পালি ভাষার সুপ্রসিদ্ধ গেয় এবং শ্রুতিমধুর বসন্ততিলক ছন্দে রচিত একটি অতীব জনপ্রিয় রচনা হল ‘জয়মঙ্গল অট্ঠগাথা’।
জয়ের অর্থ হল বিজয়, জীত, উপলব্দি, সফলতা। মঙ্গল অর্থাৎ কল্যাণকারী, হিতকারী, আনন্দদায়ক ইত্যাদি।
এ জয়মঙ্গল অষ্টগাথা পাঠের মাধ্যমে কেবল মনুষ্যেরই নয়, প্রাণী মাত্রেরই জয় এবং মঙ্গলের কামনা করা হয়। জয়মঙ্গল অষ্ট গাথায় ভগবান বুদ্ধের জীবনের আট বিজয়কারী এবং মঙ্গলকারী ঘটনাবলীকে লালিত্যপূর্ণ শৈলীতে ছন্দবদ্ধ করা হয়েছে। আটটি ঘটনাবলীকে আটটি গাথায় ব্যক্ত করা হয়েছে। এজন্য ইহাকে অট্ঠগাথা বা অষ্টগাথা বলা হয়। ভগবান তথাগত বুদ্ধের জীবনের সে সত্য ঘটনা সমূহের সত্যক্রিয়া করতে গিয়ে প্রত্যেক গাথার অন্তে পংক্তিতে ‘তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি’ অর্থাৎ ইহার তেজ প্রভাবে তোমাদের জয় এবং মঙ্গল হোক।
এরূপ সুমধুর রচনা শ্রীলঙ্কার ‘মহাপরিত্রাণ পাঠ’ নামক চতুভাণবার গ্রন্থের পরিশিষ্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং মায়ানমার হতে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত থেরবাদী বৌদ্ধ দেশ সমূহে প্রায় প্রত্যেক মাঙ্গলিক কর্মে ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের দ্বারা জয়মঙ্গল অষ্টগাথা পাঠ (সঙ্গায়ন) করা হয় এবং প্রত্যেক গাথার অন্তিমে ‘তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি’ পাঠ করে শ্রোতাদের উপর জল সিঞ্চন করা হয় তথা বিয়ের আসরে বর-বধুর উপর এ অষ্টগাথা পাঠ করে আটবার পুষ্ফ বর্ষণ করা হয়। এ সময়ে উপস্থিত সমাবেশও ক্রমিকভাবে আটবার পুষ্ফবর্ষণ করে থাকেন। সেসময়ে সমগ্র দৃশ্য মনোমুগ্ধকর হয়ে যায়। যাঁদের উপর পুষ্ফ বর্ষণ হয়ে থাকে, তাঁরা নিজেদের মধ্যেও আশীর্বাদ প্রাপ্তিতে ধন্য মনে করে থাকেন এবং যাঁরা পুষ্ফ বর্ষণ করে থাকেন, তাঁরাও মোদিত হয়ে থাকেন।
নবম গাথা হল অতিরিক্ত, যা হল পাঠ এবং শ্রবণের ফলশ্রুতি বা পরিণাম। এ গাথা সমূহ পড়ে অথবা শুনে মন আরও শ্রদ্ধায় ভরে উঠে। ফলশ্রুতি অর্থাৎ জয়মঙ্গল অষ্টগাথা নিয়মিতভাবে পাঠ করলে কিরূপ ফল লাভ হয়, ইহার মহত্বগীত করে থাকে এ গাথা।
নবম গাথা হল ঔপছন্দসক এবং বেতালীয় ছন্দের মিশ্রিত রচনা। ইহা হল অর্ধসমমাত্রিক ছন্দ অর্থাৎ ইহার বিষম চরণ সমূহে অর্থাৎ প্রথম এবং তৃতীয় চরণে মাত্রার সংখ্যা হল পৃথক অর্থাৎ দ্বিতীয় এবং চতুর্থ পংক্তিতে মাত্রার সংখ্যা পৃথক দেখা যায়। অর্থাৎ সম চরণে ১৬-১৬ মাত্রা হয়ে থাকে তথা সম চরণে ১৮-১৮ মাত্রা হয়ে থাকে। এভাবে এরূপ ছন্দের চার চরণের সম্পূর্ণ গাথায় ১৬+১৬+১৮+১৮ অর্থাৎ মোট ৬৪ মাত্রা হয়েছে। এ ছন্দের গেয় রাগ বসন্ততিলকা ছন্দ হতে ভিন্ন।
