‘জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’র তৃতীয় গাথা হল নিম্নরূপ-
‘নালাগিরিং গজবরং অতিমত্তভূতং
দাবগ্গি চক্কমসনীব সুদারুণন্তং
মেত্তম্বুসেক বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
এ গাথার শব্দার্থ হল নিম্নরূপ-
‘নালগিরিং গজবরং অতিঅন্ধভূতং’- নালাগিরি নামক শ্রেষ্ঠ হাতী, যে অত্যন্ত মদোম্মত্ত অর্থাৎ পাগল হয়ে গিয়েছিল।
‘দাবগ্গি চক্কমসনীব সুদারুণন্তং’-যে দাবানল অর্থাৎ জঙ্গলের আগুনের চক্র বা তীব্রবেগে বজ্রের মতো অত্যন্ত ভয়ার্ত ও ভয়ানক ছিল।
মেত্তম্বুসেক বিধিনা জিতবা মুনিন্দো’- সে হাতীকে মৈত্রী রূপী জলের চিঞ্চনের বিধি দ্বারা মুনীন্দ্র ভগবান বুদ্ধ জয় করেছিলেন, তাকে স্বীয় মৈত্রী দ্বারা শান্ত করে বশীভূত করে নিয়েছিলেন। অম্বুজ মানে হল জল। মেত্তাম্বু অর্থাৎ মৈত্রীরূপী জল।
‘তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি’-সে বুদ্ধের তেজ এবং প্রতাপ দ্বারা আপনার/আপনাদের জয় এবং মঙ্গল হোক।
পৃষ্ঠভূমির প্রসঙ্গ ইহাই যে, ভগবানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ন মামাতো ভাই ভদন্ত দেবদত্ত স্থবির কর্তৃক একটি পাগল হাতীকে অতি মাত্রায় মদ্যপান করিয়ে ভগবান বুদ্ধের সম্মুখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি ছিল মগধের রাজধানী রাজগৃহ নগরী।
ভগবান তথাগত বুদ্ধের মামাতো ভাই ভদন্ত দেবদত্ত স্থবিরের মনে বুদ্ধের প্রতি অত্যধিক ঈর্ষা এবং বিদ্বেষভাব ছিল। তিনি স্বয়ং সঙ্ঘের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন। যে লাভ-সৎকার বুদ্ধ প্রাপ্ত করছিলেন, সেগুলি দেবদত্ত স্বয়ং লাভ করতে চাইলেন। নিজের কুটিলতাপূর্ণ প্রয়াস সমূহের দ্বারা তিনি সফল হতে না পেরে তিনি বুদ্ধকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র রচনা করেছিলেন। এজন্য তিনি রাজগৃহের মগধ নরেশ বিম্বিসার নন্দন কুমার অজাতশত্রুর সাথে নিকট সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি রাজগৃহের সবচেয়ে ভয়ানক, বিশাল এবং হিংস্র হাতী নালগিরিকে অতিমাত্রায় তেজ মদ্যপান করিয়েছিলেন। হাতী সম্পূর্ণরূপে উন্মত্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিল। যখন ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষু সঙ্ঘের সাথে পূর্বাহ্নে পিণ্ডপাত সংগ্রহের জন্য রাজগৃহের রাজপথে বের হয়েছিলেন, তখন ভদন্ত দেবদত্তের ঈশারায় হাতীর মাহুত সে মদোন্মত্ত নালগিরি হাতীকে বন্ধন মুক্ত করে সরাসরি বুদ্ধের দিকে ছেড়ে দিয়েছিল। হাতী হুঙ্কার দিতে দিতে রাস্তার ধারে থাকা ঘর-বাড়ি, দোকান-পাঠ এবং মনুষ্যদেরকে পায়ে মর্দন করতে করতে অগ্রসর হচ্ছিল। তা দাবানল অর্থাৎ জঙ্গলের আগুন বা বজ্র অর্থাৎ বিজলীর মতো বিনাশকারী মনে হচ্ছিল। লোকেরা ভয়ভীত হয়ে ঘরের ছাদ এবং বৃক্ষের উপরে উঠে গিয়েছিল। বুদ্ধের একান্ত নিকটতম সেবক ভদন্ত আনন্দ স্থবির বুদ্ধকে রক্ষার জন্য