Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বুদ্ধ জয়মঙ্গলের দ্বিতীয় গাথা....2

জয়মঙ্গল অট্ঠগাথার প্রথম গাথা ভগবান বুদ্ধের বোধিসত্ব জীবনের দান পারমী শক্তির গুণগান করা হয়েছে। তাঁর দানের সত্যক্রিয়া করে সকলের জয় এবং মঙ্গল কামনা করা হয়। দ্বিতীয় গাথা খন্তী (ক্ষান্তি) অর্থাৎ ক্ষান্তি পারমিতার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-

‘মারাতিরেকমভিযুজ্ঝিত সব্বরত্তিং,
ঘোরম্পনালবকমক্খমথদ্ধযক্খং।
খন্তী সুদন্ত বিধিনা জিতবা মুনীন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
এ গাথার পৃষ্ঠভূমিতে দুর্দান্ত যক্ষ আলবকের সাথে ভগবান বুদ্ধের বার্তালাপ হল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ প্রসঙ্গ।
পৃষ্ঠভূমি এরকম ছিল যে, একবার ভগবান বুদ্ধ আলবী নগরে পদার্পণ করেছিলেন, যেখানে আলবক যক্ষের ভয়ানক প্রকোপ ছিল। বুদ্ধকালে ‘আলবী’ নামে যে নগর ছিল, তা বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌ এবং শিল্পনগরী কানপুরের মাঝ খানের জনপদ উন্নাও জিলা। যা হল রাজধানী লক্ষ্ণৌ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর পাড়ে অবস্থিত। গঙ্গার অপর পাড়ে হল কানপুর। সে আলবী নগরে আলবক যক্ষের এতই উৎপাত ছিল যে, সে প্রতিদিন একটি বাচ্চাকে ভক্ষণ করতো। এরূপ দুর্দান্ত যক্ষের সাথে ভগবান তথাগত বুদ্ধের রোমাঞ্চকর সমাচার পালি সাহিত্য ত্রিপিটকের সূত্র পিটকান্তর্গত ‘সূত্র নিপাত’ গ্রন্থে ‘আলবক সূত্র’ বর্ণনায় উল্লিখিত হয়েছে।
সূত্রের বর্ণনা হল নিম্নরূপ-
‘এক সময় ভগবান বুদ্ধ আলবীতে আলবক যক্ষের বাসস্থানে বিহার করছিলেন। তখন আলবক যক্ষ ভগবান অবস্থান করছিলেন সেখানে বাহির হতে এসে পৌঁছল। এসে সে ভগবান বুদ্ধকে বলল-
‘শ্রমণ! বের হও।’
বুদ্ধ বললেন-‘সাধুবাদ মিত্র!’ এরূপ বলে বুদ্ধ বের হলেন।
যক্ষ আবার বলল-‘শ্রমণ! ভিতরে এসো।’
বুদ্ধ বললেন-‘সাধুবাদ মিত্র’, আবার এরূপ বলে ভিতরে প্রবেশ করলেন।
আলবক যক্ষ পুনরায় বলল-‘শ্রমণ! বের হও।’
বুদ্ধ এবারও বললেন-‘সাধুবাদ মিত্র’ বলে বের হলেন।
দ্বিতীয় বারও আলবক যক্ষ ভগবানকে এরূপ বলল-‘শ্রমণ! বের হও।’
বুদ্ধ বললেন-‘খুব ভাল, মিত্র! এরূপ বলে বের হলেন।
যক্ষ আবার বলল-‘শ্রমণ! ভিতরে যাও।’
বুদ্ধ বললেন-‘খুব ভাল, মিত্র’ এরূপ বলে ভিতরে প্রবেশ করলেন।
তৃতীয়বারও আলবক যক্ষ বুদ্ধকে বলল-‘শ্রমণ! বের হয়ে এসো।’
বুদ্ধ বললেন-‘সাধুবাদ মিত্র!’ এরূপ বলে বের হলেন।
যক্ষ আবার বলল-‘শ্রমণ! ভিতরে প্রবেশ করো।’
বুদ্ধ এবারও বললেন-‘খুব ভাল, মিত্র।’ এরূপ বলে ভিতরে প্রবেশ করলেন।
চতুর্থবারও আলবক যক্ষ ভগবান বুদ্ধকে এরূপ বলল-‘শ্রমণ! বের হও।’
এখন বুদ্ধ বললেন-‘মিত্র! আমি বের হবোনা। তোমার যা করার তা করতে পারো।’
যক্ষ বলল-‘শ্রমণ, গৌতম! আমি তোমাকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবো। যদি তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারো, তাহলে তোমার চিত্ত বিক্ষিপ্ত করবো বা তোমার হৃদয় ছিঁড়ে ফেলে দেবো অথবা দু’ পা ধরে ছিঁড়ে তোমাকে গঙ্গার অপর পাড়ে সজোরে নিক্ষেপ করবো।’
বুদ্ধ বললেন-‘আবুসো (মিত্র)! আমি দেব, মার এবং ব্রহ্মা সাথে শ্রমণ এবং ব্রাহ্মণগণ সহ সকল প্রজা তথা দেব, মনুষ্য লোকের মধ্যে এরকম কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা, যে আমার চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করতে পারবে বা হৃদয় ছিঁড়ে ফেলতে পারবে অথবা দু’পা ধরে ছিঁড়ে গঙ্গার অপর পাড়ে নিক্ষেপ করতে পারবে। এরপরেও প্রিয় মিত্র! যা কিছু তুমি জিজ্ঞাসা করতে চাও, প্রশ্ন করতে পারো।’
যক্ষ প্রশ্ন করলো-
‘কিংসুধ বিত্তং পুরিসস্স সেট্ঠং?