বসন্ততিলক সমবৃত্তক বর্ণিকের ছন্দ হল যার প্রত্যেক পংক্তিতে ১৪ বর্ণ হয়ে থাকে। ইহা আবৃত্তির সময় সাধারণত: আট এবং ছয় বর্ণের পর স্বর বিরাম অর্থাৎ কণ্ঠ বিরাম নেওয়া হয়, যাকে গীত এবং সঙ্গীতের ভাষায় যতি বলা হয়।
ভাণবারের গণনায় এ সমস্ত দিক দৃষ্টিপাত করা হয়। সঙ্গীতির সময় এরকম এক এক মাত্রা, পাই, অনুস্বারের প্রতি দৃষ্টি রেখে ত্রিপিটককে শতভাগ পরিশুদ্ধভাবে রক্ষা করার শ্রম হয়ে থাকে। এরূপ জ্ঞানের বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন সঙ্গীতির আচার্যগণ।
প্রথম গাথার সঙ্গায়ন হল নিম্নরূপ-
‘বাহুং সহস্সমভিনিম্মিতসাযুধন্তং,
গিরিমেখলং উদিত ঘোর সসেন মারং,
দানাদি ধম্ম বিদিনা জিতবা মুনীন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
প্রথম গাথার অন্বয়ের সাথে অর্থ
—————————-
‘বাহুং সহস্সমভিনিম্মিতসাযুধন্তং’- যে শস্ত্র দ্বারা যুক্ত সহস্র বাহু নির্মিত করেছে।
‘গিরিমেখলং উদিত ঘোর সসেন মারং’- সে মার যে গিরিমেখলা নামক হাতির উপর আরোহী হয়ে স্বীয় ঘনঘোর সেনার সাথে এসেছে।
‘দানাদি ধম্মবিদিনা জিতবা মুনিন্দো’- সে মারকে দানাদি ধম্ম বিধি সমূহ অর্থাৎ পারমিতা সমূহের শক্তিতে মুনীন্দ্র ভগবান বুদ্ধ জয় করেছিলেন।
‘তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি’- সে বুদ্ধের তেজ শক্তি এবং প্রতাপ দ্বারা আপনার / আপনাদের জয় এবং মঙ্গল হোক।
এ গাথা ভগবান তথাগতের জীবনের সে মহান ঘটনার বর্ণনা করে থাকে, যখন বুদ্ধাঙ্কুর সিদ্ধার্থ গৌতম বোধিবৃক্ষের নীচে বজ্রাসনে বজ্র কঠোর সঙ্কল্প নিয়েছিলেন। আমার শরীরের রক্ত-মাংস সব শুকিয়ে গেলেও, প্রাণ চলে গেলেও, আমি এ আসন ততক্ষণ পর্যন্ত ত্যাগ করবোনা, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সম্বোধি প্রাপ্তি হবেনা। এরূপ বজ্র সঙ্কল্পের কারণেই বোধিবৃক্ষের নীচে সে স্থানকে বজ্রাসন বলা হয়ে থাকে।
বৌদ্ধ সাহিত্য সাক্ষ্য দিয়ে থাকে যে, সিদ্ধার্থ গৌতমের এরূপ বজ্র সঙ্কল্পের দ্বারা মার বিচলিত হয়েছিল এবং সে স্বীয় ঘনঘোর সেনার সাথে সিদ্ধার্থের উপর প্রহার করেছিল। কিন্তু সিদ্ধার্থ নিজের আসন হতে এক বিন্দুভর হেলদোল করেননি। সূত্র পিটকের সূত্র নিপাতের পধান সূত্র এবং জাতক অট্ঠকথার ‘নিদান কথা’ তথা বিনয় পিটকের মার যুদ্ধের অতীব মনোমুগ্ধকর বর্ণনা সবিস্তারে দেওয়া হয়েছে।
এখানে আমাদের জানতে হবে যে, মার যে সিদ্ধার্থের সাথে যুদ্ধ করেছিল, তা কোনো স্থূল যুদ্ধ নয়। অথবা বলতে পারেন যে, ইহা ছিল আভাসী অর্থাৎ ভার্সুয়াল যুদ্ধ। মারও এখানে কোনো স্থূল সত্ত্বা নয়। বরং তা ছিল অপার্থিব সত্ত্বা।
