(১) যে ব্যক্তিই হোক না কেন, ধর্মসাধনা করতেই হবে। সাধনা করার সুযোগ যখন পেয়েছ, তখনই সাধনা করো। এই বুদ্ধশাসন শেষ হয়ে গেলে আর বিপশ্যনা ধর্মের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে না। তখন ক্ষতি আরও বেশি হবে।
(২) “ধর্মসাধনা করার সময় নেই”—এ কথা অনেকে বলে। কিন্তু মৃত্যুর সময় এসে গেলে “আমি মরতে চাই না” বললেই যেমন হবে না, তেমনি এখন “সময় নেই” বলেও পার পাওয়া যাবে না।
(৩) ধর্মসাধনা করতে হলে শক্তি ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সাধনা করতে হয়। অনিশ্চিত ও অনির্ভরযোগ্য কাজের ক্ষেত্রেও মানুষ “হয়তো হবে, হয়তো পারব” ভেবে জীবনপণ করে চেষ্টা করে। তাহলে যে কাজ নিশ্চিতভাবে কল্যাণকর, তা করতে ভয় পাওয়ার কী আছে? সর্বোচ্চ এক জীবন কিছুটা কষ্ট হবে। আর সেই এক জীবনও তো অতি অল্প সময়ের।
(৪) যা কিছু স্পর্শ করছে, প্রতিটি স্পর্শের সময় তা জেনে থাকো। মাঝখানে যেন কিলেসা (ক্লেশ/অশুচি মানসিক প্রবণতা) প্রবেশ করার সুযোগ না পায়।
(৫) ধর্মসাধনা করা ভাত খাওয়ার মতো। ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হয়, ক্ষুধা থাকলেও খেতে হয়।
খাবারটি সুস্বাদু হবে মনে হলেও খাওয়ার সময় হয়তো তেমন সুস্বাদু নাও লাগতে পারে। আবার ভালো নয় মনে হলেও খাওয়ার সময় সুস্বাদু লাগতে পারে। তাই সাধনা করতে ইচ্ছা না করলেও সাধনা করো; ইচ্ছা করলেও সাধনা করো।
(৬) বিপশ্যনা ধর্মের সাধনা অত্যন্ত উত্তম। এর জন্য পোশাক পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই, গুহায় গিয়ে বসে থাকারও প্রয়োজন নেই। পরিবর্তন করতে হবে পুথুজ্জন (সাধারণ সংসারী মানুষের) চরিত্র ও প্রবৃত্তিকে।
(৭) নিজের শরীরকে পর্যবেক্ষণ করো; অন্যের দোষ দেখতে যেও না। অন্যের দোষ দেখতে গেলে নিজেরই নানা ঝামেলা ও অশান্তি বাড়বে।
(৮) নিজের দেহে যে বেদনা বা অনুভূতি উৎপন্ন হচ্ছে, তা সহ্য করে পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞান করতে পারলে, চারপাশের লোকধর্ম/লোকধর্মের উত্থান-পতন (লাভ-অলাভ, সুখ-দুঃখ, নিন্দা-প্রশংসা ইত্যাদি) সহ্য করার শক্তিও অর্জিত হবে।
(৯) ধর্মসাধনার সময় যেন ক্লেশ মাঝখানে প্রবেশ করতে না পারে, তাই নাসারন্ধ্রের মুখে শ্বাসের স্পর্শ যতবার অনুভূত হবে, ততবার তা জেনে থাকো। স্পর্শের প্রতি সচেতন থাকো। সচেতন থাকলে ধর্মকে দেখতে পাবে; সচেতন না থাকলে ভুল প্রবেশ করবে।
(১০) আর্য সাধু ও মহাপুরুষেরা রূপ, নাম এবং ধর্ম—এই তিনটির সঙ্গেই অবস্থান করেন। তাঁদের মধ্যে অলসতা বলে কিছু নেই।
(১১) শুধু মানুষ “সাধু” বলল বা দেবতারা “সাধু” বলল—এতেই সন্তুষ্ট হয়ে থেকো না। এমনভাবে সাধনা করো, যাতে বুদ্ধ, অর্হৎ এবং আর্য সাধুগণও তোমাকে প্রশংসা করেন।
(১২) প্রথমে মানুষ ধর্মকে পরিচালনা করে। পরে ধর্মই মানুষকে পরিচালনা করে। সেই সময় মানুষকে ধর্মের অনুসরণ করতে হয়।
(১৩) দেহ তো নিজের ধর্ম নিজেই প্রকাশ করে চলেছে। কিন্তু লোভ, দ্বেষ ও মোহ দ্বারা আচ্ছন্ন থাকার কারণে আমরা তা কিছুই বুঝতে পারি না।
(১৪) ভুল জায়গায় নির্ভর করো না। নিজেকেই নিজের আশ্রয় করতে হবে।