তাঁর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু বুদ্ধ তাঁকে সম্মুখ হতে হটে যেতে নির্দেশ দিয়ে নিজেই হাতীর সামনে হলেন। এরূপ ঘটনার অতীব চাঞ্চল্যকর বর্ণনা পালি সাহিত্যে সূত্র পিটকের অন্তর্গত খুদ্দক নিকায়ের ‘জাতক অট্ঠকথা’তেও পাওয়া যায়। তাতে ভদন্ত দেবদত্ত স্থবিরের অতীত হতে চলে আসা শত্রুতা এবং বিদ্বেষ তথা মহাকারুণিক বুদ্ধের প্রতি ভদন্ত আনন্দ স্থবিরের অপার মৈত্রীর বর্ণনা রয়েছে।
ভগবান বুদ্ধ পাঁচ প্রকার অনন্তরীয় কর্মের সম্বন্ধেও বর্ণনা করেছেন। সেগুলি হল নিম্নরূপ-
১) মাতৃ হত্যা।
২) পিতৃ হত্যা।
৩) অরহত হত্যা।
৪) দ্বেষ চিত্তে বুদ্ধের শরীর হতে রক্তপাত করা এবং
৫) সঙ্ঘের মধ্যে ভেদ উৎপন্ন করা।
এ পাঁচ প্রকার মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত বা প্রতিকার করা সম্ভব নয়। এ পাঁচ প্রকার অনন্তরীয় পাপ কর্মের তীব্র প্রভাব ইহ জন্মেই পাওয়া যায়। ইহা কেবল আধ্যাত্মিক মার্গ-ফলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা নয়, বরং প্রগতির পথকেও রুদ্ধ করে দেয়। তা নির্বাণ মার্গ হতে বিচ্যুত করে দেয় এবং মৃত্যুর পর এক কল্প পর্যন্ত অবীচি নামক মহানিরয়ে পতিত করে। বুদ্ধ বচনে এরকমই বর্ণিত হয়েছে।
যখন নালগিরি হাতী শুণ্ড উঠিয়ে বিকট শব্দে হুঙ্কার দিতে দিতে ভগবান বুদ্ধকে পায়ে পিষিয়ে দেওয়ার জন্য একেবারে নিকটে এসে পৌঁছেছিল, তখন বুদ্ধ সামান্যতমও বিচলিত হননি। তিনি হাতী দমনের জন্য কোনো প্রকার অস্ত্র-শস্ত্রের প্রয়োগ করেননি। বুদ্ধ স্বীয় হৃদয়ের গভীর হতে অসীম মৈত্রী এবং করুণার তরঙ্গ সে হাতীর দিকে প্রবাহিত করেছিলেন। গাথায় ইহাকে ‘মেত্তাম্বুসেক বিধিনা’ বলা হয়েছে, যার অর্থ হল ‘মৈত্রীরূপ জলের চিঞ্চন বিধি।’ বুদ্ধের সে অগাধ এবং অচল মৈত্রীর প্রভাবে পাগল হাতী এরকম হয়েছিল যে, তার সম্পূর্ণ ক্রোধ এবং নেশা নিমিষেই দূরীভূত হয়ে সে শান্তভাব ধারণ করেছিল। সে হাঁটু গেড়ে শুণ্ড নীচের দিকে করে নিল এবং ভগবান বুদ্ধের শ্রীচরণদ্বয়ে নত মস্তক হল। বুদ্ধ তখন অতীব স্নেহ দ্বারা তার মস্তকের উপর নিজের করকমল বুলিয়ে দিলেন।
‘জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’র এ গাথায় ভগবান বুদ্ধের মৈত্রী শক্তির মাহাত্য বর্ণনা করা হয়েছে। এর সত্যক্রিয়া করে পাঠক সকলের জয় এবং মঙ্গল কামনা করে থাকেন এভাবে-
‘মেত্তাম্বুসেক বিধিনা জিতবা মুনিন্দো,
তং তেজসা ভবতু তে জযমঙ্গলানি।’
মৈত্রী ভাবনা আমাদের ধ্যান, যাকে পালি ভাষায় ‘মেত্তা’ বলা হয়, মনের ঘৃণা, দ্বেষ, ঈর্ষা, অহঙ্কার, অবসাদ প্রভৃতি হতে মুক্তি দিতে সহায়ক হয়ে থাকে। আজকাল সম্বন্ধ সমূহকে টাক্সিক রিলেশন অর্থাৎ বিষাক্ত সম্বন্ধ বলা হয়ে থাকে। এ ধ্যান হল ইহার সর্বোত্তম চিকিৎসা। আপনি কি মৈত্রী ভাবনা করেন? আপনি কি ‘জযমঙ্গল অট্ঠগাথা’ নিয়মিত পাঠ করে থাকেন? আপনি পাঠ করে এর প্রভাব উপলব্দি করুন। জযমঙ্গল অট্ঠগাথার এরূপ শৃঙ্খলা দ্বারা আপনাদের মঙ্গলোপব্দি হোক।
.jpg)
0 Comments