পধান সূত্রে মারের সেনাদের বর্ণনা রয়েছে। যেমন-
কামা তে পঠমা সেনা, দুতিযা অরতি বুচ্চতি। ততিযা খুপ্পিপাসা তে, চতুত্থী তণ্হা পবুচ্চতি।
ততিযা থিনমিদ্ধং তে, ছট্ঠী ভীরু পবুচ্চতি,
সত্তমী বিচিকিচ্চা তে, মক্খো থম্ভো চ যো যসো।
যো সত্তানং সমুক্কংসে পরে চ অবজানতি।
কাম- কাম মানে কাম-বাসনা সমূহ এবং সাংসারিক কাম্য বস্তুর প্রতি আসক্তি। ইহা হল প্রথম মারসেনা।
অরতি- সাধনা বা বৈরাগ্যে মন না স্থির হওয়া, মন আলগাভাব হওয়া। ইহা হল দ্বিতীয় মারসেনা।
ক্ষুধা-পিপাসা- ক্ষুধা এবং পিপাসায় ব্যাকুলতা থাকা হল তৃতীয় মারসেনা।
তৃষ্ণা- তৃষ্ণা বা অত্যধিক ইচ্ছা হল চতুর্থ মারসেনা।
থিনমিদ্ধং- আলস্য এবং তন্দ্রা, নিদ্রা ও আরাম প্রিয়তা হল পঞ্চম মারসেনা।
ভীরু- ডর বা ভয়গ্রস্থ বা ভীত হওয়া হল ষষ্ট মারসেনা।
বিচিকিৎসা- সন্দেহ বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সংশয় হল সপ্তম মারসেনা।
মক্খো থম্ভো- কৃতঘ্নতা এবং জড়তা, অহংভাব হল অষ্টম মারসেনা।
লাভো-সক্কারো-যসো- লাভ, সৎকার, যশ, কীর্তির আকাঙ্ক্ষা হল নবম মারসেনা।
অত্তসমুক্কংসন পরবম্ভন- আত্ম প্রশংসা স্বয়ং করা এবং অন্যদেরকে হীন মনে করা, নীচ করে দেখা হল দশম মারসেনা।
মনের এ সমস্ত বৃত্তিই হল মার। এগুলিই হল মারসেনা যেগুলিকে প্রত্যেক আধ্যাত্মিক যোগীকেই মুখোমুখি হতে হয়। কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং সাংসারিক প্রযত্ন সমূহ যেমন-শিক্ষা, আজীবিকা, সফলতাতেও এগুলিই হল অবরোধ। যিনি যে পরিমাণে এগুলির উপর বিজয় প্রাপ্ত করেছেন, তিনি সে পরিমাণে সংসারে সফল উপলব্দিপূর্ণ ব্যক্তিরূপে স্থাপিত হয়ে থাকেন।
সিদ্ধার্থের সাথে মারের এ যুদ্ধ হল বড়ই মার্মিক অর্থ বহন করে থাকে। মার সিদ্ধার্থকে তাঁর তপস্যারত বজ্রাসন হতেই বিচলিত করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সফল হয়নি। সিদ্ধার্থের সম্মুখে সে এরূপ মিথ্যা দৃশ্যও প্রস্তুত করেছে যে, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার পত্নী যশোধরা পরপুরুষগামী হয়েছেন। মার ইহাও দাবী করেছে যে, এ বজ্রাসন হল তার, ইহা সিদ্ধার্থের নয়। তাই বলেছিল-তুমি এ আসন হতে উঠে যাও।
নিদান কথা জাতক অট্ঠকথার গাথানুসারে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মার স্বীয় সাক্ষীতে নিজের সেনাকে তৈরী করেছে-
‘মারো অত্তনো পরিসং ওলোকেত্বা; মম সিদ্ধত্থ কত্থ সক্খী অযং পরিসা, তুয্হং পন সিদ্ধত্থ কত্থ সক্খী’তি আহা।’
অর্থাৎ আমার দাবীর পুষ্টির জন্য আমার সাক্ষীরূপে আমার সেনা উপস্থিত আছে, কিন্তু সিদ্ধার্থ! তোমার সাক্ষী কে?
