভগবান বুদ্ধের ধম্ম অনুসারে হত্যা প্রথমে হাতের দ্বারা নয়, মন হতে জন্ম নিয়ে থাকে। যখন মনের মধ্যে ক্রোধ, দ্বেষ, ঘৃণা, প্রতিশোধ, ঈর্ষা এবং নির্দয়তা উৎপন্ন হয়, তখন ‘পাণাতিপাতা’র বীজ বপন করা হয়। এজন্য ভগবান বুদ্ধ কেবল বাহ্যিক হিংস্রতা রোধ করার শিক্ষা দেননি, বরং মনের চেতনাকে করুণা, মৈত্রী এবং অহিংসার দ্বারা নির্মল বানানোর মার্গ দর্শিয়ে থাকে।
যখন মন করুণার দ্বারা ভরে যায়, তখন হত্যার বিচারও সমাপ্ত হয়ে যায়। এজন্য ‘পাণাতিপাতা’ হতে বিরতি কেবল এক নিয়ম নয়, বরং ইহা হল করুণা, মৈত্রী, সহ-অস্তিত্ব এবং জীবনের প্রতি সম্মানের অভ্যাসের অনুশীলন।
মানব জীবনের সাথে ‘পাণাতিপাতা’র গভীর সম্বন্ধ
————————————
যেভাবে আমাদের নিজেদের জীবন প্রিয়, অনুরূপভাবে একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা, একটি পাখি, একটি পশু এবং প্রত্যেক জীবসত্ব নিজের জীবনের প্রতি প্রেম করে থাকে। তারাও ভয়, পীড়া এবং মৃত্যুর আতঙ্ক অনুভব করে থাকে।
যখন মনুষ্য এরূপ সত্যকে নিজের অনুভবে অনুসরণ করে থাকে, তখন তার ভীতরে এরূপ ভাবনা জাগ্রত হয় যে-
‘যেভাবে আমি জীবন-যাপন করতে চাই, সেভাবে প্রত্যেক জীবসত্বও জীবন-যাপন করতে চায়। যে দুঃখ হতে আমি বাঁচতে চাই, সেরূপ দুঃখ হতে প্রত্যেক প্রাণীও বাঁচতে চায়।’
এরূপ অনুভূতিই করুণাকে জন্ম দিয়ে থাকে এবং এ করুণাই হল ভগবান বুদ্ধ প্রবর্তিত ধম্মের হৃদয়।
‘পাণাতিপাতা’ ব্যক্তির উপর প্রভাব
——————————-
যখন মন হিংসা, ক্রোধ এবং দ্বেষ দ্বারা ভর্তি হয়, তখন সর্ব প্রথমে মনুষ্যের নিজের শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। তাঁর বিবেক দুর্বল হতে থাকে। সংবেদনশীলতা সমাপ্ত হতে থাকে এবং তার জীবন ভয়, অসুরক্ষা, অশান্তি তথা মানসিক যন্ত্রণায় ভরে উঠে।
এর বিপরীতে, যে ব্যক্তি ‘পাণাতিপাতা’ হতে বিরত থাকে, তার হৃদয় কোমল, শান্ত এবং নির্মল হতে থাকে। তার মধ্যে মৈত্রী, করুণা এবং ধৈর্যের বিকাশ হতে শুরু করে, তাতে তার জীবন সুখ, সন্তুলন এবং মানসিক শান্তিতে ভরে উঠে।
‘পাণাতিপাতা’র পারিবারিক জীবনে প্রভাব
————————————-
পরিবার হল প্রেম, বিশ্বাস এবং সুরক্ষার আধার। যখন পরিবারের সদস্য ক্রোধ, কঠোরতা, অপমান, হিংস্র ব্যবহার এবং প্রতিশোধের ভাবনা দ্বারা জীবন-যাপন করে, তখন আন্তরিক সম্বন্ধ ছিন্ন হতে থাকে। ঘরে ভয়, উৎকণ্ঠা, অবিশ্বাস এবং মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। বাচ্চারাও ইহার পরিবেশ হতে হিংসা এবং কঠোরতা শিখে থাকে। কিন্তু যেখানে করুণা, ধৈর্য, ক্ষমা এবং মৈত্রীর পরিবেশ হয়, সেখানে পরিবার কেবল সাথে থাকারই স্থান হয়ে থাকেনা, বরং ধম্মের জীবন্তরূপ তৈরী হয়ে যায়।