(১৫) যেকোনো পরিস্থিতিতেই অন্তরকে শীতল রাখতে হয়। বাইরে যতই গরম হোক, ভেতরটা যদি শীতল থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে শীতলই থাকবে। আবার বাইরে যতই ঠান্ডা হোক, ভেতর যদি উত্তপ্ত থাকে, তাহলে উত্তাপই অনুভূত হবে।
(১৬) ধর্মের সঙ্গে ঘুমানো, ধর্মের সঙ্গে জেগে ওঠা এবং ধর্মের সঙ্গেই আনন্দিত থাকা—এটাই অপ্পমাদ (অপ্রমাদ/সতর্কতা ও যত্নসহকারে জীবনযাপন)।
(১৭) জাগতিক সুখ এক জীবনের, এমনকি একবেলার খাবারের মতোই সাময়িক। কিন্তু লোকোত্তর সুখই সমগ্র সংসার-চক্রের জন্য শীতলতা ও মুক্তি দেয়। তাই এক জীবন বা একবেলার সুখের জন্য কাজ করো না; সমগ্র সংসার থেকে মুক্তির জন্য সাধনা করো।
(১৮) খারাপ কাজ করাকেই ভয় করতে হবে। ভালো কাজ করতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। খারাপ কাজ করতেও যদি সাহস করতে পারো, তাহলে ভালো কাজ করতে ভয় পাওয়ার কী আছে?
(১৯) সত্য না হলেও সহ্য করতে হবে, সত্য হলেও সহ্য করতে হবে। যেহেতু সহ্য করতেই হবে, তাহলে এখন থেকেই সহ্য করে নাও—তাহলেই সংসার-চক্র ছিন্ন করার পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
(২০) লোভ, দ্বেষ ও মোহ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, এগুলো ছিন্ন করার জন্য সাধনা করো। কোনো কিছু উৎপন্ন করতেও যেও না, ধ্বংস করতেও যেও না। যা উৎপন্ন হচ্ছে এবং যা বিলীন হচ্ছে—তা সর্বদা জেনে থাকো।
কিছু উৎপন্ন করতে চাওয়া হলো লোভ।
কিছু ধ্বংস করতে চাওয়া হলো দ্বেষ।
উৎপন্ন হওয়া ও বিলীন হওয়া না জানা হলো মোহ।
(২১) শুধু মনের ইচ্ছায় কিছু ছিন্ন হয়ে যায় না। ধর্মের জ্ঞান দ্বারা তা ছিন্ন হলে তবেই সত্যিকার অর্থে ছিন্ন হয়। তাই ধর্মকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাধনা করো। ধর্ম যখন উপস্থিত হয়, তখন ধর্মই ছিন্ন করে, মুক্ত করে এবং অপায়গতি থেকে রক্ষা করে।
(২২) লাভ যেন ক্ষতিতে পরিণত না হয়। বরং ক্ষতিই যেন লাভে পরিণত হয়। অকুশল যেন কুশলে পরিণত হয়; কিন্তু কুশল যেন অকুশলে পরিণত না হয়।
(২৩) পুথুজ্জনরা খারাপ কাজ করে—এতে আশ্চর্য হয়ে থেকো না। তারা এখন যেমন খারাপ কাজ করছে, ভবিষ্যতেও খারাপ কাজ করতে পারে। তাদের খারাপ কাজের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? তোমার নিজের ধর্ম, নিজের দেহ-মনকেই পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
(২৪) বুদ্ধের বাণী বোঝার চেষ্টা করো। বুদ্ধের বাণী সত্যভাবে বুঝতে পারলে জগতের সমস্ত কথার প্রকৃত অর্থও বুঝতে পারবে।
(২৫) “নির্বাণের মার্গ ও ফল লাভ করব”—এই আকাঙ্ক্ষায় কতবার যে প্রার্থনা করেছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু বিজ্জা-জ্ঞান (বিদ্যা/প্রজ্ঞাজ্ঞান) ছাড়া শুধু ধর্মলাভের প্রার্থনা করতে থাকলে মুখ ও গলা ক্লান্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না।
দান-পুণ্য করে বারবার প্রার্থনা করলেও, আমার ভেতরের ‘আমি ভালো হতে চাই’—এই ‘আমি’-বোধ যতক্ষণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ততক্ষণ মুক্তি সহজ হবে না।
এই ‘আমি’ নামক ধারণাটিকে পরিত্যাগ ও আড়াল করতে পারলেই, খুব বেশি দেরি না করে নির্বাণকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হবে।
দেশনায়- ---পরম পূজনীয় সা- দাউং ছেয়াদ--
0 Comments