বোধিসত্ব সিদ্ধার্থ বলেছেন যে-
‘মম চেতনাবন্তো সক্খী ইধ নত্থি। অযং পন মযা সত্তেসু কতদানপারমিযাদিপুঞ্ঞানং গহিতাবকাসা মচেতনাপি মহাপঠবী সক্খী’তি।’
অর্থাৎ সচেতন কোনো প্রাণী এখানে আমার সাক্ষী নাই। দান পারমিতাদি পুণ্য কর্ম সমূহ ধারণকারী এ মহাপৃথিবীই হল আমার সাক্ষী।
এরূপ বলে সিদ্ধার্থ স্বীয় চীবর দ্বারা রত্নের মতো স্বীয় ডান হাতে বের করে পৃথিবীকে স্পর্শ করেছিলেন।
চিত্তপটবদ্ধং রতনগব্ভতো নীহরিত্বা পঠবিযা অভিমুখা অভিনীহরি।’
এবং ধরিত্রীমাতাকে আহ্বান করেছেন-
‘ত্বং ময্হং বেস্সন্তর অত্তভাবে সত্তসতকদানকালে সক্খী অসী’তি মহাপঠবিং অব্ভন্তরং অকাসি।’
অর্থাৎ হে মহাপৃথিবী! আমার বিগত জন্মে বিশ্বন্তররূপে আমি যখন সাত শ’ বার মহাদান দিয়েছিলাম, তখন তুমিই তার সাক্ষী হয়েছিলে। আজ পুন: তুমি আমার পুণ্য সমূহের সাক্ষী দাও।
সিদ্ধার্থের পারমিতা সমূহ এবং পুণ্য সমূহের সাক্ষী দেওয়ার জন্য পৃথিবী কম্পন হতে লাগল। তখনই মার সেনা পলায়ন করলো।
আজও বৌদ্ধগণ পুণ্য কর্মের পর জল ঢেলে পুণ্যদান করে থাকেন। দানদাতা একটি পাত্র হতে জল মাটিতে ঢালতে থাকেন এবং পূজ্য ভিক্ষু-ভিক্ষুণী অথবা সঙ্ঘ সঙ্গায়ন করে থাকেন যে-‘ইচ্ছিতং পত্থিতং তুয্হং খিপ্পমেব সমিজ্ঝতু সব্বে পুরেন্তু চিত্তসঙ্কপ্পা চন্দো পন্নরসো যথা…..।’
পৃথিবীতে জল অর্পণ করতে গিয়ে কৃত দানের উপর নিজের স্বামিত্ব ত্যাগের পাত্রকে দিয়ে থাকেন। সে পাত্র হল ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, সঙ্ঘ বা সংস্থা ইত্যাদি।
বোধিসত্ব সিদ্ধার্থের আহ্বানে প্রকট হওয়া ধরিত্রীমাতা স্বীয় সিক্ত কেশকর্তন হয় এরকম তীক্ষ্ণ ধার সম্পন্ন গিরিমেখলা হাতী যার উপর ভর করে মার সেনা এসে নেতৃত্ব দান করছিল তা হাঁটুর শক্তিতে ভূমিতে পতিত হয়েছে। মার সেনা দাঁড়িয়ে পলায়ন করলো।
ভূমিকে স্পর্শ করার দৃশ্যটি ভগবান বুদ্ধের যে মূর্তি বানানো হয়, তাতে এ মহান ঘটনার প্রতীক রূপে শিল্পাঙ্কন করা হয়। এখানে বলার আবশ্যকতা নাই যে, সমগ্র প্রসঙ্গে প্রতীকবাদের সুন্দর শিল্পাঙ্কন বা চিত্রের বর্ণনা রয়েছে।
জযমঙ্গল অট্ঠাগাথার প্রথম গাথা এ ঘটনার গুণগান করে থাকে-
‘বাহুং সহস্সমভিনিম্মিতসাযুধন্তং,
গিরিমেখলং উদিত ঘোর সসেন মারং,
দানাদি ধম্ম বিদিনা জিতবা মুনীন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
.jpg)
0 Comments