লোকচক্র কি?
——————-
লোকচক্র হল মোহ, মূঢ়তা। লোকচক্র হল অজ্ঞান, অবিবেচক, অবিদ্যা, যেগুলির কারণে আমরা নিরন্তর রাগ এবং দ্বেষের চক্রে নিষ্পেষিত হচ্ছি। আমাদের ছয় ইন্দ্রিয় সমূহ, যেমন- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, শরীর এবং মন তথা এ ছয় ইন্দ্রিয়ের ছয় বিষয় বা আলম্বণ, যেমন-রূপ, শব্দ, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ এবং ধম্ম বা মনে উৎপন্ন বিষয় সমূহ। এগুলির মধ্যে পরস্পরের সম্বন্ধ হয়ে থাকে। যেমন-রূপের সম্পর্ক চক্ষুর সাথে, নাকের সম্পর্ক গন্ধের সাথে, কানের সম্পর্ক শব্দের সাথে, জিহ্বার সম্পর্ক স্বাদের সাথে, কায়ার সম্পর্কে কোনো স্পর্শ যোগ্য পদার্থের সাথে এবং মনের সম্পর্কে হল মনে উৎপন্ন ধম্মের সাথে।
সংস্পর্শ হওয়া মাত্রই তৎক্ষণে আমাদের চিতে কোনো না কোনো বেদনা বা অনুভূতি জাগ্রত হয়। যদি সে অনুভূতি আমাদের অপ্রিয় লেগে থাকে, তখন দূরত্ব অর্থাৎ দ্বেষ জন্ম নিয়ে থাকে। যদি সে অনুভূতি প্রিয় লেগে থাকে, তখন রাগাসক্তি জন্ম নিয়ে থাকে। তাতে রাগ উৎপন্ন হোক বা দ্বেষ, উভয়ই আমাদের মনে অস্থিরতা, আসক্তি-বিরক্তি অথবা উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে। তাতে মনের স্থিরতা বা সমতা নষ্ট হয়ে যায়। বিষমতা আরম্ভ হয়। দু:খ সন্ধি হয়। দু:খ আরম্ভ হয়। এভাবেই লোকচক্রের আরম্ভ হয়ে থাকে।
অজ্ঞানতা বশত: আমরা যা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকি, সেগুলি গভীর আসক্তিতে পরিবর্তিত হয়ে দূষিত ভবচক্র রূপে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আমাদেরকে সতত ব্যাকুল, ব্যথিত, করে তোলে এবং সংসারে আমাদের ক্রমাগত দু:খ বৃদ্ধি করতে থাকে। এরূপ ভবচক্রকে দূর করার জন্য আমাদের ভিতর ধম্মচক্র জাগ্রত করা অতীব আবশ্যক। ধম্মচক্র যত বেশী গতিমান হবে, লোকচক্র ততবেশী নিস্তেজ হয়ে যাবে।
যদি ধম্মচক্র জাগ্রত হয়, তখন বিবেক, বিদ্যা এবং হোঁস জাগ্রত হয়। যেভাবেই কোনো ইন্দ্রিয় এবং তার বিষয়ের সংস্পর্শের সাথে চিত্তে কোনো প্রিয় বা অপ্রিয়, সুখদায়ক বা দু:খদায়ক অনুভূতি (বেদনা) উৎপন্ন হয়ে থাকে, সেরকমই পাগলের মতো সে বিষয়ের প্রতি রাগ-রঞ্জিত এবং দ্বেষ-দূষিত হওয়ার পরিবর্তে সেগুলির নশ্বর, নি:সার স্বভাবকে বুঝে প্রজ্ঞা এবং অনাসক্তি জাগ্রত করা উচিত। এরকমভাবেই লোকচক্রের প্রবর্তন স্তব্দ হয়ে যায়। ইহা বিস্তার হতে পারেনা। ইহাই হল ধম্মচক্র প্রবর্তন।
ধম্মচক্র প্রবর্তনের ইহা হল প্রত্যক্ষ লাভ। বিদর্শন ভাবনা নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন দ্বারা নিজের অন্তর্মনে অনুভব হতে থাকা প্রত্যেক অনুভূতিকে জেনে সেগুলির মধ্যে কোনো প্রকার আসক্তি-বিরক্তি থাকতে নেই। চিত্ত সমতায় স্থির থাকতে হবে। ইহাকে বলা হয় ধম্মচক্রকে প্রবর্তিত রাখা। ধম্মচক্র প্রবর্তিত রাখতে পারলেই আমাদের কল্যাণ-মঙ্গল নিশ্চিত থাকবে।
বন্ধন খুলে চলতে থাকুন
———————————
আসক্তির মতো রোগ নাই, দ্বেষের মতো দোষ নাই। মোহের মতো মূঢ়তা নাই এবং ধম্ম সদৃশ হোঁস নাই।
রাগ, দ্বেষ এবং মোহের যতক্ষণ পর্যন্ত মনে জায়গা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মনে সুখ, শান্তির কোনো নাম নিশানাও থাকবেনা।
রাগ, দ্বেষ এবং অভিমান-এ তিন অকুশল মূল বন্ধনকে সুদৃঢ় করে এবং শীল, সমাধি এবং প্রজ্ঞা-এ তিনটি বন্ধনকে খুলতে থাকে।
প্রজ্ঞা জাগ্রত করতে ধম্মচক্রকে প্রবর্তন করুন, এতেই সমস্ত ময়লা মন হতে বিদূরিত হয়ে যাবে।
সুখ এবং দু:খ হর-হামেশা আসতেই থাকবে, আপনি কেনো মনকে বিচলিত করছেন? কেনো দুশ্চিন্তায় আছেন?
যা কিছু উৎপন্ন হচ্ছে কেবল দেখতে থাকুন, স্মৃতি করতে থাকুন। দর্শন করতে থাকুন উদয়-বিলয় স্বভাবকে। কিন্তু মনের সমতা বজায় রাখতে হবে। তাতে খুলে যাবে যাবতীয় বন্ধন।
.jpg)
0 Comments