‘পাণাতিপাতা’র সামাজিক প্রভাব
—————————-
সমাজ গঠিত হয় অনেক ব্যক্তি এবং পরিবার দ্বারা। যদি ব্যক্তি হিংসক হয়, তখন পরিবার অশান্ত হবে এবং অশান্ত পরিবারের দ্বারা অশান্ত সমাজের নির্মাণ হতে থাকবে। যুদ্ধ, হত্যা, আতঙ্ক, অত্যাচার, শোষণ, জাতীয় ঘৃণা, ধাম্মিক কট্টরতা, পশু ক্রুরতা এবং পরিবেশ বিনাশ- এ সবের মূল হল জীবনের প্রতি সম্মানের অভাব।
এর বিপরীতে যখন সমাজের লোক প্রত্যেক জীবনের সম্মান করতে শিখে থাকে, তখন বিশ্বাস, সহযোগ, ন্যায়, সমানতা এবং শান্তির বিকাশ হয়ে থাকে। সেভাবেই ভগবান বুদ্ধ দ্বারা বর্ণিত কল্যাণকারী সমাজের নির্মাণ হয়ে থাকে।
ঘটন এবং বিঘটনের ক্রম
——————————-
ভগবান তথাগত বুদ্ধের ধম্ম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, কোনো বড় বিনাশ হঠাৎ করে হয়না। এর আরম্ভ মন হতেই উদয় হয়ে থাকে।
দ্বেষ-হিংস্র বিচার> কঠোর বাণী> হিংস্র কর্ম>সম্বন্ধের বিঘটন > পরিবারের বিঘটন>সমাজের বিঘটন>দুঃখ এবং অশান্তি।
ইহার বিপরীত
———————
মৈত্রী- করুণা> অহিংসক বিচার> মধুর বাণী> মাঙ্গলিক কর্ম> বিশ্বাসপূর্ণ সম্বন্ধ > সুখী পরিবার> শান্ত সমাজ> মানব কল্যাণ।
‘পাণাতিপাতা’র বাস্তবিক সাধনা কি?
——————————
‘পাণাতিপাতা’ হতে বিরতির অর্থ কেবল কোনো জীবকে হত্যা না করা এতটুকু নয়, বরং যে কোনো জীবের প্রতি ক্রুরতার ভাবও মনে না রাখা অর্থাৎ মনে বিদ্বেষভাব উৎপন্ন হতে না দেওয়া।
এখানে সংক্ষিপ্তভাবে বলতে হয় যে-
কায়, বাক্য এবং মনের দ্বারা কাউকে ভয়, পীড়া বা কষ্ট না দেওয়া।
প্রত্যেক জীবনের অধিকারের সম্মান করা।
সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী এবং করুণার বিকাশ করা।
নিজের আচরণ দ্বারা সংসারে শান্তি এবং সুরক্ষার পরিবেশ নির্মাণ করা।
যে দিন মনুষ্য প্রত্যেক জীবসত্বের মধ্যে নিজেরই জীবনের প্রতিবিম্ব দেখতে শিক্ষা করবে, সে দিন তার ভিতরের হিংসা সমাপ্ত হতে থাকবে এবং তৎ স্থানে করুণা জাগ্রত হতে থাকবে। ইহা হতে সে মনুষ্যের সত্যিকার ধম্ম জীবন প্রারম্ভ হয়ে থাকে।
এজন্য ‘পাণাতিপাতা’ কেবল এক শীল নয়, বরং ইহা হল মানব হৃদয়কে ক্রুরতা হতে করুণা, দ্বেষ হতে মৈত্রী এবং হত্যা হতে মানবতার দিকে আনায়নকারী ভগবান বুদ্ধের অমূল্য জীবন দর্শন। যারাই প্রাণীর জীবনকে সম্মান করে থাকে, তারাই বাস্তবে নিজের ভিতর অহিংসার বীজ বপন করে থাকে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement