পাকিস্তান যদিও পূর্বে ভারতবর্ষ তথা জম্বুদীপেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, কিন্তু ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে তা ইসলামিক রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর হতে সেখানে সবকিছু ইসলামীকরণ করার কাজ শুরু হয়েছে।
পাকিস্তান কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই চালু রেখেছে। ইদানীং তারা নিজেদের ধার্মিক এবং সাংস্কৃতি বিবিধতার দিকেও অগ্রসর হতে দেখা যাচ্ছে। তার প্রমাণ স্বরূপ সম্প্রতি পাকিস্তানে সরকারী ডাক টিকিটে ভগবান বুদ্ধের প্রাক্ বোধিকালের কৃচ্ছ্রসাধন বা দুষ্করচর্যায় (দুক্করচরিয) রত শিল্পকলার ঐতিহাসিক মূর্তির ছবি, বুদ্ধের অন্যান্য মূর্তি এবং বৌদ্ধ স্তূপের ছবিও ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরূপ পদক্ষেপ কেবল সাংস্কৃতিক সহিষ্ণুতাকে দর্শিয়ে থাকে তা নয়, বরং ইহা দর্শিয়ে থাকে যে, পাকিস্তান নিজের ঐতিহাসিক এবং ধার্মিক ঐতিহ্যকে (Heritage) মান্যতা দিতে বদ্ধপরিকর হয়েছে।
ভগবান তথাগত বুদ্ধের কুমার সিদ্ধার্থরূপে জন্ম হয়েছে লুম্বিনীতে খৃষ্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দে। তাঁকে শান্তি, অহিংসা, করুণা, জ্ঞান এবং বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের প্রতীক বলে মান্য করা হয়। বুদ্ধের দর্শন ও বিচার আজকেও সমগ্র বিশ্বের লোকদেরকে প্রেরণা দিয়ে চলেছে এবং তাঁর শিক্ষা সমুহ বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জাতির লোকদের মধ্যে সমতা, মৈত্রী এবং অহিংসার বার্তা প্রদান করে থাকে। পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসকে প্রকাশিত করার জন্য এরকম ডাক টিকেট বিমোচন যে একটি সকারাত্মক সঙ্কেত তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই।
পাকিস্তানের কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে তক্ষশীলা, কাশ্মীর, গান্ধার প্রভৃতি অঞ্চলে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। সেখানে বুদ্ধ উপাসনার প্রাচীন সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে অনেক বৌদ্ধ দার্শনিকদের জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় (Texila University) ছিল প্রাচীন একটি উৎকৃষ্ট এবং প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইহার রূপে খ্যাতি রয়েছে বিশ্বব্যাপী। সেখানে বৌদ্ধ বিদ্যার্থীরা দূর-দূরান্ত হতে গিয়ে নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতেন। বুদ্ধ কালের রাজা প্রসেনজিৎ, ভীষক জীবক, ছত্ত মাণবক, মেধাবী অহিংসক (অঙ্গুলিমান) প্রমুখ অনেকেই ছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। এ দিক থেকে বুদ্ধের ছবিকে ডাক টিকিটে অঙ্কিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অতীত ঐতিহ্যকেই মান্যতা দেওয়ার উত্তম প্রয়াস বলে দেখা হচ্ছে।
এরূপ পদক্ষেপের গুরুত্ব কেবল সাংস্কৃতিক প্রচারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর দ্বারা আর্থিক সমৃদ্ধতাও রয়েছে। ডাক টিকিটের উপর বুদ্ধের ছবি বিমোচন করার মাধ্যমে পর্যটন খাতের সমৃদ্ধিও হবে। তাতে প্রতিবছর ইতিহাস ও বুদ্ধ প্রেমী লক্ষ লক্ষ পর্যটক পাকিস্তানে আসতে উৎসাহ পাবে। যেমন প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক আসে ভারতে বুদ্ধ সম্পর্কিত স্থান সমূহ দর্শন করতে। এরূপ পদক্ষেপ কেবল পাকিস্তানের ধার্মিক পর্যটনকে বৃদ্ধি করবেনা, বরং বিদেশী পর্যটকদেরকেও বৌদ্ধ ইতিহাস এবং হৃত ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে সহায়তা করবে।
ইহা ছাড়াও, এরূপ নির্ণয় একটি মহত্বপূর্ণ বার্তাও প্রদান করে থাকে যে, বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ধার্মিক কট্টরতা এবং অসহিষ্ণুতার মধ্যে পাকিস্তান দ্বারা মহাকারুণিক বুদ্ধের মতো অসাম্প্রদায়িক ও সার্বভৌমিক প্রতীককে গ্রহণ করা হল একটি সকারাত্মক সঙ্কেত। ইহা দর্শিয়ে থাকে যে, পাকিস্তানের মতো দেশও সতত শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং পরধর্মের প্রতি সম্মান দেওয়ার জন্য তৎপর রয়েছে।
ইহাও সত্য যে, এরূপ পদক্ষেপে এরূপ আলোচনাও হতে পারে যে, পাকিস্তানের আন্তরিক রাজনীতি এবং ধার্মিকতা উভয় বিষয়কে যুক্ত করেও দেখতে পারেন। কিন্তু ইহা দৃষ্টি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ যে, পাকিস্তানে রয়েছে বৌদ্ধ ধম্মের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং তা প্রচার-প্রসার করারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
পরিশেষে, পাকিস্তান দ্বারা ভগবান বুদ্ধের ডাক টিকেট জারী করা হল এক অনন্য পদক্ষেপ, যা কেবল সাংস্কৃতিক মান্যতার প্রতীক নয়, বরং ইহা সামগ্রিকভাবে মানবতা অনুসরণের জন্য একটি সকারাত্মক বার্তাও দিয়ে থাকে। এরূপ পদক্ষেপ আমাদেরকে ইহা স্মরণ করিয়ে থাকে যে, যদিও আমাদের মধ্যে নানা ভিন্নতা রয়েছে, কিন্তু শান্তি এবং সহিষ্ণুতার প্রেরণা প্রত্যেক ধর্মের সংস্কৃতিতে কম-বেশী নিহিত রয়েছে।
0 Comments