কিংসুধ সুচিণ্ণো সুখমাবহাতি?
কিংসু হবে সাদুতরং রসানং?
কথং জীবি জীবিতমাহু সেট্ঠং?’
অর্থাৎ এ সংসারে পুরুষের শ্রেষ্ঠ ধন কি?
কিসের অনুশীলন হল সুখকর?
রসের মধ্যে কিসের রস স্বাদুতর হয়ে থাকে?
কিরকম জীবনকে শ্রেষ্ঠ জীবন বলা হয়?
এর উত্তরে বুদ্ধ তথাগত বলতে লাগলেন-
‘সদ্ধীধ বিত্তং পুরিসস্স সেট্ঠং,
ধম্মো সুচিণ্ণো সুখমাবহাতি,
সচ্চং হবে সাদুতরং রসানং,
পঞ্ঞাজীবিং জীবিতমাহু সেট্ঠং।’
অর্থাৎ এ সংসারে পুরুষের শ্রেষ্ঠ ধন হল শ্রদ্ধা।
সুশৃঙ্খল ধম্ম অনুশীলন সুখদায়ক হয়ে থাকে।
সত্য সমস্ত রস হতে স্বাদিষ্টতর হয়।
প্রজ্ঞাজীবির জীবনকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন এবং উত্তর
————————
যক্ষ বলল-
‘কথংসু তরতি ওঘং?
কথংসু তরতি অণ্ণবং?
কথংসু দুক্খং অচ্চেতি?
কথংসু পরিসুজ্ঝতি?’
অর্থাৎ মনুষ্য কিভাবে সাংসারিক বন্যাকে অতিক্রম করতে পারে?
এবং কিভাবে ভব সাগরকে পাড় করতে পারে?
কিভাবে দুঃখের সমাপ্ত করতে পারে?
এবং কিভাবে পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে?
বুদ্ধ এর উত্তর দিলেন-
‘সদ্ধায তরতি ওঘং,
অপ্পমাদেন অণ্ণবং,
বিরিযেন দুক্খং অচ্চেতি,
পঞ্ঞায পরিসুজ্ঝতি।’
অর্থাৎ মনুষ্য শ্রদ্ধার দ্বারা সাংসারিক বন্যাকে অতিক্রম করতে পারে,
অপ্রমাদের (জাগরুকতা) দ্বারা ভব সাগর পাড় করতে পারে,
পরাক্রমের দ্বারা দুঃখকে সমাপ্ত করতে পারে
এবং প্রজ্ঞার দ্বারা পরিশুদ্ধিতা লাভ করতে পারে।
তৃতীয় প্রশ্ন এবং উত্তর
—————————-
যক্ষ জানতে চাইল-
‘কথংসু লভতে পঞ্ঞং?
কথংসু বিন্দতে ধনং?
কথংসু কিত্তিং পপ্পোতি?
কথং মিত্তানি গন্থতি?’
অর্থাৎ মনুষ্য কিভাবে প্রজ্ঞাবান হয়ে থাকে?
কিভাবে ধনবান হয়?
কিভাবে যশ প্রাপ্ত হয়?
কিভাবে ইহলোক হতে পরলোকে গিয়ে শোক করতে হয়না?
উত্তরে বুদ্ধ বললেন-
‘সদ্দহানো অরহন্তং, ধম্মং নিব্বানপত্তিযা,
সুস্সুসা লভতে পঞ্ঞং অপ্পমত্তো বিচক্খণো।’
অর্থাৎ নির্বাণ প্রাপ্তির জন্য অরহতদের ধম্মে শ্রদ্ধা প্রদর্শনকারী অপ্রমাদী এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি শ্রদ্ধাপূর্বক ধম্ম শ্রবণের দ্বারা প্রজ্ঞাবান হয়।
‘পতিরূপকারী ধূরবা উট্ঠাতা বিন্দতে ধনং
সচ্চেন কিত্তিং পপ্পোতি, দদং মিত্তানি গন্থতি।’
অর্থাৎ যথোচিত কর্মকারী, ধৈর্যশীল এবং পরিশ্রমী ব্যক্তি ধনবান হয়ে থাকে। সত্যের দ্বারা যশ কীর্তি লাভ করা যায় এবং দান করার প্রবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তি মিত্রদের যুক্ত করে রাখে।
যস্সেতে চতুরো ধম্মায সদ্ধস্স ঘরমেসিনো,
সচ্চং ধম্মো ধিতি চাগো স বে পেচ্চ ন সোচতি।
অস্মা লোকা পরং লোকং এবমেসো ন সোচতি।’
অর্থাৎ যে শ্রদ্ধা সম্পন্ন গৃহস্থের নিকট সত্য, ধম্ম, ধৈর্য এবং ত্যাগ-এর চার বিষয় বিদ্যমান থাকে, সে মৃত্যুর পর ইহলোক হতে পরলোকে গিয়ে শোক করেনা।
‘ইঙ্ঘ অঞ্ঞেপি পুচ্ছ অসু, পুথু সমণব্রাহ্মণো,
যদি সচ্চ দমা চাগা, খন্ত্যা ভিয্যোধ বিজ্জতি।
যসস্সেতে চতুরো ধম্মো সদ্ধস্স ঘরমেসিনো,
সচ্চং ধম্মো ধিতি চাগো, স বে পেচ্চ ন সোচতি।’
অর্থাৎ তুমি একটু অন্য শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারো যে, সঠিক সত্য, ইন্দ্রিয় দমন, ত্যাগ এবং ক্ষান্তির চেয়ে অতিরিক্ত আরও কিছু কি আছে?
অতঃপর যক্ষ বলতে লাগল-
‘কথং নু দানি পুচ্ছিস্সং, পুথু সমণব্রাহ্মণে,
সোহং অজ্জ পজানামি, যো চত্থো সম্পরাযিকো।’
অর্থাৎ আমি কিভাবে অন্য শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে যাবো? আজ আমি স্বয়ং পারলৌকিক অর্থকে জেনে নিয়েছি।
‘অত্থায বত মে বুদ্ধো, বাসায় আলবিং অগা,
সোহং অজ্জ পজানামি, যত্থ দিন্নং মহপ্ফলং।’
অর্থাৎ অহো! আমার হিতের জন্য বুদ্ধ আলবীতে আমার নিবাসে এসেছেন। আজ আমি জেনে গিয়েছি যে, যেখানে দান করলে ফল মহান হয়ে থাকে।
‘সো অহং বিচরিস্সামি, গামাগামং পুরাপুরং,
নমস্সমানো সম্বুদ্ধং ধম্মস্স চ সুধম্মতং’তি।’
অর্থাৎ এখন আমি গ্রাম-গ্রামান্তরে, নগর-নগরান্তরে সম্বুদ্ধ এবং তাঁর সুধম্মতা যুক্ত ধম্মকে নমস্কার করতে করতে বিচরণ করবো।
ভগবান, গৌতম! সাধুবাদ জানাচ্ছি। অনেক উত্তম, অনেক উত্তম হে ভগবান, গৌতম! যে রকম হে গৌতম! উল্টো থাকা পাত্রকে সোজা করা হয়, ঢেকে থাকাকে অনাচ্ছাদিত করা হয়, পথভ্রষ্টকে যেমন মার্গ দর্শন করা হয়, অন্ধকারে যেমন তৈলের আলো প্রজ্জ্বলন করা হয়, যাতে চক্ষুস্মান রূপ দেখতে পারে, সেরকমই গৌতম দ্বারা অনেক প্রকারে ধম্ম আমাকে প্রকাশ করা হয়েছে।
এখন আমি ভগবান গৌতমের শরণে গমণ করছি, ধম্ম এবং ভিক্ষু সঙ্ঘেরও শরণাপন্ন হচ্ছি। আমাকে হে গৌতম! আজ হতে আপনার শরণাগত উপাসকরূপে গ্রহণ করুন।
জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’র দ্বিতীয় গাথা এ প্রসঙ্গের পৃষ্ঠভূমিতে ভগবানের খন্তি বা ক্ষান্তি পারমিতার সত্যক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে জাতকের জয় এবং মঙ্গল কামনা করা হয়-
‘খন্তী সুদন্ত বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
যেভাবে মূনীন্দ্র ভগবান বুদ্ধ ক্ষান্তির শক্তিতে আলবক যক্ষের কাছে বিজয় হয়েছিলেন, সেরূপভাবে তার তেজ প্রভাবে তোমাদেরও জয় এবং মঙ্গল হোক।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement